সবার আগে কিঙ সামলে নিল। দীর্ঘদেহী যে পুরুষ মূর্তি ভারি গলাটা তারই। মাথার সামনে টাক, পেছনে লম্বা চুল। টিকোলো নাক। জমিদারি গোঁফ। রীতিমতো কর্তৃত্বব্যঞ্জক খানদানি চেহারা।
বললে ভারি গলায়–গজানন?
জিরো জিরো গজানন। বলতে-বলতে টেবিলে স্কুপাকার ছেষট্টিটা পলিথিন প্যাকেট দেখে নিল গ্রেট গজানন। সাদা মিহি গুঁড়ো প্রতিটি প্যাকেটে। নিক্তি হাতে নিয়েই দাঁড়িয়ে উঠেছে যে চশমাধারী ভদ্রলোক-ভদ্রলোক মানুষটা, ওই নিশ্চয় কেমিস্ট। না। ওকেও বাদ দেওয়া যাবে না। এ ঘরের সবাই পাজি। তাই এ ঘর ছেড়ে কেউ জীবন্ত বেরোতে পারবে না। এ ঘরের এক কণা সাদা গুঁড়োও ভারতের মাটিতে পৌঁছবে না।
মৃত্যুর দ্রিমি-দ্রিমি ডম্বরুধ্বনি বোধহয় আগেই শুনতে পেয়েছিল ভারি গলার অধিকারী লম্বা লোকটা। একটুও না নড়ে বললে–ওয়েলকাম, মাই ফ্রেন্ড। তিন ভাগ নয়, চার ভাগই হোক।
মহাশয়ের নাম?–গজাননের গলায় কি করাত বসানো? কথাগুলো কানের মধ্যে দিয়ে কেটে কেটে বসে যাচ্ছে কেন?
নুরুল হাসান।
ওরফে কিঙ।
ইয়েস।
এরপর আর কোনও কথাই হল না ঘরের মধ্যে। শুধু শোনা গেল গুলির শব্দ।
বাইরের হাইওয়েতে সে আওয়াজ পৌঁছেছিল। আতশবাজি পোড়ানো হচ্ছে মনে করেই কেউ কান দেয়নি।
মাত্র পাঁচটা বুলেট খরচ করেছিল গজানন আর পুঁতিবালা। তিনটে জিরো জিরো দুটো তার সাগরেদের।
প্রথম বুলেটটা অবশ্য জিরো জিরোর। কিঙ-য়ের দুই ভুরুর ঠিক মাঝখান দিয়ে করোটিতে প্রবেশ করেছিল গরম সীসের টুকরোটা।
টেবিলের ওপরেই ছিল ব্যাগ। ছেষট্টিটা প্যাকেট তার মধ্যে ভরে বেরিয়ে এসেছিল ভাইবোন স্পাই কোম্পানি।
দিন কয়েক পরেই ত্রিশূল দপ্তরের রামভেটকি সুরকিওয়ালার টেবিলে প্যাকেটগুলো সাজিয়ে রেখে শুধু বলেছিল গজাননসরি, লাশ সাতটা আনতে পারলাম না।
* ঘরোয়া পত্রিকায় প্রকাশিত। (শারদীয় সংখ্যা।)
জুয়েল বক্স
জুয়েল বক্স চুরির গল্প এটা নয়। বরং ঠিক তার উলটো। অথচ তা অপরাধ।
নিভা আর নিখিল বিয়ে করেছিল ভালোবেসে। প্রথম দেখায় ভালোবাসা। লেকে বেড়াতে
বেড়াতে প্রথমে চার চোখের মিলন। তারপর আঙুলে-আঙুল ঠেকে জাপানি মন্দিরের ধ্যানী বুদ্ধের সামনে। দ্রিমি-দ্রিমি বাজনার তালে-তালে ওদেরও হৃদপিণ্ড দ্রিমি-দ্রিমি নেচেছিল সেই মুহূর্তে।
পরিণাম যা হয়, তাই হয়েছে। নিভার সীমন্তে সিঁদুর টেনে দিয়েছে নিখিল। তারপর ওই লেক রোডেই একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সংসার পেতেছে।
এই গেল আদি পর্ব।
পরের পর্বে দেখা গেল খিটিমিটি লেগেছে দুজনের মধ্যে। নিভা রূপসি হতে পারে, নিভা চটুলাও হতে পারে, নিভা ময়ুরী হতে পারে কিন্তু নিভার ভেতরে আছে এমন কয়েকটা বদ বাতিক, যা নিয়ে সুখী হওয়া যায় না। সেই সঙ্গে আছে প্যানপেনে কান্না। যখন তখন।
দুদিনেই অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে নিখিল। মনের রং ছুটে গেল কয়েক মাসেই। তারপর পালাই পালাই রব উঠল মনের কোণে কোণে।
এবার আসা যাক শেষ পর্বে।
এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছল নিখিলের গাড়ি। ইঞ্জিন বন্ধ করতেই ফোঁসফোঁস করে ফের কেঁদে উঠল নিভা। নিখিলের মনে হল, প্রচণ্ড ক্রোধে বুঝি ব্রহ্মতালু পর্যন্ত জ্বলে যাচ্ছে। অতি কষ্টে সামলে নিল নিজেকে।
বলল, নিভা, মনকে ঠিক কর। মায়ের ডাকে যাচ্ছ মায়ের কাছে এক মাস জিরেন নিতে। প্রথমে লাফিয়ে উঠেছিলে যাওয়ার জন্যে–তারপর বেঁকে বসলে না যাওয়ার জন্যে। এখন আবার শুরু করলে কান্নার সেই ঘেঁদো নাটক। কী চাও? যাবে, না যাবে না?
আ-আমি যাব…না, যাব না।ফোঁপানির মধ্যেই নিভা যা জানাল তার কোনও মানেই হয় না।
হাল ছেড়ে দিল নিখিল। একী গেরো রে বাবা! মাথা হেলিয়ে দিয়ে কটমট করে চেয়ে রইল গাড়ির ছাদের দিকে। সেকেন্ড কয়েক পরেই ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো হঠাৎ সিধে করল শিরদাঁড়া– টংকার শোনা গেল কস্তু কণ্ঠে।
নিভা তুমি যাচ্ছ। গেট রেডি।
ঘটাং করে দরজা খুলে নেমে পড়ল নিখিল। গাড়ির পেছনে গিয়ে আরও জোরে শব্দ করে খুলল ট্রাঙ্কের ডালা। কুলি সামনেই দাঁড়িয়েছিল রামভক্ত হনুমানের মতো। হেঁকে বলল নিখিল, দুটো সুটকেশ। বোম্বাই ফ্লাইট। জলদি।
আমার জুয়েল বক্স? গাড়ির ভেতর থেকে যেন আর্তনাদ করে উঠল নিভা।
পেছনের সিটে ব্রিফকেশের মধ্যে। মনে নেই গতবার দিল্লি থেকে জুয়েল বক্স কোলে নিয়ে ফেরবার পর কী কাণ্ড ঘটেছিল? জুয়েলভরতি বক্স সিটে রেখেই তো নেমে এসেছিলে। এবার তাই ব্রিফকেসের মধ্যে রইল তোমার সাধের রত্নবাক্স। বুঝেছ? রেগে তিনটে হয়ে বলল নিখিল।
কুলি ইতিমধ্যে সুটকেশ দুটো বগলদাবা করে এগিয়েছে। নিখিলও গেল পেছনে। কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকার আগে পেছন ফিরে দেখল গাড়ির মধ্যে বসে তখনও রুমাল দিয়ে চোখ মুছছে নিভাননী ওরফে নিভা।
ডিসগাস্টিং! বলেই সামনে ঘাড় ফেরাল নিখিল। কাঁচের কপাটে প্রতিফলিত আপন মুখচ্ছবি দেখে নিজেই চমকে উঠল। কাগজের মতো সাদা হয়ে গিয়েছে সে মুখ।
নিভার হাতে টিকিট গছিয়ে দিয়ে নিখিল বললে, তোমাকে আর একটা জিনিস দিতে বাকি রইল। তোমার রত্নবাক্সর চাবি। এই নাও। বলে রূপোর চেনে গাঁথা সোনার চাবিটা নিভার গলায় লকেটের মতো ঝুলিয়ে দিল নিখিল। এতক্ষণ দিইনি হারিয়ে ফেলবে বলে। জুয়েল বক্স খুলবে বাড়ি গিয়ে–বোম্বাইতে। তার আগে নয়। কেমন? দু-হাতের মধ্যে নিভার শ্যামল মুখশ্রী কাছে টেনে নিল নিখিল। এদিক-ওদিক দেখে টুক করে মুখ চুম্বন করে বলল, বিদায় ডার্লিং, বিদায়।
