“ওখানে ডাক্তার বোস বলে একজন নামকরা প্রাইভেট চিকিৎসক ছিলেন, তার সাহায্যে আমরা চাইলেই পেতাম। অর্থাৎ প্রত্যেক রোগীর জন্য আমাদের পক্ষে যা যা সম্ভব তা না করা পর্যন্ত কল্যাণ মহারাজ ক্ষান্ত হলে না। এর পরে অনেকের কাছে কল্যাণ মহারাজ যে দেবতার মতন হয়ে উঠকেন তাতে আশ্চর্য কি?
“স্থানীয় লোকদের মুখে নিশ্চয়ানন্দ মহারাজ সম্পর্কেও একই ধরনের কথা শুনতাম। একেবারে নিজের মতন করে নিয়ে তিনি যেভাবে মানুষের সেবা করতেন তা স্থানীয় মানুষদের মনে ছিল। যখনই মানুষের মুখে নিশ্চয়ানন্দের প্রশস্তি শুনতাম তখনই ভাবতাম, আমরা কখনই কি ওঁদের স্তরে উঠে আসতে পারব?”
আরও একটা কথা কল্যাণ মহারাজ সুযোগ পেলেই শুনিয়ে দিতেন। “তোমরা, এখানে সেবা দিতে এসেছ, সেবা নিতে নয়। সুতরাং নিজেরা অসুখে পড়ে যেও না।” ফলে আমাদের অসুখ-বিসুখ করলে, বিশেষ করে ম্যালেরিয়া হলে, মহারাজ প্রায়ই তা জানতে পারতেন না। শরীর খারাপ হলে ওঁকে না জানিয়ে, চুপি চুপি ওষুধপত্তর খেয়ে আমরা কাজে লেগে থাকতাম।”
গুরুর মন্ত্রে তখন কল্যাণীনন্দ কথা নয় কাজে বিশ্বাস করতেন। কাজের মূর্ত বিগ্রহ এই মানুষটি গভীর রাতে হাসপাতালে সামান্য আওয়াজ হলেও ঘুম থেকে উঠে পড়ে, দ্রুত জুতো পরে হাসপাতালের দিকে এগোতেন। সঙ্গের সাথী বিশ্বস্ত কুকুরটি। “আমার ঘরটা ছিল মহারাজের ঘরের ঠিক পাশেই। আমিও ততক্ষণে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে মহারাজের পিছন পিছন হাসপাতালে হাজির হয়েছি। মহারাজ বুঝতে পারতেন আমি এসে গিয়েছি। যদি তিনি কোনো ওষুধের কথা বলতেন আমি তা সঙ্গে-সঙ্গে হাজির করতাম।
“কল্যাণানন্দ মহারাজের শান্তস্বভাব উল্লেখ করার মতন, তাঁকে চটানো বা উত্তেজিত করা প্রায় অসম্ভব ছিল। একবার এক টাইফয়েডের রোগী প্রচণ্ড জ্বরে বিকারগ্রস্ত হয়ে মহারাজকে এমনভাবে আঘাত করল যে তিনি পড়ে গিয়ে চশমা ভেঙে ফেললেন। আমরা তোকটাকে সামাল দেবার জন্যে তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে মহারাজ বললেন, “ওকে কিছু করো না। ওকে বসে থাকতে দাও।” মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মহারাজ এবার রোগীকে একহাতে জড়িয়ে ধরে সস্নেহে জিজ্ঞেস করলেন, “এখন ভাল বোধ করছ তো?” এরপর ডাক্তারকে খবর পাঠালেন। আমরা মহারাজের ওই অবস্থা দেখে উত্তেজিত, কিন্তু মহারাজ একেবারে শান্ত, তার মধ্যে কোনো উত্তেজনা নেই।”
স্বামী সর্বগতানন্দ লিখেছেন, “সেবা ও আত্মদানের নিবেদনের মূর্ত পরিগ্রহ এই স্বামী কল্যাণানন্দ। এক আধ বছর নয়, দীর্ঘ সাঁইত্রিশ বছর তাঁর এই সেবার নিঃশব্দ পরিচয় তিনি রেখে গিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে একবারও তিনি কলকাতায় যাবার কথা মনের মধ্যে আনেননি। থেকে গিয়ে সেবা করবার জন্যেই তো তিনি এসেছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দ তাকে বলেছিলেন বাংলাকে ভুলে যাও’ এবং সেই নির্দেশ সারাক্ষণ মহারাজের মনের মধ্যে থেকে গিয়েছিল। অন্তত তিনজন সঙ্ঘসভাপতি (স্বামী ব্রহ্মানন্দ, স্বামী শিবানন্দ ও স্বামী অখণ্ডানন্দ) চেষ্টা করেও তাকে বেলুড়ে নিয়ে যেতে পারেননি। চতুর্থ সভাপতি স্বামী বিরজানন্দ যখন বেলুড়ে শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দির তৈরি হলো তখন কল্যাণানন্দকে মস্ত চিঠি লিখলেন,একবার বেলুড় ঘুরে যাবার জন্যে। তিনি রাজি হলেন না। ১৯৩৭ সালে মহারাজ আমাকে বেলুড় ঘুরে আসতে বললেন, কিন্তু আমি বললাম, “আপনি না গেলে আমি যাব না, আমি এখানে থেকে যাব।”
বিবেকানন্দ নির্দেশিত সেবা সত্যিই বড় কঠিন ব্রত। অবিচলিত নিষ্ঠাই এই পথে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র উপায়।
মঠ ও মিশনের কিংবদন্তি সন্ন্যাসীদের অনেকেই হরিদ্বার ও কনখলে গিয়েছেন। এঁদের জন্যে স্বামী কল্যাণানন্দের দ্বার ছিল অবারিত। প্রেসিডেন্ট স্বামী ব্রহ্মানন্দ ১৯০৪ সালে কনখলে এসেছিলেন। সেই সময়ে যে চেয়ারে তিনি বসতেন তা সযত্নে রেখে দিয়েছিলেন কল্যাণানন্দ। সকলের সামনেই থাকত এই চেয়ার, কিন্তু কেউ বসতেন না। প্রতিদিন সকালে মন্দির থেকে বেরিয়ে কল্যাণানন্দ একবার এই চেয়ারটি স্পর্শ করতেন শ্রদ্ধাভরে। সর্বতানন্দ একবার জানতে চাইলেন, চেয়ারটা রঙ করতে পারি কি?
“রঙ করতে পারো, কিন্তু চেয়ারটা চোখের সামনে থেকে সরিয়ে রেখো না।” ফলে সর্বগতানন্দ চেয়ারটা পরিষ্কার করলেন, রঙ লাগালেন এবং একটা বিজ্ঞপ্তি ঝুলিয়ে দিলেন, “দয়া করে এই চেয়ারটা ব্যবহার করবেন না।”
১৯১৬ সালে স্বামী ব্রহ্মানন্দ আবার কনখলে এসেছিলেন। তখন সেবাশ্রমে যক্ষ্মা রোগীদের জন্যে একটা আলাদা বাড়ি তৈরি হচ্ছে। সুন্দর বাড়ি, বেশ জায়গা রয়েছে, একটা বড় হলঘরও রয়েছে। তখনও গৃহপ্রবেশ হয়নি, রাজা মহারাজ বললেন, “চমৎকার বাড়ি, এখানে দুর্গাপুজো করা যাক।” সেই মতো ওখানেই দুর্গাপুজো হলো, সবাই উৎসবে অংশগ্রহণ করল।
এরপরে প্রেসিডেন্ট মহারাজ বললেন, “কল্যাণ, মন্দিরের পক্ষে এটা উপযুক্ত স্থান। অনেক লোক আসতে পারবে।”
মহারাজ কনখল থেকে চলে যাবার পরে বেশ কয়েকজন সন্ন্যাসী কল্যাণানন্দকে মনে করিয়ে দিলেন, স্বামী ব্রহ্মানন্দ চেয়েছেন এটিকে পূজালয়ে রূপান্তরিত করতে। কল্যাণানন্দ সোজা উত্তর দিলেন, “শোনো, যক্ষ্মা রোগীদের ওয়ার্ড করবার জন্যে আমি লোকের কাছ থেকে ডোনেশন নিয়েছি। অন্য কোনো কাজে আমি কখনোই এটা ব্যবহার করতে পারব না। প্রেসিডেন্ট মহারাজ ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন সে সম্বন্ধে সন্দেহ নেই, কিন্তু যে কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমরা টাকা তুলেছি সেটা পালন করা আরও গুরুত্বপূর্ণ।”
