কনখলের প্রাচীন নাম মায়াপুর। মহাভারতে এই অঞ্চলের নাম কুরুজাঙ্গল’। হরিদ্বারের নাম ছিল গঙ্গাদ্বার।
সেবাশ্রমের প্রথম ছাপানো রিপোর্টের নিবেদন, ডিসেম্বর ১৯০২ পর্যন্ত ১৮ মাসে ১০৫৪ রোগী সেবা পেয়েছে। কনখলে ইনডোর রোগী ১২৮, আউটডোর ৫৩৬, হৃষীকেশে ইনডোর ৩৬ এবং আউটডোর ৩৫৪। হৃষীকেশ শাখা খোলা হয় ১৯০২-এর গোড়ার দিকে। ১৯০৩ সালে মোট রোগীর সংখ্যা ২৭০২। তার পরের বছর রোগীর সংখ্যা ২৫০০, এর মধ্যে প্লেগের রোগী ২২ জন। রিপোর্টে জানানো হচ্ছে, হাসপাতালের যাবতীয় দায়িত্ব পালনে রয়েছেন মাত্র দু’জন সন্ন্যাসী ও একজন ব্রহ্মচারী। আর আছে একজন পাঁচক, একজন সাফাইকর্মী ও একজন ভৃত্য।
এপ্রিল ১৯০৩ সালে সেবাশ্রমের জন্য যে জমি কেনা হলো তার পরিমাণ ১৫ বিঘা–মূল হরিদ্বারে জমির দাম অনেক, সুতরাং কনখলই ভরসা। এই জমি কেনার দাম দিয়েছিলেন কলকাতার এক ভদ্রলোক, কিন্তু সেই সময় তিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
তিন টাকা ভাড়ার তিনখানি ঘর ছেড়ে সেবাশ্রম উঠে এলো শেখপুরার নিজের জমিতে, রোগীর সেবার জন্য তিনখানা চালাঘর তৈরি হয়েছে। সেবাশ্রমের প্রথম নকশা তৈরি করেন স্বামী বিজ্ঞানানন্দ (পরে মঠ মিশনের সভাপতি), তৈরির খরচ ৬০১৭ টাকা দেন বাবু ভজনলাল লোহিয়া।
কনখল ও হৃষীকেশ সেবাশ্রমের মধ্যে দূরত্ব ১৫ মাইল। দুটি সেবাকেন্দ্র চালানো একা কল্যাণানন্দের পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠেছিল, তাই হৃষীকেশ সেবাশ্রম কিছুদিন বন্ধ ছিল। নিশ্চয়ানন্দ আসায় বন্ধ-হওয়া কেন্দ্রটি আবার প্রাণবন্ত হলো। খুব ভোরবেলায় ১৫ মাইল পাহাড়ি পথ হেঁটে নিশ্চয়ানন্দ প্রতিদিন হৃষীকেশে যেতেন, তাঁর সাথী অবশ্যই কল্যাণানন্দ। সঙ্গে থাকত ওষুধের বাক্স এবং রোগীদের খাবার। দুপুরবেলায় এঁরা দু’জনে বেরোতেন মাধুকরীতে, কারণ রোগীর বরাদ্দ খাবারে তাদের কোনো অধিকার নেই। প্রয়োজনে কোনো ছত্রে গিয়ে নিজেদের ক্ষুধানিবৃত্তি করে দুই সন্ন্যাসী আবার ফিরে আসতেন রোগীদের খবরাখবর নিতে এবং সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীরে নিজেদের ডেরায় ফিরতেন। এই ব্যবস্থা চলত দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, গ্রীষ্ম শীত বর্ষায় কোনো পরিবর্তন নেই। এছাড়াও বড় কাজ ছিল সেবাশ্রম চালানোর জন্য সকলের কাছ থেকে দান ও ভিক্ষা সংগ্রহ করা।
মর্তলোকের এই অশ্বিনীকুমারদ্বয় সম্বন্ধে মহেন্দ্রনাথ লিখেছেন : “উভয়ে রোগীদের মলমূত্র পরিষ্কার ও নানাপ্রকার সেবা করিতেন। রোগী গতায়ু হইলে একটি মাচার উপর স্থাপন করিয়া নগ্নপদে, প্রচণ্ড রৌদ্রে, উত্তপ্ত পাথরের উপর হোঁচট খাইতে খাইতে নীলধারায় বা গঙ্গায় যেখানে স্রোত থাকিত সেইখানে শবটিকে ভাসাইয়া দিয়া আসিতে। তাহারা কখনও নিজেদের শরীরের দিকে দৃষ্টিপাত করিতেন না। অতি কঠোর সেবার ভার তাহাদের মনে প্রদীপ্ত হইয়াছিল এবং তাহার দ্বারা অনুপ্রাণিত হইয়া অতিমানুষিক কঠোর তপস্যা তাহারা করিতে লাগিলেন। কনখলে অবস্থানকালে পরবর্তী সময়েও দেখিয়াছি অভিমানশূন্য, প্রাধান্যস্পৃহাশূন্য, বিলাসিতার রেখামাত্র বর্জিত, জীর্ণ পরিধান ও ছিন্ন পাদুকাতেই তৃপ্ত হইয়া ইহারা দিনযাপন করিতেছে। প্রথম অবস্থায় যেমন সর্বস্বত্যাগী, সেবাপরায়ণ সাধুভাবশেষ অবস্থাতেও সেইরূপ। এই সেবারূপ তপস্যায় তাহারা সমস্ত মনঃপ্রাণ ঢালিয়া দিয়াছিলেন।”
পুরাতনপন্থী সাধুমহলে মিশনের নবীন কর্মধারা যে সবসময় মনঃপুত হয়নি তারও ইঙ্গিত রয়েছে মহেন্দ্রনাথের অনুধ্যানে। “আজও অনেক সাধু রামকৃষ্ণ মিশনের সাধুদের ‘মশিন সাধু’ বলিয়া অবজ্ঞা করিয়া থাকেন–অর্থাৎ ‘মশিন সাধুরা’ জাতবিচার না করিয়া সাধারণের সেবা করেন।”
শুধু বাইরের সাধু নন, ভিতরের অনেকেরও মনেও যে এই সেবাকাজ সম্পর্কে সন্দেহ ছিল তা স্বামী নিশ্চয়ানন্দ কনখলে থাকার সময়ে বুঝেছিলেন। মহেন্দ্রনাথ এই ঘটনা লিখতে দ্বিধা করেননি বলে আমরা জানতে পারি, এক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি সেইসময় কনখল সেবাশ্রমে গিয়ে বাস করেন। “একদিন এই শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি স্বামী নিশ্চয়ানন্দকে ডিস্পেনসারি ঘরের দিকে লইয়া যাইয়া বলিতে লাগিলেন, ‘এইসব ডাক্তারখানা, হাসপাতাল করে কি ফল আছে? শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, ভগবানলাভ হলে তুমি কি বলবে যে এত ডাক্তারখানা করেছি–হাসপাতাল করেছি? সাধনভজন করে ভগবানলাভ করাই হলো জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। এইরূপ নানা কথায় তিনি উপদেশ দিতে লাগিলেন স্বামী নিশ্চয়ানন্দ কর্মী, সারা জীবনপাত করিয়া অসুস্থদিগের সেবার জন্য কনখলের জঙ্গলের ভিতরে সেবাশ্রম স্থাপিত হয়েছে। এই সকল কথায় তাহার প্রাণে বড় আঘাত লাগিয়াছিল।”
মহেন্দ্রনাথ নীরব থাকলেও অন্য সূত্র থেকে জানা যায় এই শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিটি শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতের স্রষ্টা শ্ৰীম। তার কথায় নিশ্চয়ানন্দ আর অশ্রু-সংবরণ করতে পারেননি, করজোড়ে মাস্টারমশায়কে বলেছিলেন, “দেখুন আমি স্বামীজির গোলাম। সাধন-ভজন কিছুই জানি না। তার কাজ করাই আমার জীবনব্রত।”
নিষ্ক্রিয় ত্যাগ ও বৈরাগ্য সম্বন্ধে বিবেকানন্দ-বিশারদরা গত একশতকে যথেষ্ট আলোচনা করেছেন। কথাপ্রসঙ্গে অবশ্যই ভগবান বুদ্ধের সক্রিয় ত্যাগ ও বৈরাগ্যও উল্লেখ হয়, বিশেষ করে তার বাণী বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায়। মহেন্দ্রনাথের মতে, ভগবান বুদ্ধের পরে স্বামী বিবেকানন্দই দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি এই উদারভাব প্রসারণ করেছেন। বুদ্ধ কমণ্ডলু হস্তে মুণ্ডিত মস্তকে স্থির নেত্রে বলছে, জাতির পুরাতনভাব আমি সম্মান করিব, নিস্তেজভাব, সঙ্কীর্ণভাব, রোরুদ্যমানভাব আমি সমূলে উৎখাত করিব…আজ হইতে আমি জগতের সমস্তভার গ্রহণ করিলাম। মুণ্ডিত মস্তকে, দণ্ড ও কমণ্ডলু হাতে গৈরিকবসনধারী বিবেকানন্দও বলেছেন, “আমি প্রাচীন ভাবকে সম্মান করিব, কিন্তু মুমূর্ষ রোরুদ্যমানভাব, সঙ্কীর্ণভাব,হীনভাব সমূলে উৎখাত করিব–আমি ডালপালা শিকড় পর্যন্ত উপড়াইয়া ফেলিব– নূতন ভারত নূতন জগৎ সৃষ্টি করিব–আজ হইতে আমি সমস্ত জগতের ভার গ্রহণ করিলাম।”
