প্রথম রিপোর্ট পাওয়ার পর যে ঠিকানাটা টুকে রেখেছিলাম, তার ওপর এবার চোখ পড়তেই চিনতে পারলাম বাড়িটাকে। সেকেলে আমলের যে ধরনের জমজমাট আরব্য ভবনগুলো দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে দামাস্কাসের বুক থেকে, এ প্রাসাদটি তাদেরই অন্যতম। উঁচু-উঁচু পাঁচিলের পাশ দিয়ে যেতে যেতে কতবার জালিকাটা ফটকের মধ্যে দিয়ে দেখেছি ভেতরকার শান্ত সুন্দর শুচিময় উঠোনটিকে। প্রাসাদটাকে বেষ্টন করে থাকত প্রাঙ্গণটা। বহু শতাব্দী আগে সোনা আর রেশম দিয়ে বোনা মূল্যবান বস্ত্রের জন্য যখন দিকে দিকে সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল আমাদের এই শহরটির তখন এক ধনবান ব্রোকেড ব্যবসায়ী প্রাসাদটা তৈরি করেছিলেন। কি লজ্জার কথা! এতদিন পর গৌরবময় অতীতের এত চমৎকার নিদর্শনটাকেই কিনা গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে সর্বভুক আগুনের দেবতা। কিন্তু এই অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে যে মৃত্যুও জড়িয়ে পড়েছে, তা মনে পড়তেই রোমান্টিক রোমন্থনকে নির্বাসন দিলাম মন থেকে।
অকুস্থলে পৌঁছেও করবার বিশেষ কিছু ছিল না। কেন না, তখনও আগুনকে বাগে আনতেই ব্যস্ত দমকলবাহিনী। ফটকের বাইরে দেখি কাতারে কাতারে লোক দাঁড়িয়ে গেছে। কয়েকজন বললে বটে কে যেন আর্তস্বরে চেঁচিয়ে উঠে সাহায্য চেয়েছিল। কিন্তু পুঞ্জ পুঞ্জ ধোঁয়ার মেঘ ভেদ করে কিছুই করা সম্ভব হয়নি ওদের পক্ষে।
যে মুহূর্তে সম্ভব হল প্রাঙ্গণে পা দেওয়ার, আর একটা মুহূর্তও বাজে সময় নষ্ট করলাম না। ভেতরে গিয়ে দেখলাম পরমাসুন্দরী এক অষ্টাদশী তন্বী মেয়ের দেহ। যদিও বিস্তর ঝুল আর ভুষোয় মলিন হয়ে গিয়েছিল তার মুখশ্রী, যদিও পলকহীন বিস্ফারিত কালো চোখের মণি দুটো স্থির হয়েছিল নীল আকাশের পানে–তবুও এক নজরে বোঝা গেল বাস্তবিকই এরকম আলোকসুন্দর কান্তি বড় একটা দেখা যায় না। পরনে দামাস্কাসের পোশাক। টুকটুকে লাল রঙের রেশম। নরম। নমনীয়। মণিবদ্ধ আর গলায় সযত্ন খচিত বাহারি জড়োয়া অলংকার। কিন্তু তার ফ্যাকাশে নিরক্ত গলায় যে জিনিসটি নেকলেসের মতো অত সুন্দর ছিল না, তা হচ্ছে একটা দগদগে কুৎসিত ক্ষতচিহ্ন। এবং এই ক্ষতই নিভিয়ে দিয়েছে মেয়েটির জীবনের প্রদীপ।
নিষ্প্রাণ দেহটার পাশে নতজানু হয়ে বসে পড়েছিলাম। অবাক হয়ে গেছিলাম আমার অনুভূতিপ্রবণতা দেখে। বছরের পর বছর খুন-জখম হিংসা-জিঘাংসা নিয়ে নাড়াচাড়া করে এসেও এখনও আমার কোমল অনুভূতির ধারগুলো দেখলাম ভোতা হয়ে যায়নি। আচম্বিতে একটা চিৎকার শুনলাম। শব্দটা এল রান্নাঘর থেকে। তখনও গ-গ করে ধোঁয়া বেরুচ্ছিল ঘরটা থেকে। চটপট এগিয়ে দেখি আরও একটা মহিলার লাশের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে দমকলবাহিনীর দুজন লোক। যদিও আগুনের নিষ্ঠুর জিহ্বাস্পর্শে হতভাগিনীর দেহের খানিকটা অংশ পুড়ে গিয়েছিল, তবুও উঠোনের মরা মেয়েটির চাইতে এই মহিলার বয়স যে অনেক বেশি তা বুঝতে মোটেই বেগ পেতে হল না আমাকে। আরও বুঝলাম, জীবিতকালে অল্পবয়েসি মেয়েটির চাইতেও অনেক বেশি চটকদার ছিল মহিলাটির তনুশ্রী। সযত্নে প্রসাধন করা কঁচা-পাকা চুলের মধ্যে দিয়ে দেখা যাচ্ছিল একটা বিশ্রী আঘাত-চিহ্ন। এবং সে আঘাত হানা হয়েছে যে অত্যন্ত গুরুভার একটা হাতিয়ার দিয়ে, তা অতি সহজেই বুঝতে পারলাম আমি।
একলা আগুনকেই অভিশাপ দিচ্ছিলাম সবাই মিলে। এবার দু-একটা নৃশংস খুনের তদন্তের গুরুদায়িত্ব এসে পড়ল কাঁধে।
বাইরের জনতাকে এতক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করছিল আমাদের গোয়েন্দারা। তাইতেই জানা গেল জমকালো এই ভবনটার বর্তমান বাসিন্দা ছিল পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ডাকাতি ডিভিশনের চিফ ক্লার্ক, তার বউ আর মেয়ে। পুলিশের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র বেরিয়ে পড়তেই সম্ভবপর একটা মোটিভের অঙ্কুর দেখা গেল আমার মধ্যে। প্রতিহিংসার জন্যেই কি তবে এই হনন-পন্থা? প্রতিহিংসা পাগল কোনও বিকৃত মগজই কি তাহলে পুলিশ বাহিনীরই একজনের দেনা-পাওয়া মিটিয়ে দিয়ে গেল এই ভাবে?
হেড কোয়ার্টারে একটা ফোন করতেই তৎক্ষণাৎ অকুস্থলে হাজির হলেন পুলিশ কমিশনার, করোনার, বিচার সম্পর্কীয় সাক্ষ্য প্রমাণদির অ্যাডমিনিস্ট্রেটর এবং নরহত্যা স্কোয়াডের হোমরাচোমরারা। সবাই মিলে একসঙ্গে শুরু করলাম তাল তাল বাষ্পে ভরা প্রাসাদের ভেতরে চুলচেরা অনুসন্ধান পর্ব।
দেখে শুনে বেশ বোঝা গেল খুনের সব চিহ্ন মুছে দেওয়ার জন্যেই আগুনের সাহায্য নিয়েছিল খুনি। নিখুঁত হয়েছিল তার পরিকল্পনা। আগুনের শিখা যেটুকু নষ্ট করতে পারেনি ফায়ার ব্রিগেডের কেমিক্যালস আর জলেই তার দফারফা হয়ে গেছে।
মিনিট পনেরো ধরে জলে-ভেজা রাবিশ খোঁজার পর শেষকালে রান্নাঘরে একটা সূত্র পাওয়া গেল। মাংস থেঁতো করে কুব্বি বানানোর জন্যে আমরা আরবীয়রা, যে ধরনের কাঠের হাতুড়ি ব্যবহার করি, সেই রকম একটা হাতুড়ি পেলাম আমরা। হাতুড়িটার ওজন পাউন্ড সাতেকের কম তো নয়ই। মেঝের ওপর যে জায়গায় তা পড়েছিল, তা দেখেই মনে হল বর্ষীয়সী মহিলার মাথায় ওই মারাত্মক আঘাত হানার পরেই হাতুড়িটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল খুনিটা। আধপোড়া হাতুড়িটা হাতে নিয়ে মনটা কীরকম যেন হয়ে গেল। ভাবলাম আর কি আমি সুস্বাদু কুব্বি দিয়ে তারিয়ে তারিয়ে ভাত খেতে পারব? আমার রন্ধন পটিয়সী বউয়ের এটা আবার স্পেশাল খানা। মনের পর্দায় চকিতে ভেসে গেল কটি কথা–যে জিনিস দিয়ে এমন মুখরোচক খানা বানানো যায়, তা দিয়ে প্রয়োজন হলে নরহত্যাও করা যায় একইরকম পরিপাটিভাবে।
