অনুসন্ধানে ঢিলে পড়ল না এতটুকুও। হাতুড়িটা যেখানে পাওয়া গেছিল, তার কাছেই পড়ে থাকতে দেখলাম একটা কাঁচের টুকরো। করাতের মতো এবড়ো-খেবড়ো হলেও রীতিমতো ধারাল কাঁচটা। আয়না ভেঙে যাওয়ায় টুকরোটা পড়েছিল মেঝের ওপর। আগুনের তাপেও ভেঙে পড়তে পারে আয়নাটা। অথবা, উঠোনে পড়ে থাকা তরুণী মেয়েটির জীবনের সরু সুতো কাটবার জন্যেও এই অভিনব ছুরিটাকে বানিয়ে নিয়েছিল হত্যাকারী।
খোঁড়াখুঁড়িতে বাধা পড়ল। করোনার তর রিপোর্ট দিলেন আমাকে। মাথায় চোট পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মারা গেছিল বর্ষীয়সী মহিলাটি। কিন্তু তার দেহটা যেভাবে পড়ে আছে, তা দেখে মনে হয় তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে রান্নাঘরের ভেতরে। তরুণী মেয়েটার গলা কাটবার আগে যে তাকে গলা টিপে মারা হয়েছিল, তার প্রমাণও পাওয়া গেছে। আর তার পরেই হতভাগিনীর লাশটাকে ফেলে দেওয়া হয় প্রাঙ্গণে।
দুই নারীর অঙ্গেই ছিল উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া মহার্ঘ অলংকারাদি। তাই লুঠতরাজ করার মোটিভ নিয়ে যে খুন করা হয়নি, সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হলাম আমরা। পোশাক এবং দেহে ধস্তাধস্তির কোনও চিহ্ন ছিল না। তাই, যৌনবাসনার পরিতৃপ্তির জন্যে যে এই জঘন্য খুনখারাপি–এমন সম্ভাবনাকেও বাতিল করতে হল।
তদন্ত পর্ব এই পর্যন্ত আসার পরই ভদ্রমহিলার স্বামীর অনুপস্থিতিটা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করলাম আমি। সে ভদ্রলোক কোথায়? এতক্ষণেও বউ আর মেয়ের এই শোচনীয় পরিণতি তার কানে পৌঁছয়নি, এমন কি হতে পারে? আমার তো তা বিশ্বাস হল না। খবর পাওয়া মাত্রই তো দুরন্ত আরব ঘোড়ার পিঠে চড়ে এতক্ষণে তার পৌঁছে যাওয়ার কথা অকুস্থলে। ব্যাপার তো সুবিধের মনে হচ্ছে না।
ঘড়ি দেখছি, এমন সময়ে একজন ডিটেকটিভ জানালে নিপাত্তা স্বামী মহাপ্রভু নাকি অফিসেই কাজ করছিলেন। দুঃসংবাদটা শোনামাত্র অজ্ঞান হয়ে গেছেন ভদ্রলোক। খবরটা শুনে তার এতক্ষণ পর্যন্ত অদৃশ্য থাকার একটা যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা পেলেও স্থির করলাম, ভদ্রলোক এখানে এসে পৌঁছোনোর পর থেকেই এ দৃশ্যের প্রতিক্রিয়া তাঁর ওপর কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তা সজাগ চোখে লক্ষ্য রাখতে হবে।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফটকের সামনে জমায়েত লোকের ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল একটা ট্যাক্সি। ভেতর থেকে রক্তহীন ফ্যাকাশে মুখে নামলেন এক ভদ্রলোক। তখনও ঠকঠক করে কঁপছিলেন আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন তিনি।
নামার সঙ্গে সঙ্গে হিস্টিরিয়া রুগির মতো প্রথমেই আর্ত সুরে চেঁচিয়ে উঠলেন উনি–আমার খুকি সে কোথায়?
কোন খুকি? শুধোই আমি। খুকি বলতে যদি তরুণী মেয়েটাকে বোঝান তো দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে–
না। না। মারিহা মারা গেছে, আমি জানি। কিন্তু ইয়ামিন, আমার বাচ্চা মেয়েটা, সে কোথায়?
এবার স্তম্ভিত হওয়ার পালা আমার। খুনের সংখ্যা কি তাহলে সবশুদ্ধ তিন? এমনও হতে পারে, চোখের সামনে মা আর দিদিকে খুন হতে দেখেছে বাচ্চা মেয়েটি। তারপর গায়েব করা হয়েছে তাকে। সম্ভবত এ খুনের একমাত্র মোটিভ কিডন্যাপ করাই। সে যাই হোক, নৃশংস খুনের সমাধানের আগে আমাদের জানার দরকার নিপাত্তা বাচ্চাটির পরিণতি এবং এই চিন্তাই প্রবল হয়ে উঠল আমাদের মগজে।
শোকবিহ্বল ভদ্রলোককে নার্ভ নিরুত্তেজ করার দাওয়াই খাইয়ে দিলাম এক ডোজ। অল্পক্ষণের মধ্যেই বাচ্চাটির চেহারার নিখুঁত বিবরণ পাওয়া গেল তার কাছ থেকে। বয়স তার সাড়ে তিন বছর। লম্বা লম্বা কালো চুল আঁটো করে বাঁধা। ধূসর চোখ। আধো-আধো স্বরে কথা বলার দরুন সব কথা বোঝা মুশকিল। পরনে কী ধরনের পোশাক ছিল, তা বলা সম্ভব হল না তার পক্ষে।
রাস্তার ভিড়ের মধ্যে হাঁটা শুরু করলাম আমি। ওদের মধ্যে অনেকেরই হয়তো কিছু কিছু বলার আছে। দেওয়ার মতো উপদেশও আছে বিস্তর। কিন্তু সবকিছু শোনার পর মূল্যবান কিছু পাওয়া গেল বলে মনে হল না আমার। বাড়ির মধ্যে কাউকে ঢুকতে বা বেরুতে কেউই দেখেনি। আগেই শুনেছিলাম, একটা আর্ত চিৎকার এদের কানে ভেসে এসেছিল। এই চিৎকার ছাড়া আর কোনওরকম সন্দেহজনক শব্দ কেউই শুনতে পায়নি। শহরতলীর এই অংশটাই যারা বাস করে, আইনের প্রতি অনুরাগ তাদের প্রত্যেকেরই আছে এবং সেই মার্জিত রুচি শান্তিপ্রিয় বাসিন্দাদের একজনের মনেও খটকা লাগতে পারে এরকম সন্দেহজনক কিছুই চোখে পড়েনি।
সবই বুঝলাম। কিন্তু এসব সত্ত্বেও দু-দুটো খুন হয়ে গেছে আজই। খুনের সংখ্যা দুই কেন, তিন হওয়াটাও অসম্ভব কিছু না। ভাবলাম দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠে মানব সভ্যতা। ভাবলাম কবে সেইদিন আসবে যেদিন তা হনন আর জিঘাংসার বহু ঊর্ধ্বে উঠে যেতে পারবে? ঋষিতুল্য ঐতিহাসিকরা গৌরবতিলক পরিয়েছেন দামাস্কাসের সুমহান ঐতিহ্যললাটে এই তথ্য জানিয়ে যে দামাস্কাসই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন শহর যেখানে সর্বপ্রথম গড়ে উঠেছিল মানুষের জনপদ। গৌরবময় এই দামাস্কাস শহরে অন্তত এই ধরনের পৈশাচিক খুনজখম যেন আর না হয়। আমাদেরও জ্ঞানের সীমা আরও ছড়িয়ে পড়া দরকার। রক্তক্ষরণ না করে, বর্বর প্রবৃত্তিকে সমূলে বিনষ্ট করে কীভাবে বাঁচার মতো বাঁচতে হয় তা আমাদের এখনও জানা দরকার। আমরা এখনও তা শিখিনি এবং চারপাশের কাণ্ডকারখানা থেকেই তা বোঝা যায় হাড়ে হাড়ে।
