কল্যাণানন্দ অ্যাকাউন্টস নিয়ে অযথা মাথাব্যথা করতেন না, যদিও একটা আধলা বাজে খরচের উপায় নেই। বারাণসীর সেবাশ্রমে বিবেকানন্দশিষ্য চারুচন্দ্র দাসও (স্বামী শুভানন্দ) ছিলেন এই ব্যাপারে অত্যন্ত সাবধানী। তাঁর জীবনীকার স্বামী নরোত্তমানন্দ লিখে গিয়েছেন, একবার রাতের খাবারের পর একটি লবঙ্গ হাতে পেলেন। তিনি আর একটা লবঙ্গ চাইতে, চারুচন্দ্র মুখের ওপর যদিও সবিনয়ে বললেন, এখানকার নিয়মাবলীতে খাবার পরে একটি করে লবঙ্গ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া আছে! শুনলে অবাক হতে হয়, কিন্তু এমনি করেই সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীরা পরের কাছ থেকে ভিক্ষে করা অর্থের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন।
স্বামী শুদ্ধানন্দের হিসেবঘটিত প্রশ্নের উত্তরে কল্যাণানন্দ বললেন, “মহারাজ আপনি এই সব ব্যাপারে নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন কেন? আপনার শরীর খারাপ, আপনি এখানে এসেছেন বিশ্রাম নিতে, এখন তো আপনি অবসর জীবন যাপন করছেন। আপনি এখানে আসছেন তাই আপনাকে ওরা একটু কাজে লাগাতে চায়। এসব ব্যাপারে ব্যস্ত হবেন না, আপনি ভালো করে বিশ্রাম নিন, তারপরে আমরা মুসৌরি যাব, সেখানে খুব হৈ হৈ হবে।”
টাকাকড়ির ব্যাপারে প্রচণ্ড সাবধানী এবং প্রচণ্ড উদাসী, এই হচ্ছে বিবেকানন্দশিষ্যদের স্বভাব। অনেকে ভাবত কল্যাণমহারাজ ভীষণ কৃপণ, না হলে তিনি কেন রোগীদের বিছানার চাদর এবং বালিশের খোল নিজের হাতে সেলাই করতেন? কী অসীম ধৈর্যের সঙ্গে তিনি এই সেলাই করতেন, কোথাও সামান্য একটু খুঁত খুঁজে পাওয়া যেত না তার সেলাইকর্মে।
মহারাজ প্রচণ্ডভাবে নীতিনির্ভর ছিলেন, যা করবেন ঠিক করেছেন তা তিনি করবেনই। শোনা যায় বরিশালের মানুষরা এমন একটু গোঁয়ার হয়। অন্ধ্রের ছেলে সর্বগতানন্দ একদিন কথাবার্তার মধ্যে জিজ্ঞেস করে বসলেন, মহারাজ আপনি কি বাই এনি চান্স’বরিশালের লোক? তিনি উত্তর দেননি, কিন্তু তরুণ সহকারী পরে অন্য সূত্রে খবরটির সমর্থন পেয়েছেন। মহারাজ কিন্তু ভোলেননি যে সর্বগতানন্দ তাকে এই প্রশ্নটা করেছিলেন।
অর্থ সম্পর্কে স্বামী কল্যাণানন্দের মানসিকতা অনেকটা গল্পের মতন। সর্বগতানন্দ যখন হিসেবপত্তর রাখা শুরু করেছেন তখন এক ভদ্রলোক সেবাশ্রমকে প্রতি মাসে এক টাকা ডোনেশন দেবেন বলে কথা দেন। কয়েকমাস তিনি টাকাটা পাঠাচ্ছেন না।
টাকা আদায়ের কথা ভেবে তরুণ হিসেব রক্ষক একদিন কল্যাণানন্দকে জিজ্ঞেস করলেন, “মহারাজ, লোকটিকে প্রায়ই বাজারে দেখতে পাই, ওঁকে কি টাকার কথাটা মনে করিয়ে দেব?”
“তাই নাকি! যখন তুমি এখানে এলে তখন অখণ্ডানন্দজী কি তোমাকে টাকা তুলতে বলেছিলেন?”
সর্বৰ্গতানন্দ বললেন, “না।”
“আমি কি তোমাকে কিছু বলেছিলাম?”
“না, মহারাজ।”
“তা হলে তুমি কেন ব্যস্ত হয়ে উঠছ? যা আসছে ঠাকুরের আশীর্বাদে তাতেই চালিয়ে দেওয়া যাবে। আজকে তুমি টাকা তুলতে চাও, তহবিল বাড়াতে চাও, নতুন নতুন ঘরবাড়ি করতে চাও। এর ফল কি হবে? মনটা ওসবেই পড়ে থাকবে, অধ্যাত্মজীবনটা উবে যাবে। ওই জীবনের পিছনে লেগে থাক, যোগ্যজীবন যাপন কর; ওটারই বেশি প্রয়োজন। টাকাকড়ি বাড়িঘর দোর এসব নিয়ে চিন্তা কম কর। লোকের যদি ইচ্ছে হয় দান করুক, যদি না করে তা হলেও কিছু এসে যাবে না।”
কল্যাণানন্দবলনে,”কাজটা ভালো করে কাটাই জরুরি। শ্রীরামকৃষ্ণের দয়ায় যতটুকু আসছে সেইটাই আমরা যেন ভালো করে ব্যবহার করি। কত বেশি কাজ হলো তার থেকে কত ভালো কাজ হলোটাই গুরুত্বপূর্ণ। যা হাতের গোড়ায় রয়েছে, তা যত ছোটই হোক তা করে ফেলা যাক। না হলে মনের মধ্যে সব পরিকল্পনা গজাবে, তোমার সারাজীবনটাই নষ্ট হয়ে যাবে। ওসব জিনিস যেমন চলছে তেমন থাকতে দাও।”
আধ্যাত্মিক জীবনে এ এক বিচিত্র আদর্শ। আমরা এখানে টাকা তুলতে এবং একের পর এক বাড়ি তৈরি করতে আসিনি। আমরা এসেছি আদর্শ আধ্যাত্মিক জীবন যাপন করতে। “মাঝে মাঝে এই ধরনের পথ নির্দেশ দরকার, না হলে আমাদের পথ হারিয়ে যাবে,” লিখেছেন স্বামী সর্বগতানন্দ।
আর অর্থ! একবার একজন পাঁচশ টাকা চুরি করল। স্বামী কল্যাণানন্দ শান্তভাবে, কোনোরকম দুশ্চিন্তা না করে বললেন, আমার মনে হয়, টাকাটা ওর দরকার ছিল।
একবার একটা লোক বাগানে কাজের খোঁজে এল। যে-সন্ন্যাসী বাগানের দায়িত্বে ছিলেন, তিনি তাকে দেখেই বললেন, “হতভাগা, তুই অমুক জায়গা থেকে অমুক জিনিস চুরি করে পালিয়েছিলি, আর এখন এসেছিস কাজের খোঁজে! দূর হয়ে যা এখান থেকে।”
এমন সময় স্বামী কল্যাণানন্দ সেখানে হাজির হলেন। তিনি লোকটিকে বললেন, “যাও, তুমি বাগানে ফিরে গিয়ে কাজ করগে যাও।”
“কিন্তু, স্বামীজি আমাকে চলে যেতে বলেছেন।”
কল্যাণানন্দ মহারাজ এবার হেসে ফেললেন। ”স্বামীজি জানেন না যে তুমি অন্যায় করলেও, আমার কাছে অপরাধ স্বীকার করেছ।”
মহারাজ লোকটিকে নিয়ে বাগানে গেলেন এবং ওখানকার স্বামীকে বললেন, “শোনো, এ অন্যায় করেছে বটে, কিন্তু তার জন্যে অনুতাপ হয়েছে।”
কল্যাণ মহারাজ ক্ষমা করলেন বটে, কিন্তু বাগানের স্বামী এই ক্ষমা করাটা তেমন পছন্দ করলেন না। পরে খাবার ঘরে এই স্বামী বললেন, “লোকটা আবার কী করবে কে জানে।”
“হয় দুশ্চিন্তা করে যেতে হয়, না হয় লোকটাকে একটা সুযোগ দিতে হয়।
