আবার কেঁদে উঠল নিভা। বিদায়কালীন শেষ চুম্বনে কী জাদু ছিল কে জানে, নিভা আর নিজেকে রুখতে পারল না। লাজলজ্জা ভুলে গলা জড়িয়ে ধরল নিখিলের।
একরকম জোর করেই নিজেকে ছাড়িয়ে নিল নিখিল। ঠেলে দিল নিভাকে দণ্ডায়মান উড়োজাহাজের দিকে। কাঁদতে কাঁদতে এগুলো নিভা। এয়ারপোর্টের জোর হাওয়ায় নিশানের মতো উড়তে লাগল ওর ব্লু জর্জেটের আঁচল।
শেষদৃশ্য–বলল নিখিলের মন।
.
কয়েক মিনিট পর।
গাড়িতে এসে বসল নিখিল। মনটা বলাকার মতো পাখা মেলে উড়ে যেতে চাইছে সুনীল গগনে। মুক্তি! মুক্তি! চিরমুক্তি!
ইঞ্জিন গর্জে উঠেছে। ওর এক্সপার্ট হাতের মোচড়ে প্রবল পাক খেয়ে গাড়ি ছুটেছে এয়ারপোর্টের বাইরে। ভি-আই-পি রোডে এসে সিগারেট নিতে সামনের খোপে হাত দিল নিখিল। হাতে ঠেকল একটা ভাজ করা কাগজ।
লাল কাগজ। চিঠি। লিখেছে নিভা।
প্রিয়তম,
আমি জানি তুমি আর আমাকে চাও না। কিন্তু বিশ্বাস কর আর নাই কর– আমি তোমাকে ভালোবাসি। বোম্বাই থেকে ফিরে এসে তোমাকে আর দেখতে পাব কি না জানি না। কিন্তু আমার ভালোবাসার চিহ্ন স্বরূপ তোমার দেওয়া জুয়েল বক্স তোমাকেই দিয়ে গেলাম। ফের যদি বিয়ে করতে মন চায় তো আমার সতীনকে দিও।
নিভা।
আঁতকে উঠল নিখিল। জুয়েল বক্স! গাড়ির মধ্যে!
ব্রেক কষল তৎক্ষণাৎ। কিন্তু কোথায়…কোথায় সেই জুয়েল বক্স?
সময় নেই…আর সময় নেই…নিজের হাতে জুয়েল বক্সের মধ্যে টাইম ফিউজ বোমা রেখেছে নিখিল…উড়ন্ত অবস্থাতেই যাতে প্লেন ফেটে উড়ে যায় যাতে প্লেনের মধ্যে নিভাননীর নরম তনুটা ছিঁড়ে পুড়ে টুকরো-টুকরো হয়ে শূন্যে ছড়িয়ে যায়–তাইতো তার সাধের রত্নবাক্সের মধ্যে টাইমবোমা রেখেছিল নিখিল। তারিফ করার মতো বউ নিধনের পরিকল্পনা কি শেষে বুমেরাং হয়ে যাবে? জুয়েল বক্স ফাটবে তারই গাড়ির মধ্যে–সেই সঙ্গে নিশ্চিহ্ন হবে নিখিল?…
কোথায় জুয়েল বক্স? কোথায় সেই অভিশপ্ত জুয়েল বক্স? বি
দ্যুৎ চমকের মতো এতগুলো ভাবনা ঝলসে উঠল মনের আকাশে। বি
স্ফোরণটা ঘটল সঙ্গে-সঙ্গে।
গাড়ি আর নিখিলের দেহ অনেক টুকরো হয়ে ছড়িয়ে গেল রাস্তার দুপাশে।
*অপ্রকাশিত।
দাঁত থাকতে
শুকনো মুখে অনিতা জানলা দিয়ে চেয়ে রইল আকাশের দিকে। মুখ দেখে কে বলবে মাত্র বারো ঘণ্টা আগে ময়দানের অন্ধকারে নরপশুদের শিকার হতে হয়েছিল তাকে।
অনিতার বাবা রোটারিয়ান শশাঙ্ক সান্যাল পাকা গোঁফে তা দিয়ে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন, ইন্দ্রনাথবাবু, আমি সেকেলে হলে কী হবে, মেয়ে বড় হচ্ছে পারমিসিভ সোসাইটির হাওয়ায়। ছেলেমেয়ের মধ্যে মেলামেশা আমিও দোষের মধ্যে দেখি না। কালকে ও অজিতকে নিয়ে গিয়েছিল বেড়াতে। ভিক্টোরিয়ার উলটোদিকে প্যারেড গ্রাউন্ডে সি এম ডি এ যেখানে পাতালরেলের কাজ চালাচ্ছে সেইদিকে। তারপর কী হয়েছে অনিতার মুখেই বরং শুনুন। আমি বাইরে যাচ্ছি।
জুতো মসমঁসিয়ে বেরিয়ে গেলেন বৃদ্ধ শশাঙ্ক সান্যাল। লম্বা, রোগা, খানদানি চেহারা। এই বয়সেও আদ্দির পাঞ্জাবি গিলে করে পরেন, ধুতি চুনোট করেন, হাতে মালাক্কা বেতের ছড়ি নিয়ে হাঁটেন। বারান্দায় দেশলাই ঘষার আওয়াজ হল। চুরুটের গন্ধ পেলাম।
অনিতা জানলা দিয়ে ঠায় তাকিয়ে ছিল বাইরে। বাবা বাইরে গেলেন। ঘরে আমরা দুজন সদ্য পরিচিত পুরুষ–অথচ একবার ফিরেও তাকাল না কাল রাতের ভয়াবহ ওই অভিজ্ঞতায় স্নায়ু চোট খেয়েছে নিশ্চয়–বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে না।
নরম গলায় ইন্দ্র বললে, অনিতা।
অনিতা ফিরে তাকাল। অষ্টাদশী সুন্দরী, লাবণ্যময়ী। ধারাল মুখ। ঠোঁঠে শুষ্ক হাসি টেনে এনে বলল, বলুন।
তুমি বলছি বলে রাগ করছ না তো?
না, না।
অজিত কে অনিতা?
স্মার্ট মেয়ে বটে। একটু দ্বিধা না করে বললে, কলেজ ফ্রেন্ডলাইফ পার্টনার করব ভাবছি। কিন্তু এই কাণ্ডটা হয়ে যাওয়ার পর–
কী হয়েছিল, খুলে বলবে?
চোখ ফিরিয়ে ফের জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল অনিতা।
মাত্র আঠারো বছর বয়স, কিন্তু তিনগুণ বয়সের পুরুষকেও আকর্ষণ করার মতো উপাদান শরীরে জড়ো হয়েছে। সোনা-সোনা রঙের ঘাড়-ছাঁটা এক মাথা চুল, ঠোঁটের ভঙ্গিমায় আদুরে-আদুরে ভাব, বুটিদার হলুদ ঢিলেহাতা পাঞ্জাবি আর বেগুনি স্ন্যাকসের দৌলতে অষ্টাদশী সৌন্দর্য বেশ প্রকট।
একটু ধার-ঘষা গলায় বললে, নিউ এম্পায়ারে ইভিনিং শো-তে এক্সরসিস্ট দেখে আমি আর অজিত গিয়েছিলাম ময়দানে–আমার স্কুটারে।
তুমি স্কুটার চালাও?
হ্যাঁ। অজিত অসভ্য রকমের লম্বা বলে ও-ই চালিয়ে নিয়ে গেল।
কত লম্বা?
চোখ ফিরিয়ে তাকাল অনিতা। এই প্রথম ওর ক্লান্ত চোখে দুষ্ট ঝিলিক লক্ষ করলাম, বললে বিশ্বাস করবেন না। সাত ফুট দুইঞ্চি।
সাত ফুট দুইঞ্চি!
লং মেন্স ক্লাবের ও ফাউন্ডার সেক্রেটারি।
কী ক্লাব বললে?
এবার হেসে বলল অনিতা।
বললে–লং মেন্স ক্লাব–লম্বা লোকদের ক্লাব। কলকাতায় এই প্রথম। অজিত নিজে উদ্যোগী হয়ে প্রতিষ্ঠা করেছে।
হাঁ করে শুনছিল ইন্দ্রনাথ, ঠিকানাটা দিও তো। দেখব আমার ঠাঁই হয় কি না।
ওর তালঢ্যাঙা চেহারার পানে তাকিয়ে অনিতা বললে, তা হবে। সাত বাই তিন, কৈলাশ মুখুজ্যে স্ট্রিট, কলকাতা সাত।
ঠিকানাটা লিখে নিল ইন্দ্রনাথ। আবহাওয়া বেশ লঘু হয়ে এসেছে লম্বা লোকদের ক্লাব প্রসঙ্গে আসায়। মুচকি হেসে বললে, তোমার লম্বা হবু লাইফ পার্টনার স্কুটার চালিয়ে গেল ময়দানে। তারপর?
