কর্মীরা সন্ধেবেলা প্রত্যেকে বেড়াতে বেরোতে চাইতেন। অথচ এই সময়েই হাসপাতালে কাজের চাপ তুঙ্গে। সর্বগতানন্দকে সান্ধ্যভ্রমণে বেরুতে হতো না। কল্যাণানন্দ বলতেন, “শুধু শুধু বেড়াতে বেরোবে কেন? এসব যারা কুঁড়ে অথবা বৃদ্ধ তাদের জন্যে, যারা কমবয়েসি তাদের হাতে তো হাজার রকম কাজ।”
বেড়াতে যাবার মতন সময় কল্যাণ মহারাজেরও হাতে থাকত না। স্বামী নিশ্চয়ানন্দের কাছেও এই বেড়ানো ছিল বিলাস। সন্ধ্যায় লোকে হাঁটতে-হাঁটতে গঙ্গা আরতি বা ব্রহ্মকুণ্ড দেখতে যেতে চাইতেন। আমাদের বিশ্বাস ছিল স্বয়ং ঠাকুর আমাদের মন্দিরে রয়েছেন, যা কিছু আমাদের দুরকার সব এখানেই পাওয়া যাবে। এসব ছেড়ে গঙ্গায় গিয়ে আরতি দেখার কী প্রয়োজন?
কল্যাণানন্দ যা সরলভাষায় সোজাভাবে বলতেন, তা হলো, “পূজা, প্রার্থনা ও জপের জন্যে এখানে মন্দির রয়েছে, আর সেবার জন্যে হাসপাতাল রয়েছে। সবই তো এক। এসব ছেড়ে সান্ধ্যভ্রমণের বিলাসিতা কেন?”
আশ্রমের কর্মীরা যে কী কঠিন অবস্থায় দিন কাটাতেন তার বিবরণ এখন পড়লে অবিশ্বাস্য মনে হয়। প্রত্যক্ষদর্শী জানাচ্ছেন, দু’বছর আমাদের কোনো সকালের জলখাবার বা প্রাতরাশ ছিল না। কারণ আমাদের সেই আর্থিক সঙ্গতি ছিল না। দুপুরে বারোটার সময় আমাদের জুটতো দুটি ভাত এবং ঝোল বা ডাল, রাত্রে দুটি রুটি এবং সামান্য সবজি, ওইটাই আমাদের ডিনার।
সন্ন্যাসী ও ব্রহ্মচারীদের খাওয়াদাওয়ার জন্যে হাসপাতালের অর্থ স্পর্শ করা হত না। যদি কেউ সাধুদের জন্যে কিছু অর্থ দান করতেন, কেবল সেই টাকাই খরচ করা যেত। অবস্থা দেখে একজন ভক্ত বেশ কিছু অর্থ সাধুদের সেবার জন্য দান করেন। এর পরেই বাইরে থেকে কোনো সাধু কনখলে এলে তাকে সঙ্গে থাকতে আমন্ত্রণ জানাতে সাহস হত।
তবু সুদূর হেড অফিসের খবরদারি থেকে সেবাশ্রমের মুক্তি ছিল না। একবার হিসেব পরীক্ষার জন্যই বেলুড় মঠ থেকে এলেন স্বামী শুদ্ধানন্দ। সবে তিনি জেনারেল সেক্রেটারির দায়িত্ব থেকে ছুটি পেয়েছে (পরে সঙ্ঘ সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন)। তারও আগের আর এক বিশিষ্ট অতিথি স্বামী বিবেকানন্দের গুরুভাই স্বামী তুরীয়ানন্দ।
হরিমহারাজের প্রতি কল্যাণানন্দের ছিল প্রবল ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। হরিমহারাজ এ অঞ্চলে এসে যখন শুনলেন কল্যাণ এখানে রয়েছে তখন তিনি সেবাশ্রমে থাকবার জন্যে চলে এলেন। কোনোরকম কষ্টকে ভয় পেতেন না ঠাকুরের এই ত্যাগী সন্তান।
সেই সময় কনখলের চারদিকে জঙ্গল। একটা পাগলা ষাঁড় সমস্ত রাত ছোটাছুটি করে সবকিছু তছনছ করত। পাগলা ষাঁড়টা খুব কাছে এসে পড়লে কল্যাণানন্দ ও নিশ্চয়ানন্দ দু’জনে মিলে তাকে তাড়াবার ব্যবস্থা করতেন। আশ্চর্য ব্যাপার, তুরীয়ানন্দজী আগে থেকে বুঝতে পারতেন এবং বলতেন, “কল্যাণ, ষাঁড়টা আসছে এদিকে।” ওখানে মস্ত একটা ঢাক ছিল, সেটা খুব জোরে বাজিয়ে ষাঁড়কে ভয় পাইয়ে দেওয়া হতো।
কদিন পরপর এই ঘটনা ঘটলো। তখন কল্যাণানন্দ জিজ্ঞেস করলেন তুরীয়ানন্দকে, “মহারাজ, আপনি কী রাত্রে ঘুমোন না? সামান্য একটু শব্দে আপনি জেগে ওঠেন।”
তুরীয়ানন্দ মুখ টিপে হেসে বলনে, “ঘুমোই, তবে তোমাদের মতন নয়।” হরিমহারাজের এই কথাটি কল্যাণমহারাজ তার ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
কল্যাণমহারাজের দেহত্যাগের পর ওঁর জিনিসপত্তর গুছোতে গুছোতে এই ডায়েরিটা তরুণ সন্ন্যাসীর হাতে আসে। তখন ১৯৩৭ সালের শেষ দিক। স্বামী জগদানন্দকে স্বামী সর্বগতানন্দ বললেন, “কল্যাণমহারাজ তার ডায়েরিতে এই মধ্যরাতের মত্ত যণ্ডের কথা লিখে রেখেছে। সেই সঙ্গে
তুরীয়ানন্দ বললেন, আমি তোমাদের মতন ঘুমোই না।
এর অর্থ কী, জানতে চেয়েছিলেন সর্বতানন্দ। স্বামী জগদানন্দের ব্যাখ্যা উনি অন্য সকলের থেকে আলাদা। উনি অবশ্যই ঘুমোতন, কিন্তু সবসময় চেতনা থাকত–পূর্ণ চেতনা। রামকৃষ্ণদেব একবার বলেছিলেন, “ঘুমকে আমি ঘুম পাড়িয়েছি।”
আরও একজন অতিথির আগমন ও ট্র্যাজেডির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কনখলের স্মৃতি। তিনিও কম লোক নন, রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের প্রথম সেবাশ্রম বারাণসীতে প্রতিষ্ঠার ও লালনপালনের দুর্লভ কৃতিত্ব তার। পূর্বাশ্রমে তার নাম চারুচন্দ্র দাস, বহুবছর সংসারে সন্ন্যাসীর মতন বসবাস করে জীবনের শেষপ্রান্তে তিনি স্বামী শুভানন্দ হয়েছিলেন।
টাকাকড়ি বিষয়সম্পত্তি সম্বন্ধে বিবেকানন্দশিষ্য কল্যাণানন্দের কী আচরণ তা-ও একালের ম্যানেজমেন্ট বিশারদর্দের চিন্তার খোরাক হতে পারে। এটি জানা না থাকলে পুরো মানুষটিকে বোঝা অসম্ভব।
স্বামী বিবেকানন্দের প্রদর্শিত পথে বেলুড় হেড অফিস হিসেবপত্তর সম্বন্ধে সর্বদা সাবধান। স্বামী শুদ্ধানন্দ শুধু বিশ্রাম নিতে এবং তপস্যা করতে কনখলে আসেননি। ইনি বিবেকানন্দের সাক্ষাৎশিষ্য, তাই গুরুভাইয়ের সঙ্গে অনেকদিন পরে দেখা হওয়ায় খুবই আনন্দিত।
যথাসময়ে স্বামী শুদ্ধানন্দ গুরুভাইকে তার কনখলে আসার অন্যতম উদ্দেশ্য জানালেন, কর্তৃপক্ষ তাকে সেবাশ্রমের আর্থিক দিকটা দেখে আসতে বলেছেন। খরচপত্তর কীভাবে হচ্ছে, যেসব টাকা এককালীন দান হিসেবে এসেছে তা কোথায় কীভাবে বিনিয়োগ হচ্ছে, ইত্যাদি হিসেবপত্তরের প্রশ্ন। এর একটা কারণ হতে পারে, নিজেকে নিষ্ঠুরভাবে খরচাপত্তরের বাইরে রাখলেও, বেলুড় হেডকোয়ার্টার কখনও তার কাছ থেকে বিস্তারিত আর্থিক বিবরণ পাননি। একজন তরুণ সন্ন্যাসী কাছেই দাঁড়িয়েছিলেন যখন শুদ্ধানন্দজী বললেন, “কল্যাণ, ওঁদের ইচ্ছা আমি তোমার আর্থিক ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে আসি। তুমি কোথায় কীভাবে টাকা বিনিয়োগ করেছ?”
