এরপরেই মহারাজ জিজ্ঞেস করলেন, “ইংরিজি ‘পেশেন্ট’ (রোগী) শব্দটার অর্থ কী? ওদের সঙ্গে ব্যবহারে আচরণে আমাদের ধৈর্ষ অর্থাৎ ‘পেশেন্স দেখাতে হবে। রোগীদের পেশেন্ট বলা হয় এই জন্যে যে ওরা আমাদের শেখায় কীভাবে ধৈর্যশীল হতে হয়।”
কনখলের সেবাশ্রমের রোগী প্রসঙ্গে সন্ন্যাসীরা যা বলজেতার কাছাকাছি ভাবধারা প্রবাহিত হয়েছিল বারাণসীর রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমেও। সেখানকার অন্যতম প্রাণপুরুষ ছিলেন স্বামী অচলানন্দ, স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর এই প্রিয় শিষ্যকে কেদারবাবা বলে ডাকতেন। বারাণসী সেবাশ্রমের এক প্রবীণ সন্ন্যাসী কেদারবাবার কিছু স্মৃতি আমাদের উপহার দিয়েছেন :
“সহকর্মী আরও একজন নবাগত সাধু সঙ্গে রয়েছে- কেদারবাবাকে প্রণাম করতে গিয়েছি।
আমরা সম্মুখে গিয়ে দাঁড়াতেই জিজ্ঞেস করলেন–এসো, আজ কটি নারায়ণ এলেন? কী সেবা করেছ তাদের বলো।‘
আমি হাতজোড় করে নিবেদন করলাম, মহারাজ, আজ চারজন নারায়ণ ভর্তি হয়েছে।
বললাম, তাদের কার কী অসুখ। আমার বন্ধু সাধুটি পরে জানান–আমার ওয়ার্ডে দু’জন পেশেন্ট’ (রোগী) এসেছে।
লক্ষ্য করলাম, কেদারবাবা বন্ধুর এই কথা শুনেই গম্ভীর হয়ে রইলেন–আর একটিও কথা বললেন না। খানিকক্ষণ বাদে আমার দিকে তাকিয়ে বলতে থাকেন, তোমরা সেবা করবে খুব ভাব নিয়ে। তাতে তোমার নিজের কল্যাণ হবে, যার সেবা করছ তারও কল্যাণ হবে। তুমি ভাববে নারায়ণের সেবা করছ। আর যার সেবা করছ, সে দেখবে–ভগবান আমারও জন্য ব্যবস্থা রেখেছেন–আমাকেও দেখবার জন্য ভগবান কাউকে নিযুক্ত রেখেছেন। মনে মনে সে বলবে–হে ভগবান তুমি আমাকেও দেখছ!’
আর খুব খোঁজ নিতেন–কখন তুমি বলতে পার? ভগবানের চিন্তা কতক্ষণ করতে পার?
কেদারবাবা প্রায়ই মনে করিয়ে দিতেন–”যখনই সময় পাবে, তখনই বসবে এবং ভগবানের নাম করবে। ভগবানের নাম জপ, তার ধ্যান এবং তারই নারায়ণ মূর্তির সেবা–এই দুই সাধনই সমান ভাবে রাখবে।”
কনখল সেবাশ্রমের নারায়ণ প্রসঙ্গে ফেরা যাক। কল্যাণানন্দের জীবন দর্শন বুঝতে এই অভিজ্ঞতাটি সকলকে সাহায্য করবে। ”কয়েকজন লোক এক গুরুতর অসুস্থ মানুষকে কনখল সেবাশ্রমে নিয়ে এল। ভরদুপুর বেলা, হাসপাতাল তখন বন্ধ। যারা মানুষটিকে বয়ে এনেছিল তারা হাসপাতালের বাইরে রাস্তায় মানুষটিকে ফেলে রেখে অদৃশ্য হয়েছে। গঙ্গাস্নান করে ফেরবার পথে মানুষটিকে পড়ে থাকতে দেখে আমি ডাক্তার ডেকে আনলাম, ডাক্তার রোগী পরীক্ষা করে বললেন, ভিতরে নিয়ে গিয়ে লাভ নেই, রোগী এখনই মারা যাবে।
“এই বলে ডাক্তারবাবু তো চলে গেলেন, কিন্তু আমি রোগী ছেড়ে নড়তে পারছি না। আমি প্রায় অসহায়ভাবে মানুষটির দিকে তাকিয়ে আছি, কি করব ভেবে উঠতে পারছি না। এমন সময় দেখি, ভিতর থেকে কল্যাণ মহারাজ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন, ইঙ্গিতে জানতে চাইছেন কি হয়েছে?
“আমি সমস্ত ব্যাপারটা বললাম। সব শুনে মহারাজ বললেন, “না, একটা বেড রেডি কর, রোগীকে ভিতরে নিয়ে এস। যদি মৃত্যু অবধারিত হয়, তা হলে শান্তিতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করুক মানুষটি। তুমি অন্তত কিছুক্ষণ সেবা করবার সুযোগ পাবে।”
“আমি সঙ্গে সঙ্গে লেগে পড়লাম। দুটি বালকের সাহায্য নিয়ে রোগীকে ভিতরে নিয়ে এলাম। এবার মহারাজ স্বয়ং চলে এলেন, রোগী দেখলেন এবং দু’একটা ওষুধ লিখে দিলেন। বললেন, গ্লুকোজের জল ও লেবুর রস দাও। চার ঘণ্টা পরে মানুষটি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করল। ইতিমধ্যে যারা এই রোগীকে হাসপাতালের সামনে ফেলে চলে গিয়েছিল তাদের দু’জন ফিরে এসেছে।”
রোগীর সঙ্গী মানুষ দুটি সন্ন্যাসীদের আচরণ দেখে মুগ্ধ। দাহের সব দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়ে মহারাজ যে বিষয়টার গুরুত্ব আমাদের বোঝালেন তা ভুলবার নয়–সেবা কতক্ষণ ধরে করা হলো সেটাই বড় কথা নয়, যা যতক্ষণ দরকার তা করতেই হবে, খুব সামান্যক্ষণের জন্যে হলেও সেই সেবার গুরুত্ব অসীম।
আরও একবার প্রায় একই পরিস্থিতি। খুব সঙ্কটাপন্ন রোগী এসেছে। কল্যাণ মহারাজ পিছপাও হতে চান না, কাউকে ফেরাতে চান না। তিনি বললেন, “ধর তোমার নিজের ভাই এই অবস্থায় রয়েছে। তার জন্যে তুমি কি না করবে! অপরের সম্বন্ধে একই রকম ভাবতে হবে আমাদের।”
এবার মহারাজ ডাক্তারকে বললেন, “নারায়ণকে না জানিয়ে কোনো রোগীকে ফিরিয়ে দেবেন না।” পরের নির্দেশ : “ওকে না জানিয়ে কোনো রোগীকে ছুটি দিয়ে দেবেন না।”
এই ছুটি দিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে কল্যাণ মহারাজের নিজস্ব কিছু ভাবনাচিন্তা ছিল। রোগ সেরে যাওয়ায় ডাক্তার হয়ত ছেড়ে দিতে আগ্রহী, কিন্তু মহারাজ জানেন গরীব রোগীর বাড়ির লোক প্রয়োজনীয় পথ্য দিতে পারবে না যাতে সুস্থ হয়ে সে আবার রুজিরোজগার শুরু করতে পারে।
হাসপাতালে যেসব রোগী আসত তাদের বেশিরভাগই অত্যন্ত দরিদ্র। পেট চালানোর জন্যে তাদের প্রচণ্ড দৈহিক শ্রম করতে হয়। তাই মহারাজ চাইতেন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবার আগে তাদের শারীরিক ক্ষমতা কিছুটা ফিরে আসুক। এক একজন রোগী দেখে মহারাজ বলতেন, “একে আরও কদিন রেখে দাও এবং খুব ভাল করে খাওয়াও। একটু শক্তি ফিরে পাক, তারপর ওকে বাড়ি পাঠিও।”
“হাসপাতাল থেকে ছাড়বার সময় মহারাজ শুধু এদের কয়েকদিনের ওষুধ দিয়ে দিতেন তানয়, রান্নাঘর থেকে বেশ কিছু খাবার গুছিয়ে দিতেন। এর জন্যে রামকৃষ্ণ মিশন’ মার্কা বিভিন্ন সাইজের বেশ কিছু শিশিবোতল আমাদের স্টকে থাকত।
