কুন্তল রায়চৌধুরীর বয়স প্রায় বছর তিরিশ, দাড়ি-গোঁফ নিখুঁতভাবে কামানো, বাহুল্যবর্জিত আঁটসাঁট পোশাক সুগঠিত দেহটিকে জড়িয়ে আছে। হাতদুটি বুকের ওপর ভাঁজ করে দোর গোড়ায় দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি, অপলক চোখে তাকিয়ে রইলেন তার স্ত্রীর সুন্দর মুখপানে। কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে তখনও মনিকা রায়চৌধুরী তার স্বামীর ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছিলেন। নির্বাক এই দৃষ্টি বিনিময়ের মধ্যে যেন প্রকাশ পেল ভয়ঙ্কর কিছু সম্ভাবনার। প্রত্যেকেই প্রত্যেককে দৃষ্টির ভাষা দিয়ে প্রশ্ন করলেন এবং প্রত্যেকেই যেন দৃষ্টির মধ্যে দিয়েই খুঁজে পেলেন তার উত্তর। কুন্তল রায়চৌধুরী যেন জিগ্যেস করলেন, এ কী করলে তুমি? প্রত্যুত্তরে মনিকা দেবী যেন উত্তর দিলেন, তুমি জেনেছ কতটুকু? অবশেষে সম্মুখে অগ্রসর হলেন কুন্তল রায়চৌধুরী, স্ত্রীর পাশেই মখমলের কুশনের ওপর বসলেন এবং আলগোছে একটি সুগঠিত কান ধরে স্ত্রীর মুখটি নিজের পানে ফেরালেন।
মনি, আমায় তুমি বিষ দিচ্ছো?
আতঙ্কভরা মুখে এবং প্রতিবাদভরা দৃষ্টি নিয়ে মনিকা রায়চৌধুরী স্বামীর স্পর্শ থেকে ছিটকে দাঁড়িয়ে উঠলেন। এত দারুণ বিচলিত হয়েছিলেন তিনি যে, কথা বলতে পারছিলেন না–চঞ্চল হাত আর অস্থির অবয়বাদির মধ্যে প্রকাশ পেল তাঁর অন্তরের বিস্ময় আর ক্রোধ। কুন্তল রায়চৌধুরী আবার আর একটি প্রশ্ন করলেন এবং এইবার তার কণ্ঠে প্রকাশ পেল নিবিড় আন্তরিকতা।
কিন্তু কেন?
তুমি পাগল হয়েছে! উন্মাদ! রুদ্ধশ্বাসে বললেন মনিকা।
স্বামীর উত্তর তার রক্ত জমিয়ে দিল, অসহায় নৈঃশব্দ্য নিয়ে তিনি স্বামীর মুখপানে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলেন–তার বিবর্ণ ওষ্ঠাধর দুটি ঈষদোন্মুক্ত এবং গণ্ডদ্বয় রক্তহীন–পকেট থেকে একটি ছোট্ট বোতল বার করে কুন্তল রায়চৌধুরী স্ত্রীর চোখের সামনে ধরলেন।
তোমার জুয়েল-কেস থেকে পেলাম।
দুবার মনিকা দেবী কথা বলতে গেলেন, দুবারই হলেন ব্যর্থ। অবশেষে তার আকুঞ্চিত ওষ্ঠাধরের ফাঁক দিয়ে একটির পর একটি শব্দ এল বেরিয়ে
তোমাকে বিষ দিইনি। আবার কুন্তল রায়চৌধুরীর হাত প্রবিষ্ট হল পকেটে। একটা কাগজ বার করলেন, ভাঁজ খুললেন এবং স্ত্রীর সামনে ধরলেন।
ডাঃ মিত্রের সার্টিফিকেট। বোতলের তরল পদার্থে বার গ্রেন অ্যান্টিমনি আছে। যে কেমিষ্ট এটা বিক্রি করেছে, সে আমার সাক্ষী হবে।
মনিকা রায়চৌধুরীর মুখটি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। বলবার মতো আর কিছুই নেই। মারাত্মক ফঁদে পড়লে অসহায় হিংস্র প্রাণী যেভাবে তাকায়, তিনিও শুধু সেইভাবে রইলেন তাকিয়ে।
ঠিক আছে? জিগ্যেস করলেন কুন্তল রায়চৌধুরী। কোনও উত্তর এল না, কিন্তু মনিকা দেবীর মুখভাব দেখে মনে হল তিনি মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
কেন? জিগ্যেস করলেন কুন্তল–আমি জানতে চাই, কেন? কথা বলতে বলতে তিনি লক্ষ্য করলেন মনিকার ব্লাউজের ফাঁকে লিপিকার একটা কোণ। চক্ষের নিমেষে তিনি সেটা ছিনিয়ে নিলেন। হতাশভাবে চিৎকার করে মনিকা চেষ্টা করলেন লিপিকাটি ফিরে পেতে, কিন্তু একহাতে কুন্তল সেটি ওপরে তুলে ধরলেন এবং অপর হাতে স্ত্রীকে শক্ত করে ধরে লিপির ওপর দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিলেন।
সোম! বললেন রুদ্ধশ্বাসে? এ যে সোম!
লুপ্ত সাহস আবার ফিরে পেলেন মনিকা দেবী। গোপন করার আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তাঁর মুখটি কঠিন এবং দৃঢ় হয়ে উঠল। শাণিত ছুরিকার মতো ধারালো হয়ে উঠল চক্ষুদুটি।
হ্যাঁ, সোম। মাই গড! শেষকালে সোম।
উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের মধ্যে দ্রুত পায়চারী করতে লাগলেন কুন্তল। অপরেশ সোম! যে পুরুষটির সারাজীবন স্বার্থত্যাগ, সৎসাহস এবং শ্রেষ্ঠ পুরুষের উপযুক্ত গুণগরিমায় সমুজ্জ্বল, যে পুরুষটিকে তিনি তার অন্তরের স্বর্ণমণ্ডিত আসনে বসিয়েছেন, সেই অপরেশ সোমও শেষে এই নারীর কবলে পড়েছেন এবং এমন স্থানে উপনীত হয়েছেন যে বন্ধুর সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করতেও তিনি সর্বতোভাবে প্রস্তুত। অবিশ্বাস্য, কিন্তু তবুও ওই লিপিকার আবেগময় মিনতিপূর্ব ভাষায় তাঁর স্ত্রীকে একটি কপর্দকশূন্য পুরুষের সাথে পলায়ন করার জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। অপরেশ সোম–একদিন যার হাতে কুন্তল রায়চৌধুরী হাত মিলিয়েছেন সখ্যের বন্ধনে, নিবিড়তর করেছেন পরিচয়–সেই সোম আজ লিখেছেন এই লিপিকা! কিন্তু পত্রের প্রতিটি শব্দ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে কুন্তলের মৃত্যু অন্তত সোম মোটেই কল্পনা করছেন না। সমস্যার এ পৈশাচিক সমাধান উদ্ভূত হয়েছে একজনের কুটিল মস্তিষ্ক থেকে, যেখানে শয়তানই একমাত্র তার বাসের উপযুক্ত স্থান বলে মনে করে।
লক্ষ জনের মধ্যেও স্বতন্ত্র ছিলেন কুন্তল রায়চৌধুরী। দার্শনিক, চিন্তাশীল পুরুষ, প্রত্যেকের জন্য তাঁর উদার হৃদয়ে সঞ্চিত থাকত অপার সহানুভূতি। কিন্তু মুহূর্তের জন্য বিষিয়ে উঠল তার অন্তর। সেই মুহূর্তটিতে তিনি অপরেশ সোম এবং স্ত্রীকে হত্যা করতে পারতেন এবং কর্তব্যনিষ্ঠ দৃঢ়-সঙ্কল্প পুরুষের মতো মৃত্যুর সম্মুখীন হতে দ্বিধাবোধ করতেন না। কিন্তু পায়চারী করতে করতে ইতিমধ্যেই যুক্তিস্নিগ্ধ চিন্তাধারায় স্তিমিত হয়ে এল তার মানসিক উগ্রতা। সোমের অপরাধ কি? তাকে দোষ দেবেন কী করে? এই নারীর মোহলীলা তাঁর অজানা নেই। মোহ-বিস্তার শুধু তার অপরূপ দৈহিক সৌন্দর্যের দ্বারা নয়; পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তার কৌতূহল জাগ্রত করার এক অসাধারণ ক্ষমতা এর আছে; পুরুষটির অন্তরতম বিবেককে ইনি খুঁচিয়ে জাগিয়ে তোলেন এবং তিনি যে তাকে উচ্চাশা আর মহান কর্তব্যের দিকে অনুপ্রাণিত করে নিয়ে যাচ্ছেন, এই জাতীয় ধারণা পুরুষটির মনে প্রবেশ করিয়ে দিতে পারেন। মনিকা দেবীর মোহপাশের মারাত্মক চাতুর্যই হল ওইখানে। কুন্তলের মনে পড়ল নিজের ক্ষেত্রে কীভাবে এ মোহ তাঁকে বেষ্টন করেছিল। মনিকা দেবী, যতদূর কুন্তলের বিশ্বাস, সে সময় বন্ধনহীনই ছিলেন। তারপর তাদের বিবাহ হল সাঙ্গ। কিন্তু ধরা যাক, তিনি বন্ধনহীন ছিলেন না, ধরা যাক তিনি বিবাহবন্ধনে পূর্ব হতেই ছিলেন আবদ্ধ এবং ধরা যাক ঠিক এইভাবেই তিনি তার চিত্তকে বন্দি করেছিলেন। এরপর কি তিনি তখন ক্ষান্ত হতে পারতেন? পারতেন কি অপূর্ব বাসনা নিয়ে দূরে সরে যেতে? কখনই না। অন্তরের সর্বশক্তি নিয়োগ করেও তিনি তা করতে পারবেন না। তাহলে যে বন্ধুটি আজ এই একই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে, তার ওপর মনকে তিনি কেন তুলবেন বিষিয়ে? অপরেশ সোমের কথা চিন্তা করে অনুকম্পা আর সহানুভূতিতে তার অন্তর পূর্ণ হয়ে গেল।
