যেরকম চটপট কেসের সমাধান হয়ে গেল, ঠিক সেইরকম চটপট সাঙ্গ হল দণ্ডবিধান পর্ব। এক হপ্তা পরেই ভবিষ্যতের হবু খুনিদের চরম শিক্ষা দেওয়ার জন্যে দামাস্কাসের প্রধান পার্কে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে লাগল আবদুল ওহাব সাকা আমিনির নিষ্প্রাণ দেহ। * ইব্রাহিম গাজী (দামাস্কাস, সিরিয়া) রচিত কাহিনি অবলম্বনে।
দুঃস্বপ্ন
রায়চৌধুরী-দম্পতির বসবার ঘরটি সত্যিই অপরূপ। রীতিমতো বিলাসবহুল উপকরণে সুসজ্জিত। নরম মখমল আঁটা সোফা, আয়নার মতো চকচকে পালিশ করা নীচু হালফ্যাশানের চেয়ার, ইতঃস্তত বিক্ষিপ্ত শ্বেত প্রস্তরে খোদিত গ্রিক ভাস্কর্যের রম্য নিদর্শন ঘরের আবহাওয়াকেও যেন বিলাস-সৌরভে সুরভিত করে তুলেছে। দেওয়ালে ঝুলছে, বহুমূল্য ভেলভেটের পর্দা, পর্দার ওপর সোনালি সুতোর ফুল-লতা-পাতা। ঘরের মেঝেতে পা ডুবে যাওয়া পুরু গালিচা-বাস্তবিকই এ ভবনের সুন্দরী কত্রী-ঠাকরুনের মনোরঞ্জনে সক্ষম অপরূপ এই কক্ষটি। রূপসী স্ত্রীর সকল খেয়াল এবং চাহিদা মেটাতে কুন্তল রায়চৌধুরী কোনওদিন বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেননি–তার বিপুল সম্পদের শেষ কানাকড়িও বোধ করি এ জন্যে ব্যয় করতে তিনি কুণ্ঠিত ছিলেন না। আর বাস্তবিকই, মনিকা তার জন্যে যে স্বার্থত্যাগ করেছে তার প্রতিদানে কুন্তল রায়চৌধুরী যে তার জন্যে এতটা করবেন এ তো স্বাভাবিক। ভারতবর্ষের মধ্যে নৃত্যশিল্পে, বিশেষত ভারতনাট্যম-নৃত্যে সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী ছিলেন মনিকা দেবী, কয়েকটি জনসম্বর্ধিত চিত্রেও পরিচয় দিয়েছেন তার নিপুণ অভিনয় দক্ষতায়–সুনাম সুযশের শিখরে তিনি উঠে বসেছিলেন, অর্থ তাঁর চরণে যেত গড়িয়ে–এ সবের মোহ ত্যাগ করে কুন্তল রায়চৌধুরীর প্রেমে মুগ্ধ হয়ে এলেন তার ঘরে ঘরণী হয়ে। যশোজ্জ্বল জীবনের সবকিছু মনিকা দেবী ছেড়ে এসেছেন–সে সব পূরণ করবার প্রাণপণ চেষ্টা করেন কুন্তল রায়চৌধুরী। এ জন্যে তিনি তার অর্থকে মনে করেন ধূলিসম। কেউ হয়তো মনে করতে পারেন যে তিনি প্রেমের চেয়ে বড় করে দেখেছিলেন মনিকা দেবীর অনিন্দ্য রূপ আর অগাধ খ্যাতিকে। প্রেমের ফাটল তিনি অর্থের প্রলেপ দিয়ে জুড়ে দেওয়ার প্রয়াস পেতেন। কিন্তু তা যারা ভাবেন, তাঁরা ভ্রান্ত। কেননা, একঘর দর্শকের সামনেও তাঁর অকুণ্ঠ ভালবাসার প্রমাণ দিতে তিনি কোনও দিন কুণ্ঠিত হননি।
কিন্তু কক্ষটি বাস্তবিকই অপূর্ব। প্রথম দৃষ্টিতেই কক্ষটিকে দেখে মনে হবে যেন শিল্পী চোখে স্বপ্নাঞ্জন লেপন করে ঘরটি সজ্জামণ্ডিত করেছেন। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ আবহাওয়ার সাথে পরিচিত হয়ে ওঠার পর কতকগুলো অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য প্রত্যেকেই উপলব্ধি করবে। ঘরটি নিস্তব্ধ–অত্যন্ত নিস্তব্ধ। পুরু গালিচার ওপরে কোনও পদশব্দ শ্রুত হয় না। ঘরের মৃদু নীলাভ আলোর আবহাওয়া কেমন যেন থমথমে হয়ে উঠেছে। মনিকা রায়চৌধুরী এই কক্ষটিতে প্রতিদিন আসতেন, ঘণ্টা দু-চার থাকতেন–কিন্তু যতক্ষণ থাকতেন তিনি, ততটুকু সময় একাকী মগ্ন হয়ে থাকতেন এই অদ্ভুত নৈঃশব্দ্যে এবং এই রহস্যময় ঘরের চারটি দেওয়ালের মধ্যে মনিকা রায়চৌধুরী হয়ে উঠতেন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং রীতিমতো বিপজ্জনক মহিলা।
বিপজ্জনক–হ্যাঁ একমাত্র এই শব্দটিই প্রয়োগের উপযুক্ত। কোমল মখমলের ওপর অধশায়িতা তার নিখুঁত অবয়ব দেখে সে সন্দেহ কার মধ্যে উপস্থিত হবে? সুগঠিত কিন্তু দৃঢ় প্রতিজ্ঞ চিবুকটি দক্ষিণ হস্তের ওপর ন্যস্ত করে তিনি আড় হয়ে শুয়েছিলেন। তাঁর দীঘল কিন্তু ম্লান দুটি চক্ষু, প্রশংসনীয় কিন্তু অনমনীয় দুটি আঁখির দৃষ্টি, সম্মুখে বিস্তৃত–অটল সঙ্কল্পে স্থির সে দৃষ্টি। অবোধ্য শঙ্কার ছায়াবিজড়িত, ভয়াবহ সে দৃষ্টি। অনিন্দ্যসুন্দর তার আননটি শিশুর মতো কমনীয়, কিন্তু তবুও তাঁর ওই পেলব নমনীয়তার নীচে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে এক অনির্বচনীয় অথচ সুনিশ্চিত ভাব প্রকাশ, যে প্রকাশভঙ্গি বলে দিচ্ছে তার অন্তরে ক্রীড়া করছে এখন কুটিল চক্রান্তের দানবীয় উল্লাস। লক্ষ্য করা গেছে, এই বিশেষ ক্ষণটিতে কুকুরেও তাঁর কাছ থেকে এসেছে সরে, কোল থেকে অবুঝ শিশুও নেমে পালিয়েছে নিরাপদ দূরত্বে। যুক্তির অতীত এমন অনেক সহজাত ভাবাবেশ মনুষ্যকুলে আছে যা একেবারেই বুদ্ধির অগম্য।
বিশেষ করে এই অপরাহ্নে তিনি বেশ একটু বিচলিত হয়ে পড়েছেন। তাঁর হাতে একটি লিপিকা, সেটি তিনি বারংবার পড়েছেন এবং পড়তে পড়তে তার টানা-টানা নিখুঁত ভুরু দুটি হয়ে উঠেছে ঈষৎ কুঞ্চিত, সরস ওষ্ঠাধর দুটি হয়ে উঠেছে ঈষৎ কঠিন। অকস্মাৎ তিনি চমকিত চক্ষু তুললেন এবং দেহের চিতা সম ভয়াবহতা শঙ্কার ছায়াপাতে কোমল হয়ে উঠল। হাতের ওপর ভর দিয়ে তিনি উঠে বসলেন, দরজার ওপর স্থির হয়ে রইল তার চক্ষু দুটি। নিবিষ্ট মনে তিনি শুনছিলেন–শুনছিলেন এমন কিছু যা তার মনে জাগ্রত করত আতঙ্ক। মুহূর্তের জন্য তাঁর ভাবব্যঞ্জক মুখের ওপর খেলে গেল একটুকরো সুমিষ্ট হাসি। তারপরেই ভীত চক্ষে তিনি লিপিকাটি দ্রুতহস্তে ব্লাউজের ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন। ব্লাউজ থেকে হাত সরিয়ে নেওয়ার পূর্বেই উন্মুক্ত হয়ে গেল দরজা এবং ক্ষিপ্র চরণে কক্ষে প্রবেশ করলেন একটি সুদর্শন যুবক।
কুন্তল রায়চৌধুরী, তাঁর স্বামী! ইনিই সেই পুরুষ যিনি আজ তাঁর নবীন এবং অভিনব এক অভিজ্ঞতার একমাত্র প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
