স্বামী নিশ্চয়ানন্দের জীবনীকার হিসেব করে দেখিয়েছে, একপর্যায়ে তাকে প্রতিদিন ছত্রিশ মাইল হাঁটতে হতো। আরও একটা ব্যাপার, নিশ্চয়ানন্দ কনখলেও মশারি ব্যবহার করতেন না। বেলুড় মঠে থাকার সময় থাকতেই এই সন্ন্যাসী মশারিবিহীন। বড় বড় মশার কামড়ে শরীর ক্ষতবিক্ষত। বিছানায় রক্তের চিহ্ন দেখে স্বামীজি একদিন বেলুড়ে বকাবকি করেছিলেন। নিশ্চয়ানন্দ বলেছিলেন, “স্বামীজি আমি তো ভোগ করতে আসিনি।” স্বামীজি তাঁর শিষ্যকে বুঝেছিলেন এবং বলেছিলেন, “বেশ এখন তবে এমনই চলুক, তবে যখন প্রয়োজন হবে তখন কিন্তু মশারি ব্যবহার করবে।” কনখলেও একই অবস্থা, মশারি নেই। মহাপ্রয়াণের (১৯৩৪, ২২ অক্টোবর) মাত্র কয়েকদিন আগে কল্যাণানন্দ তাকে স্বামীজির নির্দেশ মনে করিয়ে দিয়ে মশারি ব্যবহারে রাজী করিয়েছিলেন।
স্বামী নিশ্চয়ানন্দের গুরুভক্তির যত গল্প ছড়িয়ে আছে তা ঠিকমতন সংগ্রহ করলে পুরো একটা বই হয়ে যায়। কনখলে সকালে শয্যাত্যাগ করে স্বামী নিশ্চয়ানন্দ যখন বেরিয়ে আসতেন তখন তার মুখটা গামছায় ঢাকা থাকত। ওই অবস্থায় চলে যেতেন গুরুজির ছবির কাছে, স্বামীজিকে প্রণাম করে তবে অবগুণ্ঠনমুক্ত হতেন এই ভক্ত।
আরও একটা মজার ব্যাপার। বয়সে নিশ্চয়ানন্দ তার গুরুভাই কল্যাণানন্দের থেকে প্রায় ন’বছর বড় ছিলেন, কিন্তু ছোটকেই দাদার মতন সম্মান করতেন। হরিদ্বার কনখলের লোকদের কাছেও তিনি ছিলেন ‘ছোট স্বামী’। বড় স্বামীটি অবশ্যই তার কনিষ্ঠ গুরুভাই কল্যাণানন্দ।
নিশ্চয়ানন্দের কাজ ছিল খুব গুছনো। গুরুদেব স্বামী বিবেকানন্দ যে হিসেবের ব্যাপারে ভীষণ খুঁতখুঁতে ছিলেন তা তার কোনো শিষ্যের অজানা ছিল না। কাশীর সেবাশ্রম প্রসঙ্গে স্বামীজি শুধু সেবাযত্নের খোঁজখবর নিতেন না, সবাইকে সেবাশ্রমের সঠিক হিসাবপত্তর রাখতে বলেছিলেন। তার কঠোর নির্দেশ : “যিনি যে উদ্দেশ্যে অর্থ দেন, তার সেই অর্থ সেই উদ্দেশ্যেই ব্যয়িত হওয়া উচিত।”
নিরন্তর পরিশ্রম এবং অত্যধিক কঠিন জীবনযাত্রা শেষপর্যন্ত নিশ্চয়ানন্দের শরীরের ওপরেও ছায়া ফেলেছিল। শুতেন একটা খাঁটিয়ায়, তার ওপরে একটি চাদর, খাওয়া দাওয়াও যৎসামান্য। একদিনও কাজ থেকে ছুটি নয়, সেই যেদিন সেবাশ্রমে উপস্থিত হয়েছেন সেদিন থেকে একদিনও ছুটি নেবার কথা ভাবেননি নিশ্চয়ানন্দ।১৯৩২ সালের বর্ষাকালে গ্যাসট্রিক আলসারে তিনি মরণাপন্ন। সেই সময় কল্যাণানন্দর শরীরও ভালো নয়, স্বাস্থ্যসন্ধানে তাকে জোর করে পাঠানো হয়েছে মায়াবতী আশ্রমে। ফলে সেবাশ্রমের দায়িত্ব এসে পড়েছে সন্ন্যাসী নিশ্চয়ানন্দের ওপরে।
খাওয়া দাওয়া তো ভিক্ষানির্ভর। একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। একসময় স্থানীয় কৈলাসমঠে তিনি নিত্যভিক্ষা নিতে যেতেন। মঠের অধ্যক্ষ গিরিজী মহারাজ তাঁর অনুরাগী। তিনি উপস্থিত থাকলে কোনো অসুবিধা হতনা। একবার তিনি দলবলসহ ক’দিনের জন্য অন্যত্র গিয়েছে, যাবার সময় নিশ্চয়ানন্দের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ নতুন কুঠারীর কাছে রেখে গিয়েছেন। প্রথম দিনে কুঠারী তাকে চিনতে পারল না। তার ওপর তিনি নগ্নপদ, দীনহীন মলিন বসন, উপরন্তু কাঁধে ওষুধের একটা ভাঙা বাক্স। কুঠারী নির্দ্বিধায় কাঙালবেশি সাধুকে জানিয়ে দিলেন, এখানে বাইরের সাধুকে ভোজন করানোর ব্যবস্থা নেই। ”অভিমানশূন্য নিশ্চয়ানন্দ অম্লানবদনে ফিরে গিয়ে কালীকমলী ছত্রে ভিক্ষা গ্রহণ করলেন। অতঃপর তিনি আর কৈলাস মঠে যান নাই।”
অধ্যক্ষ ধনরাজগিরি ফিরে এসে নিশ্চয়ানন্দকে প্রত্যহ আসতে না দেখে খোঁজখবর করলেন এবং কুঠারীকে তিরস্কার করে তাকে পাঠালেন, যে করেই হোক তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। কুঠারী এরপর নিশ্চয়ানন্দের সঙ্গে দেখা করে তার পায়ে ধরে অপরাধ মার্জনা প্রার্থনা করেন। “নিশ্চয়ানন্দ তখন মহা অপ্রস্তুত হইয়া, কুঠারীর অনুরোধে পুনরায় কৈলাসমঠে গেলেন এবং সেইদিন হইতে পূর্ববৎ কৈলাসেই ভিক্ষা লইতে লাগিলেন।”
দেহত্যাগের দুসপ্তাহ আগেও কাজ-পাগল নিশ্চয়ানন্দের ছোট্ট বিবরণ আমাদের কাছে আছে। মোটা কম্বলে দুটো পা ঢেকে বসে তিনি সেবাশ্রমের হিসেবপত্তর দেখছে। কেন বিশ্রাম নিচ্ছেন না এই প্রশ্ন করায় নিশ্চয়ানন্দ বললেন, “এ তো ঠাকুরের সেবা। স্বামীজির কাজ। আমাদের এখনও তো সব কর্ম ক্ষয় হয়নি। মাটি কাদা অবস্থায় থাকলে সবটুকু ওঠে না–কিন্তু শুকিয়ে গেলে সব আপনিই খসে যাবে।” হিসেবপত্তরের ওপর নিশ্চয়ানন্দের সারাক্ষণ নজর। “আশ্রমের তহবিলে একদিন একটা আধলা উদ্বৃত্ত পাওয়া যায়। তহবিলরক্ষক সাধুটিকে নিশ্চয়ানন্দ এই আধলার হিসেবটিও প্রতিমাসে নিয়মিত জিজ্ঞাসা করতেন।”
কনখলে ১৫ বিঘা জমি দেড়হাজার টাকায় খরিদ হলেও, গোড়ায় বাড়ি তৈরির অর্থ ছিল না। তাই তিনটি কুঁড়েঘর তৈরি করে কাজ চলত। সন্ন্যাসীরা শুধু অস্পৃশ্য চামারদের বস্তিতে ঘুরে বেড়াতেন তা নয়, অসুস্থ মানুষের মলমূত্র নিজের হাতে পরিষ্কার করতে দ্বিধা করতেন না। এর ফলে যেমন প্রশংসা মিলেছে তেমন দুর্নামও রটেছে। দু’জনের নাম হয়ে যায় ভাঙ্গী সাধু’, কারণ মলমূত্র পরিষ্কার মেথরের কাজ। এর ফলে এমন সেবা করেও দুই সন্ন্যাসী প্রায় একঘরে হয়ে গিয়েছিলেন, সাধুদের কোনো অনুষ্ঠানে এঁরা আমন্ত্রিত হতেন না।
