আবার চোখ ফিরিয়ে নিল অনিতা। চঞ্চল হল আঙুলগুলো।
সেকেন্ড কয়েক চুপ করে থেকে বলল, মাটি কেটে পাহাড়ের মতো যেখানে ঢেলে রাখা হয়েছে, তার আড়ালে বসেছিলাম ঘণ্টাদেড়েক। ওদিকে আলো নেই। কয়েকটা গাছের ঘুপসি জটলা। হঠাৎ কথা আটকে গেল অনিতার।
নরম গলায় ইন্দ্র বললে, লজ্জা করো না, বল আমার শোনা দরকার।
হঠাৎ অজিত ভীষণ চেঁচিয়ে উঠল, কে? কে? সঙ্গে-সঙ্গে কারা যেন মাটির ঢিবি বেয়ে হুড়মুড় করে লাফিয়ে পড়ল আমাদের ওপর। দমাস করে একটা আওয়াজ শুনলাম–অজিত ককিয়ে উঠল। আমাকে কয়েকজন চক্ষের নিমেষে ধরে মুখ, চোখ, হাত, পা বেঁধে ফেলল। চেঁচাতেও পারলাম না। তারপর–দু-চোখ বন্ধ করল অনিতা। আর কথা বলতে পারছে না। ঠোঁট দুটো কেবল থরথর করে কঁপছে।
ইন্দ্রনাথ বললে, যাক আর বলতে হবে না। কাউকে দেখোনি?
তারার আলোয় দেখেছিলাম, কিন্তু কিছু মনে পড়ছে না। চোখ বেঁধে ফেলার আগে কিন্তু কাউকে দেখিনি।
তবে কখন দেখেছিলে?
অনেকক্ষণ পরে…গোঙাচ্ছিলাম…চোখের বাঁধন খুলে দিল…অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে একজন আমাকে…কিন্তু কিছুতেই তার মুখটা মনে করতে পারছি না।
তুমি তাকে দেখেছিলে? ঝুঁকে পড়ল ইন্দ্রনাথ। দুই চোখ খরখরে।
হ্যাঁ। কিন্তু আমি তখন..আমি তখন…তারপর আর কিছু মনে নেই।
ঠোঁট কামড়ে মাথা নীচু করে রইল ইন্দ্রনাথ। শক্ত হয়ে উঠল চোয়ালের হাড়।
বললে, তারপর?
চলন্ত ট্যাক্সির পেছনে জ্ঞান ফিরল। অজিতের কোলে মাথা রেখে শুয়েছিলাম।
অজিত জখম হয়েছিল?
গাল কেটে রক্ত পড়ছিল। রুমাল দিয়ে চেপেছিল। একা বলে অতজনের সঙ্গে পারেনি।
মৃগ, শশাঙ্কবাবুকে ডাক।
উঠে গিয়ে ডেকে নিয়ে এলাম শশাঙ্ক সান্যালকে। চুরুট কামড়ে ধরে স্বভাবতী কণ্ঠে বললেন, স্কাউন্ডেলদের কি ধরা যাবে না, ইন্দ্রনাথবাবু?
সম্ভব নয়। অনিতা তো কাউকেই মনে করতে পারছে না। অজিত কি কাউকে দেখেছে?
না। ওরও চোখ, হাত, পা, মুখ বাঁধা ছিল।
একটা উপায় আছে–শেষ চেষ্টা করতে পারি।
বলুন।
বলল ইন্দ্রনাথ। চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল শশাঙ্ক সান্যালের, এও কি সম্ভব?
খুবই সম্ভব।
বেশ ব্যবস্থা করুন।
.
সম্মোহন চিকিৎসক হিমাংশু দলুইয়ের চেম্বারে পৌঁছলাম সন্ধেবেলা।
উনি পথ চেয়ে বসেছিলেন। অনিতাকে একটা ইজিচেয়ারে আড় করে শুইয়ে দিলেন। ঘরে নরম আলো জ্বেলে দিলেন। তারপর ময়দানের কাহিনি আর একবার শুনলেন।
চেনে ঝোলানো চকচকে একটা চাকতি বার করে বললেন, সম্মোহন এবার শুরু হবে। আপনারা দয়া করে–
উঠে পড়লাম আমি, ইন্দ্রনাথ আর শশাঙ্কবাবু। বসলাম বাইরের ঘরে।
ঘণ্টাখানেক পরে ডাক পড়ল আমাদের। অনিতা আড় হয়ে শুয়ে। এইমাত্র সম্মোহিত হয়েছে বলে মনেই হয় না।
ডাক্তার বললেন, পঁয়তাল্লিশ মিনিট লেগেছে ওকে হিপনোটাইজ করতে। এত সময় কখনও লাগে না। যে হিপনোটাইজড় হবে, সে যদি সহজ হতে না পারে, দেরি হবেই।
অনিতার আর দোষ কী বলুন, সহানুভূতির স্বরে বললে ইন্দ্রনাথ। শেষ যাকে দেখেছিল, তার চেহারা কি মনে করতে পেরেছে?
তা পেরেছে।
উৎসুক হল অনিতা নিজেও। আমরা তো বটেই।
ডাক্তার একটা সাদা কাগজ টেবিল থেকে নিয়ে চার ভাঁজ করে ইন্দ্রনাথের হাতে দিলেন।
ভাঁজ খুলে পড়ল ইন্দ্রনাথ। ফের ভাঁজ করে পকেটে রেখে বলল, চল মৃগ, অজিতকে জিগ্যেস করে আসি তার আবার কাউকে মনে পড়ে কি না।
.
লং মেন্স ক্লাবেই পাওয়া গেল অজিত সামুইকে।
আখাম্বা লম্বা বটে চেহারাখানা। গায়ে সে অনুপাতে মাংস বা চর্বি খুব কম। দড়ির মতো পাকানো হাত আর পা। চোয়ালের হাড় আর গালের হনু ঠেলে বেরিয়ে আসছে। ঘরের একটিমাত্র টেবিলে বসে ঘাড় হেঁট করে কী লিখছিল, আমি আর ইন্দ্রনাথ ঢুকতেই প্রথমে চোখ তুলল–তারপরেই সটান উঠে দাঁড়াল। লক্ষ করলাম বাঁ-গালে একটা স্টিকিং প্লাস্টার লাগানো।
আপনারা?
পেশায় আমি ডিটেকটিভ, নাম ইন্দ্রনাথ রুদ্র। আর ইনি হলেন আমার ডক্টর ওয়াটসন। মৃগাঙ্ক রায়, বলে তক্তপেপাশে বসতে-বসতে বললে ইন্দ্র, আপনার কাছে কেন এসেছি বুঝতেই পারছেন। অনিতা কাউকেই মনে করতে পারছে না। আপনি কি পারবেন?
অসম্ভব। ওই অন্ধকারে আচমকা ঘাড়ে এসে না পড়লে বাছাধনদের টের পাইয়ে দিতাম।
আপনাকেও বেঁধে ফেলেছিল শুনলাম।
আষ্টেপৃষ্ঠে।
মার খাওয়ার পর?
মেরেছি আমিও, গালের স্টিকিং প্লাস্টারে হাত বুলিয়ে নিল অজিত। প্রথম ঘুসিটা সামলাতে পারিনি।
গাল থেকে রক্ত ঝরছিল কেন?
কামড়ে দিয়েছিল যে।
কামড়ে দিয়েছিল! বলেন কী?
একজনকে জাপটে ধরেছিলাম। এমন কামড়ে ধরল যে—
ছেড়ে দিলেন। কে কামড়েছিল দেখেননি?
বললাম তো ওই অন্ধকারে–
এক কাজ করুন। আমার সঙ্গে স্পেশ্যালিস্টের কাছে চলুন। কামড়ের দাগ দেখে দাঁতের চেহারা তিনি বার করে ফেলবেন। কিছুটা সাহায্য তাতে হবে। দাগি ক্রিমিন্যাল হলে ধরা যাবে।
চোখ কুঁচকে তাকাল অজিত, কামড়ের দাগ থেকে দাঁতের চেহারা বার করা যায়?
নিশ্চয় যায় অজিতবাবু। বিজ্ঞানে সব হয়। ফোরেনসিক ওড়োনটোলজির নাম শোনেননি বোধ হয়?
না।
ক্যালকাটায় ওজােনটোলজিস্ট একজনই আছেন। ডাক্তার বিমল ভটচাজ। আমার বিশেষ বন্ধু। আসবেন?
চলুন।
দাঁতের কামড়ের বিশেষজ্ঞ শেষ পর্যন্ত কী রিপোর্ট দিয়েছিলেন ইন্দ্রনাথকে, আমার তা দেখার সৌভাগ্য হয়নি। এ-কেসে যে শেষ পর্যন্ত বন্ধুবরকে মুখে চুনকালি মাখতে হবে, তা বুঝে আমিও আর খুঁচিয়ে কিছু জিগ্যেস করিনি। দিন কয়েক পরে সস্ত্রীক বসে কফি পান করছি, এমন সময় ঘরে ঢুকল ইন্দ্রনাথ, পেছনে শশাঙ্ক সান্যাল।
