“যখন তিনি বাগান দেখতে বেরোবেন তখনও সঙ্গে আমি। তিনি চাইছেন, সেবাশ্রমের সব কিছু যেন আমার জানা থাকে রোগীরা কারা, বাগানে কী হচ্ছে, সমস্ত কিছু।
“একদিন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আজকে আশা করি তুমি বাগানে গিয়েছিলে, ছোট্ট ম্যাগনোলিয়া গাছটায় কটা ফুল দেখলে? আমি বলতে পারলাম না, অতো খুঁটিয়ে লক্ষ্য করিনি।
“জানো, ওটা একটা স্পেশাল গাছ। এসবের দিকে নজর রাখার চেষ্টা করলে ভাল হয়। কল্যাণমহারাজের প্রশ্নের ধারা এমন যে আমি সব কিছু খুঁটিয়ে দেখি।
“আর একদিন তিনি একজন রোগী সম্বন্ধে খবরাখবর জানতে চাইলেন। আমি উত্তর দিতে পারলাম না। তার মন্তব্য : ‘তুমি কি রাউন্ডে বেরিয়ে নজর রাখো না হাসপাতালের কোথায় কী হচ্ছে?
“আমি সঙ্গে সঙ্গে ছুটে হাসপাতালে গেলাম, খবর নিতে। এইভাবে আমি মহারাজ রাউন্ড দেবার আগেই নিজের একটা রাউন্ড দেওয়া শিখে নিলাম।
“অভিজ্ঞ আমি বুঝে গিয়েছি, আমাকে প্রত্যেক রোগীর খোঁজ নিতে হবে, সিরিয়াস রোগীদের সমস্ত খবরাখবর আমাকে আগাম দিতে হবে মহারাজকে।
“এই পর্বে মহারাজ নিজেই ডায়াবিটিস রোগের শিকার হয়েছেন, ফলে যদি কখনও রাউন্ড দিতে পারলেন না, আমাকে সমস্ত খবরের খুঁটিনাটি সরবরাহ করতে হবে। এইভাবে ধীরে ধীরে মহারাজ আমাকে শিখিয়ে দিলেন, কিভাবে তিনি হাসপাতালের সব কাজ সারেন।”
মহারাজের দৈনন্দিন রুটিন মনে রাখার মতন।
“সকালের জলখাবারের পর আমাকে মহারাজের ঘরে যেতে হবে। সেখান থেকে আমি ওঁর সঙ্গী। বিভিন্ন হাসপাতাল ওয়ার্ড, বাগান, গোয়ালঘর, লাইব্রেরি, মন্দির।
“তারপর আমাদের লক্ষ্যস্থল রান্নাঘর, সেখানে রাঁধুনির সঙ্গে কিছু কথাবার্তা, এবার মহারাজের ঘরে ফিরে আসা। আবার হাসপাতালে যাবার আগে মহারাজ কিছু খেয়ে নেবেন। ডাক্তাররা তো রোগীদের ভিজিট করেন, কিন্তু মহারাজ প্রত্যেক রোগীর বেডের কাছে যাবেনই, জানতে চাইবেন তার অবস্থা। কেমন আছে? কি কি ওষুধ এবং পথ্য সে পাচ্ছে? গতরাত্রে ভাল ঘুম হয়েছে তো? হাসপাতালের ৩৫-৪৫ জন ইনডোর রোগীর সঙ্গে তিনি বেশ কিছু সময় ব্যয় করবেন। কখনও তিনি রোগীর পাশে গিয়ে বসবেন, তার কথাবার্তায় দয়া এবং ভালবাসা দুইই ঝরে পড়ে অঝোরে। রোগীর বিশেষ কিছু প্রয়োজন থাকলে ডাক্তারকে ডেকে পাঠাবেন, অথবা আমাকে নির্দেশ দিয়ে দেবেন। এই হচ্ছে কল্যাণ মহারাজের প্রাত্যহিক রুটিন।
“বেশি কথা বলবার মানুষ ছিলেন না কল্যাণ মহারাজ। কথায় নয় কাজে, বিশেষত নিজের আচরণের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেওয়ার বিশ্বাসী ছিলেন এই মিতভাষী মানুষটি। আমরা তাই মানুষটিকে সারাক্ষণ পর্যবেক্ষণ করতাম খুব কাছ থেকে খুব খুঁটিয়ে। একদিন সকালে কয়েকজন ব্রহ্মচারী হাঁটতে হাঁটতে ডিসপেন্সারির দিকে চলেছে, মহারাজ লক্ষ্য করলেন একজন ব্রহ্মচারীর মুখ গোমড়া।
“মহারাজের নজর এড়ানো শক্ত, তিনি তাকে ডাকলেন, জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার? মুখ ভারী কেন? কী হয়েছে? রাত্রে ভাল করে ঘুমোতে পেরেছ তো? আজ সকালে জলখাবার খেয়েছ তো?”
“ব্রহ্মচারীটির মুখ তখনও মেঘলা। মহারাজ এবার বললেন, ‘শোনো, তুমি হাসপাতালের সেবক, সেখানে মানুষরা অসুস্থ হয়ে শুয়ে আছে। তোমার কাজ তাদের মুখে হাসি ফোঁটানো, রোগীকে চাঙ্গা করে তোলা। কিন্তু নিজের মুখটাই হাঁড়ি হয়ে থাকলে তুমি সে কাজটা করবে কী করে? নিজের এই গোমড়া মুখ নিয়ে রোগীদের কাছে যেও না। বরং মন্দিরে চলে যাও, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণর কাছে প্রার্থনা করো। তারপর মুখে হাসি ফুটিয়ে আনন্দিত মনে ডিসপেন্সারিতে যাও।
কল্যাণ মহারাজ চাইতেন না কেউ খুশির ভাব না নিয়ে বেজার মুখে হাসপাতালের কাজে যায়। তিনি প্রায়ই বলতেন, “তোমরা সকলে এখানে মনের আনন্দে এসেছো। আনন্দে থাকো, অপরকে আনন্দ দাও। এইটাই এখানকার সবচেয়ে বড় কথা।”
মহারাজ এই প্রসঙ্গে যীশুর কথা টেনে আনতেন। যীশু বলেছেন, মুখে দুঃখের ভাব প্রকাশ করে উপবাস কোরো না। “তুমি হয়ত কঠোর আত্মসংযমী ক্লিষ্ট জীবন যাপন করছে, কিন্তু তার জন্যে তোমাকে বিষয় অবসাদগ্রস্ত দেখাবে কেন?”
হাসপাতালে সন্ন্যাসীদের কাজে পাঠাবার আগে মহারাজ প্রায়ই নানা কথা বলতেন। চাইতেন তারা চাঙ্গা হয়ে উঠে, অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের কাজে যান।
মহারাজের কথা বলার ভঙ্গিটাই ছিল অনন্য। তিনি বলতেন, “দেখো, আমাদের এখানে মন্দিরও আছে, হাসপাতালও আছে। তোমরা মন্দিরে যাও ফুল নিয়ে, ফল নিয়ে, সঙ্গে স্তবগান, নামগান, স্তোত্রপাঠ, মন্ত্রপাঠ। আর হাসপাতালে তোমার সঙ্গে রয়েছে খাবার ও ওষুধ। দুটোর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই– একেবারে এক ব্যাপার। মন্দিরে আমরা যা করি, আর হাসপাতালে আমরা যা করি দুটো আলাদা জিনিস নয়। এই হচ্ছে স্বামী বিবেকানন্দর আদর্শ। তাই দু’জায়গাতেই একই রকম মানসিকতা নিয়ে যেতে হবে।”
মহারাজ আরও বলতেন, “সবকিছু অত্যন্ত সাবধানে সচেতনভাবে পরিষ্কার রাখবে। রোগীকে ভালবাসা, করুণা সহানুভূতি দেখাও। তোমাদের সাহায্য ওদের প্রয়োজন।”
আরও একদিনের কথা মনে আছে। তিনি ব্যাখ্যা করলেন, কেন ‘রোগীনিবাস’ না বলে হাসপাতাল’ বলে। আমাদের অবশ্যই অতিথিপরায়ণ অর্থাৎ হসপিটেল’ হতে হবে। মানুষ যখন আমাদের কাছে আসে আমাদের যেটা দেবার সেটা হলো হসপিটালিটি বা অতিথিসেবা। এই ব্যাপারটা কখনও ভুললে চলবে না।”
