স্বামী সর্বগতানন্দ এই অস্পৃশ্য ভাঙ্গী সাধুজীবনের একটি স্মরণীয় বর্ণনা দিয়েছেন। এই কাহিনীর মূলে আর একজন উদারহৃদয় সন্ন্যাসী শ্রীমৎ স্বামী ধনরাজ গিরি, শঙ্করাচার্যের হৃষীকেশস্থ কৈলাস মঠের মণ্ডলেশ্বর। স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ হৃষীকেশে থাকার সময় শ্রীমৎ ধনরাজ গিরিজীর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন এবং দু’জনের মধ্যে শাস্ত্রালোচনা হয়েছিল। পরবর্তীকালে স্বামী অভেদানন্দও তার কাছে গিয়েছিলেন এবং কিছুকাল বেদান্ত অধ্যয়ন করেছিলেন। ভজনলাল লোহিয়া ও হরসহায়মল শুকদেবদাস নামক দুই ধনপতি এঁর সঙ্গে কনখলে দেখা করে একটি মঠ বা ধর্মশালা তৈরি করে দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। প্রসন্নহৃদয় ধনরাজ গিরি তাদের পরামর্শ দিলেন বিবেকানন্দর দুই শিষ্য এখানে কী কাজ করছে একটু খোঁজখবর করুন। দুই বন্ধু সেবাশ্রমের কাজ দেখে অবাক হয়ে সেবাশ্রমের বাড়ি তৈরির খরচ বহন করেন। এই ভবনের উদ্বোধন হয় ১৯০৫ সালের প্রথম দিকে।
ভাঙ্গী সমস্যার কথা আবার উঠল ১৯১০ সালে–সেবারে ধনরাজ গিরির আগমন উপলক্ষে তার মঠে বিশেষ ভাণ্ডারার ব্যবস্থা হয়েছে। কাছাকাছি যেখানে যত সন্ন্যাসী আছেন সবাই ভাণ্ডারার মহাভোজে নিমন্ত্রিত। ধনরাজ গিরি তার সন্ন্যাসীদের জিজ্ঞেস করলেন, শুনেছি স্বামী বিবেকানন্দর দুই শিষ্য কাছাকাছি থাকেন, তাদের জানো? “হ্যাঁ, এঁরা কাছাকাছি থাকেন, কিন্তু ব্যাপারটা সুবিধের নয়, এঁরা ভাঙ্গী সাধু, এমন সব নিচু কাজকর্ম করেন।” ধনরাজ জানতে চাইলেন, “কী করেন এঁরা?” “এঁরা মেথরের কাজও করেন।” “নিচু কাজ! অসুখ করলে তোমরা কোথায় যাও? তোমরা হাসপাতালে যাও না?” “হ্যাঁ আমরা যাই।” ধনরাজ বললেন, “তার মানে প্রয়োজনে ওঁদের সেবাশ্রমে যাও, চিকিৎসা নাও, আর তোমরাই বলো এঁরা ভাঙ্গী সাধু! যাও ওঁদের ভাণ্ডারায় নেমন্তন্ন করে এসো,” এই দু’জন অতিথিকে ধরে আনবার জন্যে ধনরাজ গিরি তার এক সন্ন্যাসীকে পাঠালেন।
স্বামী কল্যাণানন্দ যেতে রাজি হলেন, কিন্তু নিশ্চয়ানন্দ টলবার মানুষ নন। তিনি সোজা বললেন, “আমি যাচ্ছি না। ফলে কল্যাণানন্দও ভাণ্ডারায় যেতে পারলেন না। দূত ফিরে গিয়ে ধনরাজ গিরিকে জানালেন, দুই সন্ন্যাসী এই ভোজে আসতে রাজি নন। ধনরাজ গিরি ছাড়বার পাত্র নন। দূতকে বললেন, “আবার যাও, বলো আমি চাই ওঁরা আসুন।” এই কথা শুনে কল্যাণানন্দ তার গুরুভাইকে বললেন, “ধনরাজ গিরিকে আঘাত করা ঠিক হবে না। চলো আমরা যাই।” নিশ্চয়ানন্দের সাফসুফ উত্তর, “কেন যাব? আমরা তো ওঁদের ওপর নির্ভর করি না। কেন আমরা যাব? একদিন ভূরিভোজ, কাল থেকে আবার শুকনো রুটি।”
তরুণ সন্ন্যাসী হতাশ হয়ে ফিরে যাওয়ায় ধনরাজ গিরি সব খবর পেলেন। তিনি এবার তার সেক্রেটারিকে যেতে নির্দেশ দিলেন। “ওঁদের যে করে হোক নিয়ে এসো। ওঁদের বলল, ওঁরা না এলে এখানে উৎসব বন্ধ।” সাধুটি এসে দুই গুরুভাইকে বললেন, “দয়া করে চলুন। আপনারা এলে মহারাজ অনুষ্ঠান আরম্ভই করবেন না।” ইতিমধ্যে দেরি হয়ে যাচ্ছে, ঘড়িতে দুটো বাজে। নিশ্চয়ানন্দ তখনও যেতে রাজি নন, কিন্তু কল্যাণানন্দ বললেন, “ধনরাজগিরি মহারাজের মুখ চেয়ে আমাদের যাওয়াটাই ভালো–একজন ভালো সন্ন্যাসী আমাদের নিমন্ত্রণ পাঠিয়েছেন, তার সম্মান আমাদের রাখা উচিত।” এবার ফল হলো এবং দুই ভাই ভাণ্ডারায় যোগ দেবার জন্য সেবাশ্রম থেকে বেরিয়ে পড়লেন।
মঠের দ্বারপ্রান্তে স্বয়ং ধনরাজ গিরি এই দুই বিবেকানন্দশিষ্যকে স্বাগত জানালেন। সবাইকে বিস্মিত করে মণ্ডলেশ্বর প্রথমে দু’জনকে আলিঙ্গন করলেন এবং তারপর নতজানু হয়ে প্রণাম করলেন। এই দেখে উপস্থিত সাধুরা অবাক হয়ে গেলেন, তারা তাদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। এবার দুই বিবেকানন্দ শরণাগতকে নিয়ে তিনি মঠের মধ্যে ঢুকে গেলেন এবং ভাণ্ডারা প্রাঙ্গণে দু’জনকে তার দুধারে বসালেন। সমবেত সাধুজনদের উদ্দেশে তিনি বললেন, “আপনারা সবাই ভাবছেন আপনারা মস্ত সাধু। যদি প্রকৃত সাধুর খোঁজ করতে হয় তা হলে এঁরা দু’জন। এঁরা দরিদ্রনারায়ণের সেবায় এক আশ্চর্য জীবন যাপন করেন, এঁদের আদর্শ হচ্ছেন স্বামী বিবেকানন্দ। নব যুগের নতুন আদর্শ এঁরা। আপনারা রোগাক্রান্ত হলে এঁরা আপনাদের সেবা করেন, আর তার বদলে আপনারা এঁদের ভাঙ্গী সাধু বলেন!” এইভাবে ভর্ৎসনা করে তিনি কল্যাণানন্দ ও নিশ্চয়ানন্দকে উদ্দেশ করে বললেন, “যেসব অপমানের বোঝা আপনাদের বহন করতে হয়েছে তার জন্য আমাকে ক্ষমা করুন।” তিনি নিজে ক্ষমা ভিক্ষা করছে! এবার সন্ন্যাসী ভ্রাতৃদ্বয় বললেন, “মহারাজ এইভাবে আমাদের লজ্জা দেবেন না। আমরা এখানকার অপমান অপবাদ গায়ে মাখিনি।”
সেবাশ্রমের আরও একটি গল্প স্বামী সর্বতানন্দ আমাদের শুনিয়েছেন। নিশ্চয়ানন্দের দেহাবসানের ৬ মাস পরে (৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৫) তরুণ নারায়ণ ব্রহ্মচারী কনখলে সেবাশ্রমের কাজ শুরু করেছেন। হিসেব খাতা পরীক্ষা করতে গিয়ে তিনি দেখলেন, নিশ্চয়ানন্দের সাধ ছিল তাঁর গুরু বিবেকানন্দের মর্মরমূর্তি এখানে স্থাপন করবেন। কল্যাণানন্দজিকে জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন, নিশ্চয়ের খুব সাধ ছিল উঁচু একটা বেদীর ওপর চমৎকার মূর্তিটি শোভা পাবে, কিন্তু নিশ্চয় টাকা জোগাড় করতে পারেনি। কোনোক্রমে হাজার দুয়েক টাকা সংগ্রহ করেছিল।
