রিপোর্টারকে ফোন করার পরেই প্রথম শক্ পেল আমিনি। বরফকুচো দেওয়া শরবৎ খাওয়া তো দুরের কথা, গত কদিনের মধ্যে সহকর্মীর টিকিও নাকি দেখেনি সে-সাফ জবাব দিয়ে দিলে রিপোর্টার ভদ্রলোক। একটু ভেবে নিয়ে আমিনি চটপট বুঝিয়ে দিলে তার অস্বীকার করার মূল কারণটা–একটা গণিকালয় চালায় হামিন। তাই পুলিশের কোনও ঝামেলায় নিজেকে জড়াতে চায় না ও।
বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে সমানে প্রশ্ন করে যেতে লাগলাম ওকে। উত্তর দেওয়ার সময়ে চোখ-মুখের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করতে লাগলাম তীক্ষ্ণ চোখে। আর, তখনই, আচমকা আমার চোখ পড়ল বাঁ-হাতের ওপর। টেবিলের কিনারাটা বাঁ-হাত দিয়ে চেপে ধরেছিল ও। বুড়ো আঙুলের নখের নীচে একটা লালচে দাগ দেখতে পেলাম আমি।
ভাবলাম, এ দাগ রক্তের না-ও হতে পারে। খুব সম্ভব কাজ করার সময় ছাপাখানার লাল কালি উঠে এসেছে ওর নখের ওপর। নখের ওপর খানিকটা ধুলোও লেগেছিল। মনের কন্দর থেকে উঠে এল হুঁশিয়ার থাকার হুকুমনামা। এই সূত্র বা অন্য কোনও সূত্রই উপেক্ষা করলে চলবে না।
ল্যাবরেটরিতে দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধুলোর মধ্যে রক্ত পাওয়া গেল। খবরটা মামার কানে পৌঁছে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একেবারেই ভেঙে পড়ল বেচারি আর তার পরেই কয়েক মিনিটের মধ্যেই শুনতে পেলাম তার অপরাধ কাহিনি।
খবরের কাগজের অফিস থেকে যে মাইনে আমি পাই, তা দিয়ে আমার চলে না। আমার ভালো লাগে ভালো খাবার, প্রচুর মদ, সুন্দরী মেয়ে আর জুয়োর টেবিলের উত্তেজনা। আমার ফ্যামিলি যখন যথেষ্ট বিত্তবান, তখন এভাবে মাটিতে মুখ রগড়ে জীবনধারণ করা আমার পোষায় না। আমার সম্মানের হানি ঘটে তাতে।
আমার বোনের অন্তরে দয়ামায়া ছিল প্রচুর। প্রায় তার সঙ্গে দেখা করতাম আমি। আমার টাকার দরকার হলেই মুক্ত হস্তে সব সময়ে আমাকে দেদার টাকা দিত সে। গতরাতে ভাগ্যের চাকা ঘোরে আমার প্রতিকূলে, আজ সকালে পথের ভিখিরি হয়ে গেলাম আমি। তাই এসেছিলাম বোনের কাছে। ফটকের কাছে খেলা করছিল ইয়ামিন। উঠোনে সেলাইয়ের কল নিয়ে বসেছিল আমার বোন। মামুলি কুশল বিনিময় করার পর আমি সরাসরি এসে পড়লাম আমার কথায়। আমার অর্থের দরকার এবং তা এখুনি দিতে হবে। ও বললে–আজকে তো বাড়িতে টাকাকড়ি নেই, ভাইয়া। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি চাপ দিতে ধৈর্যচ্যুতি ঘটল ওর। বলল–ঘ্যানঘ্যান কোরো না। বললাম তো হাতে টাকা নেই।
তখনই একটা শয়তানি মতলব উঁকি মারল আমার মগজে। একতলায় রাখা কাবার্ডে যে জড়োয়া গহনা আছে, সেগুলো পকেটস্থ করলে কেমন হয়? বললাম–বহিন, তোমার জড়োয়া গয়নাগুলো আমাকে দিয়ে দাও, বলেই–বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম আমি।
মুহূর্তের মধ্যে বুঝলাম, বড় বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি। চিৎকার করে উঠল আমার বোন– নেমকহারাম কুকুর কোথাকার। তোমার ওই নোংরা আমোদের জন্যে আমার মায়ের গয়নাগুলোকে এবার ভাগে লাগাতে চাও। অনেক বছর তোমাকে আড়াল করে রেখেছিলাম আমি। কিন্তু আর না। আজ রাতেই আমার স্বামীকে বলব তোমার এই জঘন্য আচরণের কথা। এখন দূর হও এখান। থেকে–আর কোনও দিন এমুখো হোয়ো না।
ওর ক্রোধ আমার রক্তে আগুন লাগিয়ে দিলে। প্রচণ্ড রাগে যেন উন্মাদ হয়ে গেলাম আমি। ক্ষিপ্তের মতো ধেয়ে গিয়ে রান্নাঘরের মধ্যে সবার আগে চোখ পড়ল একটা জিনিস–একটা কুব্বি হাতুড়ি। এক ঝটকায় হাতে তুলে নিলাম হাতুড়িটা। দরজার সামনেই মুখোমুখি হয়ে গেলাম ওর সঙ্গে এবং সজোরে হাতুড়ির একটা মোক্ষম ঘা মারলাম ওর মাথায়। ও লুটিয়ে পড়তেই লাশটা টানতে টানতে নিয়ে এলাম রান্নাঘরের ভিতরে।
আমার বড় ভাগ্নি মারিহা চিৎকার শুনেই বারান্দায় দৌড়ে এসেছিল। এসেই দেখেছিল মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে তার মা। আর্তস্বরে চিৎকার করে উঠল ও সাহায্যের জন্যে। ওকেও এবার থামানো দরকার। দৌড়ে ওর ঘরে ঢুকে গলা টিপে মারবার চেষ্টা করলাম আমি। কিন্তু দেখলাম, কাজটা খুব সহজ নয়। শেষ পর্যন্ত দমবন্ধ করে ওকে মারতে পেরেছিলাম কিনা, সে সম্বন্ধেও নিশ্চিত নই। আমি। তখনি আয়নাটা ভেঙে ফেলে কাঁচের টুকরো তুলে নিয়ে ওর গলার শিরাটা কেটে দু-ফাঁক করে দিলাম।
রাগ পড়ে আসতেই মাথা সাফ হয়ে গেল। এবার আমার দুষ্কর্ম ঢেকেঢুকে প্রমাণাদি বিনষ্ট করে সটকান দেওয়ার বাসনাই প্রবল হয়ে উঠল মগজের মধ্যে। সারা বাড়িটার স্প্রে করে তেল ছড়িয়ে দিলাম। তারপর আগুন ধরিয়ে দিয়ে লম্বা দিলাম। যাওয়ার আগে অবশ্য কাবার্ড থেকে জড়োয়া গয়নাগুলো আত্মসাৎ করতে ভুলিনি।
তিরবেগে বেরিয়ে আসার সময়ে প্রবেশপথের কাছে দেখলাম ইয়ামিন খেলা করছে আপন মনে। ওকে কোলে তুলে নিলাম। শক্ত করে চেপে ধরলাম বুকের ওপর–উদ্দেশ্য ছিল রক্তের দাগ ওকে দিয়ে ঢেকে রাখা। রাস্তায় গাড়িতে উঠতে উঠতে ওকে বললাম, আমরা বেড়াতে যাচ্ছি।
গাড়ির মধ্যে তেমন ঝামেলা পোহাতে হয়নি আমাকে। কয়েকজন যাত্রী ইয়ামিনের সঙ্গে খেলা জুড়ে দিলে, হাসিঠাট্টাও বাদ গেল না। বাড়ি পৌঁছেই জামাকাপড় পালটে ফেললাম। তারপর রাস্তায় অন্যান্য ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ইয়ামিনকে খেলতে দিয়ে ফিরে এলাম বোনের বাড়িতে ব্যাপার কতদূর গড়িয়েছে তা দেখতে। তারপর তো আপনারা জানেনই।
আর তাই, খুনি সবসময়ে ফিরে আসে খুনের দৃশ্যে–এই আপ্তবাক্য অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে জোড়া খুন আবিষ্কার হওয়ার বারো ঘন্টার মধ্যে সমাধান করে ফেললাম কেসটার। যে চাবিকাঠি দিয়ে রহস্য ভেদ করলাম তা কিন্তু পুরোপুরি মনোবৈজ্ঞানিক।
