“আমি কিছু কিছু টাকা ওই ফান্ডে সুযোগ পেলেই দিতে আরম্ভ করলাম। আস্তে আস্তে চারপাঁচ হাজার টাকা হলো। এই সময় আমি (১৯৪৩) কনখল থেকে করাচি সেন্টারে বদলি হলাম। সেখানে খবর পেলাম এই ফান্ডকে জেনারেল ফান্ডের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি প্রতিবাদ জানালাম। এটা করবার অধিকার আমাদের নেই। একজন মহান সন্ন্যাসী চেয়েছিলেন স্বামীজির মর্মর মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হোক। আমাদের উচিত তার ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানানো। ফান্ড আলাদা থাকুক, কিছু কিছু সুদ জমা পড়ুক। পরে কোনো সময়ে কেউ পরিকল্পনাটা বাস্তবায়িত করতে পারবেন। এসব ১৯৪৪-৪৫ এর ঘটনা। ১৯৬০ সালে বিবেকানন্দ শতবর্ষ উদযাপন পর্বে এই তহবিলের কথা মনে পড়ে গেল। যাঁরা স্বামী নিশ্চয়ানন্দকে জানতেন এবং খুব ভালোবাসতেন তারা বললেন, আমরা এই মূর্তি তৈরির জন্য টাকা তুলে দেব। তারা কথা রেখেছিলেন এবং স্বামীজির চমৎকার একটি মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হলো শেষপর্যন্ত।”
.
নিশ্চয়ানন্দপর্বে তার ছবি আঁকতে গিয়ে কল্যাণানন্দজির কথা আমরা একটু কম বলেছি। উপকরণের অভাব নেই, বিভিন্ন স্মৃতিকথা ছাড়াও, আমাদের হাতের গোড়ায় রয়েছে স্বামী সর্বগতানন্দের বিবরণ। তার বিবরণ কল্যাণানন্দের শেষ জীবনের কথা, টাকা আনা পাই ও বিভিন্ন পরিসংখ্যানের বাইরেও আশ্চর্য একটি মানুষকে দেখতে পাই এই রচনায়। কোথায় অতি অল্পবয়সে পিতৃহারা বরিশালের হানুয়া গ্রামের উমেশচন্দ্র গুহের একমাত্র সন্তান দক্ষিণারঞ্জন, কোথায় বেলুড় মঠ, আর কোথায় কনখল। ভাগ্যের খেয়ালে কি বিচিত্র জীবনলীলা, যা পড়তে গেলে অবিশ্বাস্য মনে হয়। দু’জন সংসারবিরাগী একইদিনে স্বামীজির কাছে থেকে সন্ন্যাস পেয়েছিলেন–অপরজন স্বামী আত্মানন্দ (শুকুল মহারাজ)। সেবাকার্যের হাতেখড়ি অন্তিমশয্যায় শায়িত স্বামীজির গুরুভাই স্বামী যোগানন্দর সেবা। একমাস এই কাজ করে তরুণ দক্ষিণারঞ্জনের চোখ খুলে গিয়েছিল।
স্বামীজির নির্দেশ খুব স্পষ্ট ছিল। নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে তরুণ সন্ন্যাসীশিষ্যকে তিনি মিরাটের অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। সেখানে হাসপাতাল আছে, কিন্তু ক’জনই বা সেখানে ঢোকবার সুযোগ পায়? হরিদ্বারে হাসপাতাল স্থাপনের পরামর্শটা স্বামীজিরই। বলেছিলেন, রাস্তায় অসুস্থ লোক দেখলে তাকে নিজের কুঁড়েঘরে তুলে নিয়ে এসো, চিকিৎসা করো।
কনখলে জমি কেনার কারণ, হরিদ্বার তখনই ঘিঞ্জি, খোলা এবং খালি জায়গা পাওয়া কঠিন। কনখলে জমি কিনে যখন ওখানে কঁচাঘর তৈরি আরম্ভ হল তখনও লোকে বুঝতে পারছে না ওখানে কী হবে। কল্যাণমহারাজ জানিয়ে দিলেন ওখানে ডাক্তারি ক্লিনিক হবে যাতে মানুষ চিকিৎসার সুযোগ পায়। স্থানীয় লোকদের কেউ কেউ সাহায্যের হাত এগিয়ে দিয়েছিল। তিনি সুন্দর কুঁড়েঘর তৈরি করলেন, একটা বড় ঘর রোগীদের জন্যে, আর ছোটটা নিজের থাকবার জন্যে।
এই সময় ঠাকুরের সাক্ষাৎ-শিষ্য স্বামী নিরঞ্জনানন্দ হরিদ্বারে এসেছিলেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর সম্বন্ধে বলেন, দেখ না, নিরঞ্জন কিছুতেই লিপ্ত নয়, নিজের টাকা নিয়ে গরীবদের ডাক্তারখানায় নিয়ে যায়। তারই লুকিয়ে রাখা ঠাকুরের ভস্মাস্থি পরে আত্মারামের কৌটায় স্থান পায়। আমেরিকা থেকে ফিরবার পথে স্বামীজিকে অভ্যর্থনা জানাতে নিরঞ্জনানন্দ কলকাতা থেকে কলম্বোতে হাজির হয়েছিলেন। একসময় স্বাস্থ্যের জন্য হরিদ্বারে থাকার সিদ্ধান্ত নেন।
হরিদ্বারে কল্যাণানন্দের খবর পেলেন স্বামী নিরঞ্জনানন্দ। সুদেহী ও শক্ত শরীরের মালিক তিনি, বড় বড় কাঠের কড়ি বরগা তিনি অনায়াসে তুলে নিয়ে নিজের হাতে যথাস্থানে লাগিয়ে নিতে পারতেন। কনখলে কাজের জায়গায় একটা বিরাট কাঠের বিম পড়েছিল। তুলবার লোক পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন দু’জনে মিলে সহজেই ওটা তুলে ফেলে যথাস্থানে লাগিয়ে দিলেন। হরিদ্বারেই আকস্মিক কলেরায় মারা গেলেন স্বামী নিরঞ্জনানন্দ। তার কয়েকমাস পরেই নিশ্চয়ানন্দ কনখলে হাজির। তিনিও প্রভূত বলশালী এবং কাজে ভয় পান না। তিনি সানন্দে কল্যাণানন্দের সহকারী হয়ে গেলেন। ভিক্ষায় বেরুলে তিনি কল্যাণানন্দের জন্যে খাবার সংগ্রহ করে আনতেন, কারণ কল্যাণানন্দ প্রায়ই কাজ সেরে ভিক্ষায় বেরোতে পারতেন না।
স্বামী সর্বগতানন্দ তাঁর প্রথম কয়েকদিনের কনখল-অভিজ্ঞতা সহজভাবে লিখে ফেলেছেন। “হাসপাতালের হিসেব রাখা ছাড়াও আমি প্রায় সারাক্ষণ কল্যাণানন্দকে ছায়ার মতন অনুসরণ করতাম। তিনি যেখানে যেতেন, যা কিছু করতেন সব কিছুর নীরব সাক্ষী আমি। আমাকে অন্য কোনো কাজ বা দায়িত্ব তখনও দেওয়া হয়নি। কয়েক সপ্তাহ এইভাবে কাটিয়ে আমি তাকে আবার বললাম, আমি হাসপাতালে কাজ করতে চাই।
“ঠিক আছে, তুমি ওখানে যাও, জিজ্ঞেস করো ওরা তোমাকে কী কাজ দিতে চায়। স্বামী কল্যাণানন্দ বললেন।
“আমাকে ওখানে নির্দেশ দেওয়া হলো, ওয়ার্ডটা পরিষ্কার করো। আমি সুইপার মেয়েটির কাছ থেকে শিখে নিলাম কেমন করে পিকদানি পরিষ্কার করতে হয়, বেডপ্যান পরিষ্কারের জন্যে একধরনের বুরুশ কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু মহারাজ যখনই চাইবেন তখনই আমাকে তার সঙ্গী হতে হয়। যখন তিনি রোগী দেখার জন্যে রাউন্ডে বেরোবেন তখন আমাকে অবশ্যই সঙ্গে থাকতে হবে।
