“আমি জানি না।”
বাগান স্বামীর এই মন্তব্য শুনে নারায়ণ মহারাজ বললেন, “আমিও জানি না, তবে কল্যাণ মহারাজের আদর্শটা আমাদের থেকে ভাল। মহারাজ যখন চাইছে, তখন চোরকেও আর একটা সুযোগ দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।”
অদ্ভুত ঘটনা আরও আছে। একটা লোক প্রায়ই কল্যাণ মহারাজের কাছে এসে পয়সা চাইত। কিছু পেলেই সে চলে যেত। অনেকবার ব্যাপারটা ঘটেছে। একদিন মহারাজকে জিজ্ঞেস করা হলো, “লোকটা কে? আপনার কাছে আসে, টাকা নেয়, আর চলে যায়। কোনো কাজও করে না।” মহারাজ প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলেন না।”
লোকটি আর একদিন এল। মহারাজ যে দেহরক্ষা করেছে সে খবর লোকটা পায়নি, সে সোজা মহারাজের সঙ্গে দেখা করতে চাইল।
“কত টাকা তোমার প্রয়োজন?” জিজ্ঞেস করলেন তরুণ সন্ন্যাসী।
“আমি টাকা চাই না, আমি জানতে চাই মহারাজ কোথায়?”
মহারাজ পৃথিবী থেকে চলে গিয়েছেন শুনে লোকটি ভেঙে পড়ল এবং শিশুর মতন কাঁদতে লাগল। তারপর বলল, “আপনারা জানেন না, উনি আমার জন্যে কি করেছেন।”
“কী করেছেন তিনি?”
“সে অনেক ঘটনা। একদিন বাজারে গিয়েছি, আমার কাছে একটা পয়সা ছিল না, আমি একটা দোকান থেকে কিছু জিনিস চুরি করেছিলাম। ওরা ধরে ফেলল, পুলিশ এসে গেল এবং আমাকে বেদম মারতে শুরু করল। মহারাজ এই পথ দিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে যাচ্ছিলেন। উনি গাড়ি থামিয়ে পুলিশকে বললেন, মারা বন্ধ করুন। তারপর জানতে চাইলেন, কী হয়েছে? সবাই বলল, লোকটা এইসব জিনিস চুরি করে পালাচ্ছিল। ‘জিনিসগুলোর কত দাম?’ জিজ্ঞেস করলেন মহারাজ। তারপর তিনি দাম মিটিয়ে দিয়ে আমাকে ডাকলেন। বললেন, ভবিষ্যতে টাকার দরকার হলে আমার কাছে আসবে। চুরি করবে না। তোমাকে দেখে তো ভালো লোক বলে মনে হচ্ছে, তুমি কেন চুরি করবে?’ এরপর থেকে আমি যথাসম্ভব খাটাখাটনি করতাম, যখন খুব আটকে যেতাম তখন মহারাজের কাছে আসতাম, তিনি কিছু দিতেন। বাজারের ওই ঘটনার পরে আমি আর চুরি করিনি। আমার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করতেন মহারাজ। আমাকে কখনও প্রশ্ন করতেন না, শুধু দিতেন।”
সর্বগতানন্দ লিখেছেন, “লোকটিকে বললাম, আমি আপনাকে কিছু অর্থসাহায্য করব। কিন্তু আশ্চর্য, লোকটি না বলল, কিছুতেই আমার অর্থ নিল না।”
অদ্ভুত সব আগন্তুকদের বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে। কল্যাণানন্দের কাছে একজন বোবা আসত, চুপচাপ বসে থাকত, কিছু খাবার খেত। তারপর চলে যেত। আর একজন উন্মাদ আসত, মাঝে মাঝে ক্ষেপেও যেত। কিন্তু সবাইকে খাওয়াতেন মহারাজ। তবে এই উন্মাদটিকে খাবার দেওয়ার সময়ে সবাইকে সাবধান থাকতে হতো।
একজন সাধুর উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। এঁর বুকে একটা গুলি ঢুকেছিল, বার করা যায়নি। এঁর প্রবল মাথার যন্ত্রণা হতো, মহারাজের ইচ্ছা অনুযায়ী প্রতিদিন তার মাথায় চন্দন তেল মালিশ করতে হতো। কল্যাণ মহারাজ নিজে এঁদের সবার দেখভাল করতেন।
গুলিবিদ্ধ এই মহারাজের বিস্তারিত বিবরণ অন্যত্র পাওয়া যাচ্ছে। হৃষীকেশের কাছে ঘন অরণ্যে ঢাকা স্বর্গাশ্রমে যোগীরা আসতেন তপস্যার জন্য। রামকৃষ্ণ মিশনের বিশিষ্ট সন্ন্যাসীরা, যেমন স্বামী প্রেমেশানন্দ এখানে তপস্যা করেছেন। একবার এলেন তারকেশ্বরানন্দজী। স্বর্গাশ্রমের ঘন অরণ্যের মধ্যে তিনি একাকী পরিভ্রমণ করছেন, এমনসময় এক শিকারী হরিণ মনে করে তার দিকে গুলি ছুড়লেন। যে লোকটি গুলি ছুঁড়েছিল তাকে তারকেশ্বরানন্দজী চিনতেন, কিন্তু পুলিশের শত অনুরোধও তার নাম বললেন না। অথচ মিথ্যাও বললেন না, তার সোজা সরল উত্তর: “নাম আমি জানি, কিন্তু বলব না।” বুক থেকে গুলি বার করা যায়নি, ওই অবস্থাতেই তাকে কনখল সেবাশ্রমে আনা হলো, তার শরীরে প্রবল যন্ত্রণা, মুখ বুজে সহ্য করতেন সব, কিন্তু কে গুলি করেছিল তা কখনও মুখে আনলেন না।
অর্থের ব্যাপারে বিবেকানন্দ-শিষ্য কল্যাণানন্দের চিন্তাধারার আর একটি কাহিনি আজও বেঁচে আছে। সেবাশ্রমে গভীর যত্নের সঙ্গে তিনি একশ পঁচিশটি আমগাছ লাগিয়েছিলেন। যখন এইসব গাছে ফল ধরতে আরম্ভ করল তখন একজন সন্ন্যাসী বললেন, “কয়েক হাজার আম ফলেছে। এগুলো বিক্রি করে টাকা পাওয়া যেতে পারে।”
কল্যাণানন্দের উত্তর খুবই সোজা। শান্তভাবে তিনি বললেন, “টাকা রোজগারের জন্যে আমি এই গাছগুলি পুঁতিনি। যে যত পার খাও, আর দুটি করে আম প্রত্যেক সাধু যখন ভিক্ষা করতে আসবেন তাদের দাও।” তিনি চাইতেন মানুষ এই ফল খেয়ে আনন্দ পাক।
কল্যাণানন্দ প্রত্যেক বছর স্থানীয় সাধুদের নিমন্ত্রণ করতেন আমের উৎসবে, সেই সঙ্গে পায়েস। শেষপর্যন্ত এমন হয়ে গিয়েছিল যে প্রত্যেক বছর আমের সময় সাধুরা খোঁজ নিতেন কবে মহারাজের নেমন্তন্ন আসবে।
মানুষকে আনন্দ দাও, যারা ভুল করেছে দোষত্রুটি মুক্ত করে তাদের নতুনভাবে গড়ে নাও, গুরুর অনুপ্রেরণায় এই ছিল কল্যাণানন্দের সাধ। সেবার সঙ্ঘের জেনারেল সেক্রেটারি স্বামী মাধবানন্দ কনখলে এসেছে, (পরে তিনি সঙ্ঘসভাপতি হয়েছিলেন) মাধবানন্দ সেবাশ্রমে এক ব্রহ্মচারীকে দেখে কল্যাণানন্দকে বললেন, “এই ছেলেটিকে চেনেন?”
“হ্যাঁ, জানি,” মহারাজের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
মাধবানন্দজি খবরাখবর রাখতেন। মঠ মিশনের জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে তিনি বললেন, “তিনটে সেন্টার থেকে ওকে তাড়িয়ে দিয়েছে। কোনো কম্মের নয়। ওকে এখানে রাখবেন না।”
