নমস্কার-টমস্কার শেষ হওয়ার পর শশাঙ্কবাবু বললেন, মৃগাঙ্কবাবু, মিসেস রায়, আপনারা দুজনেই এগারোই আষাঢ় আমার পর্ণ কুটিরে পায়ের ধুলো দেবেন। এই রইল পত্র।
বলে একখানা ভারী হ্যান্ডমেড পেপারের হলুদ রঙের খাম রাখলেন টেবিলে। খামের ওপরে বাহারি ছাঁদে লেখা শুভবিবাহ।
কার বিয়ে? নিরীহ কণ্ঠে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল কবিতা।
আমার মেয়ের।
অনিতার? আমি হতভম্ব। পাত্র কে?
অজিত।
অজিত!
উঠে পড়লেন শশাঙ্কবাবু, বড় ভালো ছেলে। চলি আজ। আসবেন কিন্তু।
ইন্দ্রনাথ দরজা পর্যন্ত শশাঙ্কবাবুকে এগিয়ে দিয়ে এসে বসল কবিতার পাশে। ধীরে-সুস্থে একটা কচি ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললে, কফিটা কি না চাইলে দেবে না?
কবিতা শুনেছিল অনিতা কাহিনি। তাই হাঁ করে চেয়েছিল ইন্দ্রনাথের পানে। এখন ঘোর সন্দেহ দেখা দিল চাহনির মধ্যে। সন্দেহ আমারও হল। ইন্দ্রনাথ জানে এই হঠাৎ বিয়ের রহস্য।
শক্ত গলায় বললে কবিতা, কফি পরে। আগে বল সব জেনেশুনে অনিতাকে অজিত বিয়ে করছে কেন? ভালোবেসে?
তা তো বটেই। ঘটকালিটা অবশ্য আমাকেই করতে হয়েছে। একটা কথা বলতেই রাজি হয়ে গেল অজিত।
কী কথা?
বললাম অজিতবাবু, আমি সব জানি। শশাঙ্কবাবু বা অনিতা কোনওদিন জানতে পারবে না। যদি আপনি অনিতাকে বিয়ে করেন সামনের লগ্নেই।
চোখ বড় বড় করে কবিতা বললে, ঠাকুরপো, তুমি কি বলতে চাও অজিত—
আরে হ্যাঁ। বন্ধুবান্ধব নিয়ে প্ল্যান করেছিল। বিকৃতি আর কাকে বলে?
কী বলছ তুমি।
ঠিকই বলছি বউদি। একলকাতায় এরকম অসম্ভব কাণ্ড নিত্য ঘটছে, কে তার খবর রাখে। অনিতা-অজিতের প্রেমে খাদ নেই। কিন্তু অজিত অন্য রসের সন্ধানে এই প্ল্যান করেছিল। যাকগে সেসব নোংরা ব্যাপার। যখনি শুনলাম, হিপনোটাইজড় হতে অনিতা পাক্কা পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় নিয়েছে, তখনি বুঝলাম ওর অবচেতন মনে পুরুষটার চেহারা চাপা পড়ে রয়েছে এবং অবচেতন মনের কারসাজিতেই সম্মোহিত হয়ে তাকে সে ধরিয়ে দিতে চাইছে না। ভেতর থেকে ইচ্ছা না থাকলে, কখনওই সম্মোহিত হওয়া যায় না। অবচেতন মনের কারচুপির খবর সজ্ঞান মন পর্যন্ত পোঁছয় না বলেই অনিতা সজ্ঞানে চেষ্টা করেও অজিতের চেহারা মনে করতে পারেনি।
কিন্তু সম্মোহিত হয়ে সে বললে, ভীষণ লম্বা একটা লোক, অনেকটা অজিতের মতো চেহারা, তাকে চেপে ধরেছিল। তখন সে তার গলা কামড়ে দেয়।
ক্লু পেয়ে গেলাম। অজিতকে নিয়ে ওজােনটোলজিস্টের কাছে গেলাম। কামড়ের ক্ষতচিহ্নে দাঁতের যে ছাপ পাওয়া গেল, তার সঙ্গে হুবহু মিলে গেল অনিতার দাঁতের ছাপ। হিপনোটাইজ করিয়ে যা আঁচ করেছিলাম ওডোনটোলজিস্ট দিয়ে তা প্রমাণ করলাম। কিন্তু কোর্টে গেলাম না।
কেন গেলে না? ওই রকম একটা জানোয়ারকে তেড়ে উঠল কবিতা।
বউদি, বিয়ে ভাঙা সহজ, দেওয়া কঠিন। তাছাড়া আমরা চোর-ডাকাত ধরি সংসারকে সুন্দর করার জন্যে, মানুষকে সুখী করার জন্যে। তাই নয় কি? অনিতা বা শশাঙ্কবাবু কেউই কোনওদিন জানবে না অজিত প্রথমে পৈশাচ বিয়ের পর ব্রাহ্ম বিয়ে করেছে অনিতাকে।
পৈশাচ বিয়ে? ভুরু তোলে কবিতা।
তা ছাড়া আর কী? নিউ এম্পায়ার থেকে বেরোনোর আগে দুজনেই যে একটু সুরাপান করেছিল। পারমিসিভ সোসাইটি তো-অনিতা পরে স্বীকার করেছিল আমার কাছে।
গল্পের শেষে আপনাদের একটা খবর জানিয়ে রাখি। ভারতে এই প্রথম সম্মোহন আর দাঁতের ছাপ দিয়ে অপরাধী সনাক্ত করল ইন্দ্রনাথ রুদ্র।
* দৈনিক বসুমতী পত্রিকায় প্রকাশিত (শারদীয় সংখ্যা, ১৩৮৫)
দামাস্কাসের উগ্র সূর্য
গ্রীষ্মের মাসগুলোয় দুপুরের সূর্য বড়ই নির্দয়ভাবে কিরণ ঢালতে থাকে আমাদের শহরের নতুন না আর পুরোনো বাড়ির শীর্ষে, মসজিদের সাদা চুড়োয় আর মৌচাকের মতো গম্বুজগুলোয়। জীবনের চাঞ্চল্য একেবারেই উবে যায় শহরের বুক থেকে, খাঁ-খাঁ করে পথঘাট। দামাস্কাসের পুরোনো অঞ্চলের ছাদ-ঢাকা সঙ্কীর্ণ রাস্তায় অলসভাবে গাধাগুলোকে টানতে টানতে নিয়ে যায় শুধু কয়েকজন ফেজ টুপি-পা বেদুইন। এমনকী সাদা গমগমে হট্টগোলে ভরা বাজারগুলো, যেখানে টাকাকড়ির ভাবনা-চিন্তা ছাড়া আর কিছুই স্থান পায় না, সেই বাজারগুলোও ঝিমিয়ে পড়ে। সারাদিন ধরে আগুন বর্ষণে ক্লান্ত তপনদেব যতক্ষণ না পশ্চিমে হেলে পড়ে, ততক্ষণে তলিয়ে থাকে সুপ্তির নিতলে।
কিন্তু এই ঝিমুনির অবসরেই তৎপর হয়ে ওঠার সুযোগ পায় দু-ধরনের অপরাধী : যে প্রকৃতির মানুষ শহরের কর্মবিরতি আর বিশ্রামক্ষণের সুযোগ নিয়ে খুন-জখম রাহাজানি আর হরেক রকম অপকর্মে মেতে ওঠে, তারা, এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে একটি অমানুষ তস্কর–আগুন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দামাস্কাস শহরের বুকে নির্বিবাদে লুঠতরাজ চালিয়েছে এই অমানুষ অপরাধীটি এবং দু-দুবার জমির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল এত বড় শহরটাকে।
কোনও রকম তঞ্চকতা না করে সবিনয়ে জানাচ্ছি, প্রথম অপরাধীর জন্যে যতখানি হুঁশিয়ার দামাস্কাসের পুলিশ বাহিনী, ঠিক ততখানিই দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রেও।
জুলাইয়ের সেই দিনটিতে প্রথম যে খবরটি এসে পৌঁছাল পুলিশ হেড কোয়ার্টারে তা হল একটি আগুন লাগার খবর। শৌখিন শহরতলী সৌকসারুজার একটা বাড়িতে অগ্নিদেবের তাণ্ডব নৃত্য দেখা গেছে। চিরাচরিতভাবে নিজেদের মধ্যেই বলাবলি করতে লাগলাম আগুনের উৎস সম্বন্ধে। আগুন লাগতে পারে দামাস্কাসের আগুন অভিশাপের জন্যে অথবা নেহাতই অসাবধান হওয়ার ফলে। কিন্তু ক্রিমিনাল ইনভেসটিগেশন ডিভিশনের চিফ হিসাবে ফোনের জবাব দিতে গিয়েই শুনলাম একটা উত্তেজিত কণ্ঠস্বর। সৌরুজা থেকে একজন পুলিশম্যান বলছে–চিফ, এ শুধু আগুন নয়, আরো কিছু। ফটকের ফাঁক দিয়ে দেখতে পাচ্ছি উঠোনের উপর পড়ে রয়েছে একটা মেয়ের দেহ। ধোঁয়ার জন্যে আর কিছু দেখা যাচ্ছে না।
