ভাবালুতা আর রোমন্থনের ফলে অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিলাম আমি। এবং অসহিষ্ণুতা এমনই একটা মনের গঠন যাকে প্রশ্রয় দেওয়া কোনও পুলিশম্যানেরই উচিত নয়। যেভাবেই হোক, বাচ্চাটাকে খুঁজে বের করতেই হবে। রহস্যের চাবিকাঠি সম্ভবত সে-ই। সারা দেশ জুড়ে তল্লাসি চালিয়ে কচি মেয়েটার হদিশ বার করার নির্দেশনামা বেরিয়ে গেল চারিদিকে। সজাগ হয়ে গেল প্রতিটি পুলিশ স্টেশন, রোড পেট্রল, ট্রাফিক অফিসার আর রেডিও স্টেশন। আর, হেড কোয়ার্টারে গোল হয়ে বসে নতুন খবরের প্রতীক্ষায় রইলাম আমরা।
অসহ্য শ্বাসরোধী সাসপেন্সে ভরা দু-দুটো ঘণ্টা কেটে গেল। কিন্তু একটা সূত্রও এসে পৌঁছোল আমাদের হাতে। প্রতিটি সেকেন্ড অতীত হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিল তিল করে বৃদ্ধি পাচ্ছে হত্যাকারীর সুযোগ আর সুবিধে-বৃদ্ধি পাচ্ছে বাচ্চাটির বিপদাশঙ্কা, অবশ্য তখনও যদি জীবিত থাকে সে।
যখন প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছি, ভাবছি, কোনও সূত্র আমাদের চোখ এড়িয়ে গেছে কিনা, ঠিক এমনি সময়ে রেডিও-রুম থেকে খবর পাওয়া গেল আমাদের বর্ণনামাফিক একটা খুকিকে দামাস্কাকের প্রাচীন অঞ্চলের শহরতলীতে একলা ঘুরতে দেখা যাচ্ছে। মক্কা রোডে পাওয়া গেছে তাকে।
তল্লাশি পর্ব শেষ হয়ে গেল, এমন কথা বিশ্বাস করতে মন চাইল না আমার। কিন্তু বাচ্চাটাকে নিয়ে আসার পর দেখা গেল বাস্তবিকই হারিয়ে যাওয়া খুকির চেহারার বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিলে যায় তার চেহারা। বাঁ বাহুর ওপর বাঁধা ছোট্ট পাতলা সোনার তাবিজটার ওপর আরবীয় ভাষায় তার নামও খোদাই করা ছিল। কিন্তু সাক্ষী হিসেবে খুদে ইয়ামিনকে কোনও কাজেই লাগানো গেল না। শ্রান্তি, ভয়, অশ্রু আর আধো আধো স্বরে কথা বলা–এই সবকিছুর ব্যুহ ভেদ করে সে যে কোথায় ছিল এবং কার সঙ্গে ছিল, তা জানা একেবারেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল আমাদের পক্ষে। ওর বিড়বিড় বকুনির মধ্যে বারবার এই একই শব্দ আউড়ে চলেছিল সে। শব্দটার অর্থ আমার মামা।
হুকুম চলে গেল এই মামা লোকটিকে খুঁজে পেতে আনার জন্যে। তাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার।
যে খবরের কাগজে অফিসে মামা কাজ করত, সেখান থেকে রিপোর্ট পাওয়া গেল, খুনের দিন সকালে অফিসেই কাজ করেছে সে। তারপর সে বাইরে যেতে চায় এবং অনুমতি পাওয়ার পর অফিস ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে সে। অফিস ত্যাগ করার পর তার গতিবিধি সম্পর্কে কোনও খবরই আর পেলাম না আমরা।
অপরাধ-বিশেষজ্ঞ মহলে একটা খুব চালু কথা আছে ও খুনি সব সময়েই ফিরে আসে খুনের দৃশ্যে। বহু পুরোনো এবং প্রায় সকলেরই জানা উক্তিটির মধ্যে কিছু মনোবৈজ্ঞানিক সত্য আছে। অপরাধ-ইতিহাসের পাতায় পাতায় ঠাসা আছে এরকম বিস্তর কেস যা পড়লেই দেখা যাবে কৌতূহল চরিতার্থ করার জন্যে ফেলে যাওয়া প্রমাণাদি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্যে, বিকৃত বাসনার পরিতৃপ্তির জন্যে, এমনকী অকুস্থলে এসে সুতীব্র অনুতাপের মধ্যে মনে শান্তিলাভের জন্যেও খুনের দৃশ্যে বারবার ফিরে আসে খুনিরা।
আর তাই, চারজন ডিটেকটিভ নিয়ে একটা দল তৈরি করলাম। ধোঁয়ায় মলিন প্রাসাদের আশপাশেই মোতায়েন হল এরা। বেশি সময় অপেক্ষা করতে হল না। অচিরেই ওদের একজন খবর দিলে প্রাসাদটার আশেপাশেই সন্দেহজনকভাবে ঘুরঘুর করছে অদ্ভুত প্রকৃতির একটা লোক।
এইভাবে রিপোর্ট পেশ করছিল অফিসারটি–শোকাবহ এই ঘটনা সম্বন্ধে লোকে কি বলাবলি করছে–তা শোনার নিবিড় আগ্রহ দেখা গেছে এই লোকটার হাবেভাবে। বিভিন্ন লোকের কাছে গিয়ে সে জিগ্যেস করে ঘটনা সম্বন্ধে তাদের মতামত কী। কিন্তু শুধু শুনেই যায় নিজের অভিমত একদম প্রকাশ করে না।
আমরা তিনজন খুকিকে নিয়ে রওনা হলাম প্রাসাদ অভিমুখে। গাড়ির দরজা খুলতে না খুলতেই–বাচ্চাটা লাফিয়ে নেমে পড়ল ফুটপাতের ওপর এবং পরক্ষণেই তিরবেগে দৌড়ে গিয়ে মামা, বলে ঝাঁপিয়ে পড়ল যার প্রসারিত বাহুযুগলের মধ্যে, সেই লোকটিকে নিয়েই পুঞ্জিভূত হয়ে উঠেছিল আমাদের সন্দেহের রাশি। সনাক্তকরণ যা হল, তা চমৎকার। আর কিছু দরকার নেই। লোকটাকে গ্রেপ্তার করে হেড কোয়ার্টারে নিলে এলাম সওয়াল জবাবের জন্যে।
সন্দেহভাজন ব্যক্তিটির নাম আবদুল ওহাব সাক্কা আমিনি। বয়স তিরিশের এদিকে। খুকির মায়ের ভাই সে অর্থাৎ চিফ ক্লার্কের সম্বন্ধী। সওয়াল জবাবের সময়ে তার কথাবার্তায় সুগভীর আত্মপ্রত্যয় লক্ষ্য করলাম। আগাগোড়া একই কথা বল বারবার বলে গেল সে। তার বোন নাকি তাকে টেলিফোন করেছিল। দারুণ গরম পড়েছিল, তাই সে তাকে জিগ্যেস করে ছোট্ট ইয়ামিনকে বরদা নদীর ধারে বিকেলে বেড়াতে নিয়ে যাবে কিনা। বাচ্চাটাকে দারুণ ভালোবাসে তার মামা, নিজের মেয়ের মতোই, তাই এ প্রস্তাব শুনে বিলক্ষণ উল্লসিত হয়েছিল মাতুল মহাপ্রভু। খুকিকে নেওয়ার জন্যে বাড়িতে এলে অস্বাভাবিক কিছুই নাকি চোখে পড়েনি তার। কোনও আগন্তুককে ও দেখেনি। প্রাঙ্গণে বসে তার বোন সেলাই করছিল। তার শান্ত সুন্দর প্রকৃতিতে কোনওরকম বৈলক্ষণ্যও লক্ষ্য করেনি সে।
এ কাহিনি যে সত্য, তা বলবৎ করতে পারে, সুনিশ্চিত করতে পারে, এমন কোনও লোককে হাজির করতে পারবে কি সে?
একটু ভেবে ও বললে–হ্যাঁ, পারবো। আমাদেরই কাগজের একজন রিপোর্টারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার। নাম তার হামিন। একসঙ্গে বরফ-কুচো দেওয়া শরবও খেয়েছিলাম আমরা।
