নেই তো নেই। ঝটপট উঠে বসো। কে কোন দিক দিয়ে এসে পড়বে। এটা হাইওয়ে।
সুবোধ বালক হয়ে গেল গ্রেট গজানন। গাড়ি উড়ে চলল ফাঁকা রাস্তা বেয়ে। পুঁতিবালার এলো চুল লেপটে যাচ্ছে চোখেমুখে। আজ সে এসেছে রণরঙ্গিনী মূর্তিতে। পরনে টাইট জিনস প্যান্ট আর শার্ট।
বল, কেন এসেছিস? গর্জে ওঠে গজানন।
তোমার মুরোদ দেখতে, মিটিমিটি হাসছে পুঁতিবালা–ঠিকানা পেয়েছ?
কার?
কিঙের।
না।
হ্যাঁ।
বলছি না।
আমি বলছি হ্যাঁ। আলো নেভবার সঙ্গে-সঙ্গে মমতাজ কী বলে চেঁচিয়ে উঠেছিল?
তুই সব দেখেছিস?
পেছনের জানলা থেকে।
দ্যাখ পুঁতিবালা, মেয়েটা এত বজ্জাত–
সাফাই গাইতে হবে না, গজানো। তোমার সব খেলাই আমি দেখছি। ছিঃ ছিঃ ছিঃ। কী নাম বলেছিল মমতাজ?
নাম? নাম?
বলো, বলো, মনে করবার চেষ্টা করো—
মাথায় এমন মারল—
ঠিক তার আগে কী যেন বলে চেঁচিয়ে উঠল?
নু…নু…মনে পড়েছে। পুঁতিবালা, মনে পড়েছে।
নামটা কী?
নুরুল হাসান। বলেছিল, নুরুল হাসান এসে গেছে, ও গড!
নুরুল হাসানই তাহলে মমতাজের গড?
তাই তো দেখছি। ওর স্বামীর নাম—
নুরুল হাসান নয়।
তবে কার নাম?
গজানো, তোমার সাগরেদি করে ব্রেনটাকে কীরকম পাকিয়েছি এবার দ্যাখো। এটা কী দেখছ?
টেলিফোন গাইড।
এই শহরের টেলিফোন গাইড। মমতাজের ওপর যখন ধর্ষণ আর মারধর চালাচ্ছে আমিনুল, আমি তখন–
আমিনুল!
আবার কে? ভারি পাজি লোক। কাল রাতেই আমি বুঝেছি।
কী…কী বুঝেছিস তুই?
সে অন্য কথা। মমতাজকে জঘন্য ভাবে ধর্ষণ করে ওর মুখ থেকেই নুরুল হাসান নামটা বের করে নেয় আমিনুল। হেরোইন মানুষের আগল আলগা করে দেয় বিশেষ করে আন্নাকালীর মতো মেয়েদের
আন্নাকালী!
ওই হল গিয়ে! মমতাজ মানেই আন্নাকালী। গায়ের যা রং–ম্যাগো। যাক যা বলছিলাম, মমতাজের কাছ থেকে নামটা জেনে নিয়ে তাকে অমানুষিক ভাবে পিটিয়ে মেয়ে ফেলে আমিনুল। আমি বাধা দিইনি। অমন মেয়ের ওই দশাই হয়। আমি তখন খুঁজছিলাম টেলিফোন গাইডটা। তারপর পাহারা দিচ্ছিলাম তোমাকে। আমিনুল ট্রিগার টেপবার আগেই টাইট সার্টের বক্ষদেশ থেকে খুদে রিভলভারটা বের করে দেখাল পুঁতিবালা–পৌরুষ উড়িয়ে দিতাম আমিনুলের।
স্যাডিস্ট!
যা খুশি বলো। আমি গাড়ি চালাচ্ছি–দেখতেই পাচ্ছ। তুমি গাইডখানা দ্যাখো। নুরুল হাসান নিশ্চয় বড় দরের লোক। কিঙ-য়ের আসল নাম যদি নুরুল হাসান হয়–টেলিফোন তার নামে থাকবেই। দ্যাখো।
ভালো ছেলের মতো ছুটন্ত গাড়িতে গাইডের পাতা উলটে গেল গজানন। পাওয়া গেল নুরুল হাসানের নাম আর ঠিকানা।
হাসল পুঁতিবালা আমিনুল জানত তুমিও ঠিক এইভাবে পেয়ে যাবে ঠিকানা। তাই বধ করতে চেয়েছিল তোমাকে। দাদা গো, এখন বলো কী করতে চাও।
বধ করব।
কাকে?
কিঙকে।
তবে চলো–এখুনি।
.
হাইওয়ে থেকে একটু ভেতরে বাড়িটা। দোতলা। পেট্রল পাম্পে জিগ্যেস করতেই পাওয়া গেল পথনির্দেশ।
গাড়ি দূরে রেখে ভাইবোন এগিয়ে গেল মরণের টঙ্কার বাজাতে।
দুজনেই এগোল বাড়ির সামনের দরজার দিকে। পেছনে পাহারা থাকতে পারে। সেখানে অন্ধকার। সামনে কেউ থাকবে না। এখানে আলো।
দরজা খোলাই রয়েছে। কোনও গোপনতা নেই। আর পাঁচটা গেরস্থ বাড়ির মতোই। করিডরে জ্বলছে আলো।
চৌকাঠ পেরিয়েছে গজানন, এমন সময়ে পাশের দেওয়ালের খুপরি থেকে একটা ষণ্ডামার্কা লোক বেরিয়ে এসে দাঁড়াল সামনে।
কী যেন বলতেও গেল। কিন্তু বলবার অবকাশ ছিল না গ্রেট গজাননের। মাথার চোট পেয়ে তখন তার কোষগুলো নিদারুণ টনটনে–
ফলে, এক হাতে তার মুখ চেপে ধরল গজানন, আর এক হাতের ছোট্ট ছুরিটা বসিয়ে দিল তার বুকে।
নিষ্প্রাণ দেহটাকে আস্তে-আস্তে শুইয়ে দিল মেঝেতে।
এবার তার চোখ জ্বলছে। গজানন রক্ত দেখেছে। গজানন রেগেছে।
খুশি হল পুঁতিবালা।
করিডরের শেষে একটা ঘরে কারা যেন কথা কইছে।
পা টিপে টিপে দুজনে এগিয়ে গেল দরজার পাশে।
ভারি গলায় একজন বলছে–মমতাজের ওপর হুকুম আছে গজাননকে পটাসিয়াম সায়ানাইড দিয়ে চলে আসবে এখানে।
শুনেই মাথার চুল খাড়া হয়ে যায় গজাননের। কী নৃশংস মেয়েছেলে রে বাবা! হেরোইনের নাম করে পটাসিয়াম সায়ানাইড খাওয়ানোর প্ল্যান করেছিল তাকে। পুঁতিবালা কি সাধে বলে আন্নাকালী! ভগবান বাঁচিয়েছেন।
ভারি গলায় আবার বললে-দরজা ভোলাই আছে–মমতাজের এত দেরি হচ্ছে কেন বুঝছি না। কী হে কেমিস্ট, তুমি আর দেরি কোরো না। মাল খাঁটি আছে কিনা টেস্ট করে বলে দাও, ওজন করে ভাগ করে দাও।
ভাঙা গলায় একজন বললে–তাই হোক বস্। দেনাপাওনা এখানেই মিটে যাক। যে যার মাল ইন্ডিয়ায় নিয়ে যাক। পেছনে ফেউ যখন লেগেছে।
ভারি গলায় বললেকভাগ হবে তাহলে?
সরু গলায় একজন বললে–চার ভাগ। আপনি রাখবেন?
ভারি গলা–না।
সরু গলা–তাহলে তিনভাগ হোক। আমার বাইশ পাউন্ড।
ভাঙা গলা–আমার বাইশ পাউন্ড।
হেঁড়ে গলা–হেঁ-হেঁ, আমারও বাইশ পাউন্ড।
দোরগোড়ায় শোনা গেল বজ্রগর্জন–আমার ছেষট্টি পাউন্ড।
সবেগে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল পাঁচটা লোক। প্রত্যেকেই ভীষণ চমকে উঠে তাকিয়ে দরজার ফ্রেম জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কালান্তক যমদূতের মতো মানুষটার দিকে। কে রে বাবা? মানুষ না অসুর? আঁকাল চুল ফুলেফেঁপে বিচ্ছিরি কাণ্ড বাঁধিয়ে বসে আছে মাথার চারপাশে। চোখ দুটো দু-টুকরো জ্বলন্ত কয়লার মতো গনগনে রাঙা। চাহনিও পৈশাচিক…অমানুষিক।
