অনেকদিন পরে, শ্রীরামকৃষ্ণশতবর্ষ উদযাপনের বছরে, সরকারি নির্দেশ জারি হলো, যক্ষ্মারুগি ও অন্য রুগিদের একসঙ্গে রাখা যাবে না। গভর্নমেন্ট ইতিমধ্যে আলাদা একটা যক্ষ্মা হাসপাতাল তৈরি করে ফেলেছে। এর ফলে সেবাশ্রমে যক্ষ্মা চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গেল।
আরও অজস্র অভিজ্ঞতার কথা বিভিন্নভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। মৃতদেহ সম্বন্ধে তরুণ এক সন্ন্যাসীর ভীষণ ভয় ছিল। কল্যাণানন্দ তা জানতেন।
“একদিন আমার সারারাত ডিউটি পড়েছে। কল্যাণ মহারাজ শান্তভাবে নিঃশব্দে হাসপাতালের চলে এলেন সেই রাত্রে। একের পর এক ওয়ার্ড ঘুরছেন তিনি, আমি সঙ্গে রয়েছি। এরপর আমরা মড়িঘরের কাছে চলে এলাম। শবদেহ সম্বন্ধে আমার ভীষণ ভয় ছিল। যখন ছোট ছিলাম তখন আমাদের মৃতদেহর কাছে যেতে দেওয়া হতো না। যখন বড় হয়েছি তখনও মৃতদেহের কাছাকাছি যাবার সুযোগ ঘটেনি। সেবাশ্রম থেকে যখন মৃতদেহ সরানোর প্রয়োজন হত তখন অন্যরা এই কাজ করতেন। আমাকে কখনও শবানুগমন করতেও বলা হয়নি। ফলে হাসপাতালের মড়িঘরে আমি কখনও ঢুকিনি।
কিন্তু সেই রাত্রে হাসপাতালের মড়িঘরের দিকে ধীরে ধীরে এগোতে এগোতে কল্যাণ মহারাজ এক জন রোগী সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। আমাকে বলতে হলো সে আর বেঁচে নেই, দেহটা মড়িঘরে চলে গিয়েছে। মহারাজ তখন আমার সামনে, আমি পিছনে। তিনি মড়িঘরের দরজা খুললেন, আলো জ্বাললেন এবং ভিতরে ঢুকে গেলেন। আমাকেও পিছন পিছন যেতে হলো। উনি সঙ্গে থাকলে আমার ভয় পাবার অবকাশ নেই। আমারও সাহস বেড়ে যাচ্ছে। মহারাজ মৃতদেহের খুব কাছে এগিয়ে গিয়ে, মুখের কাপড়টা সরিয়ে দিলেন এবং দেহটিকে দেখতে লাগলেন। এবার আমার দিকে মুখ ফেরালেন মহারাজ, বললেন, “কিছু লোক শব দেখলে ভয় পায়। পৃথিবীতে নিতান্ত নিরাপদ বলতে যদি কিছু থাকে তা হলো মৃতদেহ। একটা আঙুল পর্যন্ত তোলে না, একটা কথা পর্যন্ত বলে না, তবু মানুষ ভয় পায়। যেখানে ভয় পাবার কিছুই নেই সেখানে মানুষ ভয় পায়।”
“আপনি ঠিক বলেছেন, আমার উত্তর। আমার মুখ থেকে এই কথা শুনে, মহারাজ ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গেলেন, হাত ধুলেন, এবার চলে যেতে প্রস্তুত তিনি। কিন্তু আমাকে মৃতের মুখের কাপড়টা টেনে দিতে হলো। আমি করলাম। তারপর আমি হাত ধুলাম। এবার আমরা দুজনে ওখান থেকে চলে গেলাম।
“সেই শেষ, এরপর মৃতদেহ থেকে আমি জীবনে কখনও ভয় পাইনি।
“কল্যাণানন্দ জানতেন কি করে ভুল ভাঙিয়ে শিক্ষা দিতে হয়। সেবার মড়িঘরে ঢুকে তিনি সোজাসুজি আমার সমালোচনা করেননি, সাবধানে শুধু বলেছেন, “মানুষ ভয় পায়।”
কনখলকে বিবেকানন্দ ভাবনার আদর্শ স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন কল্যাণানন্দ। কনখলের নটি বছরের মধ্যে আড়াই বছর স্বামী সর্বগতানন্দ কাটাতে পেরেছিলেন স্বামী কল্যাণানন্দের সান্নিধ্যে।
সেই দুর্লভ অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে তিনি লিখেছেন, সন্ন্যাসীর দৈনন্দিন জীবনে থাকে কাজ, পূজা, পাঠ ও উপাসনা। মঠের দৈনন্দিন জীবনে অন্য কিছুর অনুপ্রবেশ নেই, মঠ থেকে বেরিয়েই হাসপাতালের কাজ অথবা সন্ধ্যায় ছোটদের পড়াশোনা করানো। এখানে তীর্থযাত্রী এবং রোগীরা আছে, কিন্তু ভক্তরা অনুপস্থিত। ফলে ভক্তদের জন্য সময় ব্যয় করার কোনো প্রয়োজন নেই।
কল্যাণানন্দের দেহাবসানের কিছুদিন আগে কনখলের গ্রন্থাগারে বসে কয়েকজন তরুণ সন্ন্যাসী গল্প করছেন। একজন বললেন, “আমরা সবকিছু ত্যাগ করেছি, এখন কল্যাণানন্দ মহারাজের স্নেহময় সান্নিধ্যে এবং শিক্ষায় বেশ ভালো আছি।”
মহারাজ সেইসময় ওই পথ ধরে হাঁটছিলেন, তরুণদের কথা শুনে ভিতরে ঢুকে পড়ে একটা চেয়ারে বসলেন। উপস্থিত সকলে উঠে দাঁড়ালেন।
মহারাজের প্রশ্ন, “কে বলেছে তোমরা সবকিছু ত্যাগ করেছ? কী তোমরা ত্যাগ করেছ? বাবা, মা, ভাই, বোন, বাড়ি? প্রথমেই বল এসবের মালিকানা কী তোমার? তুমি যার মালিক তার কিছু ত্যাগ করেছ কি? তুমি কীসের মালিক? তোমার অহং, তোমার স্বার্থবোধ! স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন, ত্যাগ এবং সেবা। নিজের অহং ও স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে প্রেমময় সেবা কর। এর নাম ত্যাগ।”
এরপর মহারাজ একজনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এইটা লিখে নাও–স্বামীজির নিঃস্বার্থ প্রেমময় সেবাই আমাদের মন্ত্র।” এরপর তিনি বেরিয়ে গেলেন, তরুণ সংসারত্যাগীরা স্তম্ভিত হয়ে বিবেকানন্দশিষ্যের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
একবার কল্যাণানন্দ রোগী দেখতে বেরিয়েছে, তখন তরুণ সন্ন্যাসীদের কেউ কাছাকাছি ছিল না। পরিস্থিতি মোটেই আশাপ্রদ নয়। মহারাজ নিজের হাতে সমস্ত জায়গাটা পরিষ্কার করলেন, কিন্তু কাউকে ডাকতে পাঠালেন না। বিছানায় কাঁচা চাদর নতুন করে বিছিয়ে দিলেন। কাছেই একটা টব ছিল, সেখানকার জলে রোগীর জামাকাপড় ভিজিয়ে দিলেন। তারপর নিজের হাতে সেগুলো কেচে বাইরে এনে রোদে শুকোতে দিলেন। “সহযোগীরা যখন ওয়ার্ডে এলেন, তখন এইসব দেখে তারা রোগীদের জিজ্ঞেস করলেন, কে এসব কাজ করেছে? কেউ ঠিকমতন বলতে পারল না। সবাই তাকে চিনতো না।
সেবাকার্যের জন্যে কনখলে অনেকে এসেছেন, কিন্তু কাজের প্রবল চাপ সহ্য না করতে পেরে কিছুদিন পরে চলে গিয়েছেন। কল্যাণানন্দ কিন্তু কারও ওপর জোরজার করতেন না। অনেক সময় তাকে না বলেই সেবকরা আশ্ৰম ছেড়ে চলে গিয়েছে।
