গুরুর প্রতি স্বামী নিশ্চয়ানন্দের আনুগত্যের আরও কয়েকটি গল্প আজও লোকমুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিশেষ করে বেলুড়ে গোরু নিয়ে আসার গল্প। এই গোরুটি আড়িয়াদহের এক গোয়ালার কাছ থেকে স্বামীজির জন্যে কেনা হয়। এবার শুনুন মহেন্দ্রনাথ দত্তের অনুধ্যান।
“রাওজীর গুরুভক্তি ও কর্মতৎপরতা সম্বন্ধে একটি ঘটনা যাহা আমি শুনিয়াছিতাহার উল্লেখ করিতেছি। একবার কলিকাতার নিকট ‘আড়িয়াদহ’ নিবাসী জনৈক গোয়ালার নিকট স্বামীজির জন্য একটি দুগ্ধবতী গাভী ক্রয় করা হয়। পূজ্যপাদ স্বামাজি–স্বামী নিশ্চয়ানন্দ, স্বামী নির্ভয়ানন্দ (কানাই মহারাজ) ও মঠের অপর জনৈক সাধুকে সেই গরুটি আনিতে পাঠাইয়াছিলেন। গরুটি ক্রয় করিয়া আনিবার কালে তথা হইতে মঠে আসিবার রাস্তায় গঙ্গা অতিক্রম করিতে হয়। তাহারা সকলে গরু ও বাছুরের সহিত নৌকায় উঠিলেন। তখন বর্ষাকাল, মা গঙ্গা ভীষণ বেগবতী। গঙ্গার ধারা একটানায় প্রবলবেগে বহিতেছে। নৌকাটি মাঝ-গঙ্গায় আসিয়াছে, এমন সময় হঠাৎ উহা ভীষণভাবে দুলিতে আরম্ভ করিল। তখন সেই গরুটি ভয়ে জলে ঝাঁপাইয়া পড়িল। এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় সকলেই হায় হায় করিয়া উঠিলেন। স্বামী নিশ্চয়ানন্দ কিন্তু ছাড়িবার পাত্র নহেন। তিনি গুরুবাক্য স্মরণ করিয়া তৎক্ষণাৎ গঙ্গায় ঝাপাইয়া পড়িলেন। ইহাতে সকলে আরও উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিলেন।
“স্বামী নিশ্চয়ানন্দ জল ছিটাইয়া গরুর মুখটি কিনারার দিকে করিয়া দিতে লাগিলেন। তিনি গরুটির সহিত স্রোতে ভাসিয়া চলিলেন। অতঃপর গরুটি লইয়া বহু কষ্টে পূর্বকূল হইতে পশ্চিমকূলে আসিলেন; কিন্তু কিনারায় এত কাদা যে সেখানে গরুটি তোলা বড়ই দুঃসাধ্য। তিনি নিজে অতি কষ্টে উঠিলেন, কিন্তু গরু আর উঠে না। ইহাতে তিনি বিশেষ চিন্তান্বিত হইলেন। সৌভাগ্যক্রমে সে স্থানে কয়েকটি ভাঙা নৌকার কাঠ পড়িয়া আছে দেখিতে পাইয়া তিনি উহা সংগ্রহ করিয়া গরুটির পায়ের নীচে দিয়া অতি কষ্টে উহাকে ডাঙায় উঠাইয়া মঠে লইয়া যাইলেন। মঠে পৌঁছাইতে সকলে তাহাকে নানারূপ তিরস্কার করিতে লাগিলেন।
“স্বামী নিশ্চয়ান গরু লইয়া আসিয়াছেন ক্রমে এই কথা স্বামীজির কাছে পৌঁছাইল। তিনি তাঁহাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। স্বামী নিশ্চয়ানন্দ তথায় উপস্থিত হইলে গরুটির জন্য তিনি মূখের মতো নিজের জীবনটা কেন দিতে গিয়াছিলেন, স্বামীজি এই কথা জিজ্ঞাসা করিলেন। স্বামী নিশ্চয়ানন্দ বলিলেন, মহারাজ, আপনি আমাকে গরু আনতে পাঠিয়েছিলেন, গরুটি ছেড়ে কেমন করে আসি?’ এ কথায় স্বামীজি বিশেষ সন্তুষ্ট হইলেন ও বলিলেন, ঠিক ঠিক! আমি গরু আনতে বলেছি, তুমি কেন তাকে ফেলে আসবে!”
স্বামীজির আকস্মিক এবং অপ্রত্যাশিত দেহত্যাগে স্বামী নিশ্চয়ানন্দ এমন শোকার্ত হলেন যে ৪ঠা জুলাই-এর কয়েকদিনের মধ্যে তিনি মঠ ছেড়ে চলে যাবেন। একদিন বিকেলে স্বামী সারদানন্দ, মহেন্দ্রনাথ দত্ত (স্বামীজির ভাই) ও আরও কয়েকজন মাঠের দিকের রকটিতে বসে আছেন। সবাই শোকার্ত। “স্বামী নিশ্চয়ানন্দ সেখানে আসিয়া বলিলেন, ‘আমি যাঁর সম্পর্কে এখানে এসেছিলুম, তিনি যখন চলে গেছেন–তখন আমি আর এখানে থাকব না। আমি নিশ্চয় চলে যাব। যেখানে মন যায় সেখানে গিয়ে থাকব। স্বামী সারদানন্দ অনেক অনুরোধ করিয়া বুঝাইলেন যে, তিনি সহসা চলিয়া যাইলে লোকে অন্যরকম ভাবিবে। তিনি অনুরোধ করিলেন যেন স্বামী নিশ্চয়ানন্দ অন্তত একমাসকাল মঠে থাকিয়া পরে অন্যত্র গমন করেন।”
আরও এক বিবরণ অনুযায়ী, শোকসন্তপ্ত নিশ্চয়ানন্দকে সারদানন্দ মহারাজ জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “কোনদিকে যেতে ইচ্ছে কর?” নিশ্চয়ানন্দের উত্তর: “যেদিকে দুচোখ যায়।”
একমাস যেদিন পূর্ণ হলো নিশ্চয়ানন্দ ঠিক সেদিনই বেলুড় থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন, স্বামী কল্যাণানন্দের মতন তিনিও আর কখনও সেখানে ফিরে আসেননি, অথচ স্বামীজির নির্দেশিত কাজে জীবনের বাকি বছরগুলো নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মাধুকরী বৃত্তি অবলম্বন করে সন্ন্যাসী নিশ্চয়ানন্দ নানা তীর্থ পর্যটন করলেন, তারপর ১৯০৩-এ কুম্ভমেলার সময় হরিদ্বারে হাজির হলেন। ‘রমতা’ সাধুর মতন ঘুরতে ঘুরতে একদিন এক যুবক সাধুর সঙ্গে পরিচয় হলো৷ মহেন্দ্রনাথ লিখেছেন, “কথাবার্তায় বুঝিতে পারিলেন যে, তিনিও স্বামী বিবেকানন্দর শিষ্য বৎসরাধিক পূর্বে বেলুড় মঠ হইতে আসিয়াছেন এবং কনখলের বাজারের নিকট একটি ভাড়াটিয়া ঘরে ঔষধপথ্যাদি দ্বারা নিরাশ্রয় সাধুগণের সেবায় নিযুক্ত আছেন। উভয়ের উদ্দেশ্য এক হওয়ায় এখন হইতে তাহারা একত্রে বাস করিতে লাগিলেন। যুবকটির নাম কল্যাণানন্দ।”
একজন সুযোগ্য গুরুভাইকে খুঁজে পেয়ে কল্যাণানন্দের মনোবল ও উৎসাহ খুব বেড়ে গেল। এই সময়কার কিছু ইতিহাস কনখল সেবাশ্রমের তখনকার বার্ষিক বিবরণী ও অ্যাকাউন্টসে থেকে গিয়েছে। কনখলের প্রথম রিপোর্ট প্রকাশিত হয় ১৯০৪ সালে, এতে সই করেছেন মঠ মিশনের সভাপতি স্বামী ব্রহ্মানন্দ। অ্যাকাউন্টসে সই করেছেন মঠমিশনের জেনারেল সেক্রেটারি স্বামী সারদানন্দ এবং অডিটর শ্রী বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল। এই বৈকুণ্ঠনাথ ১৮৯০ সালে তপস্যা করার জন্য স্বামীজির সঙ্গে হৃষীকেশে আসেন। সঙ্গে স্বামী তুরীয়ানন্দ ও স্বামী সারদানন্দ। চণ্ডেশ্বর মহাদেবের মন্দিরের কাছে এক কুঁড়েঘরে সাধনায় মগ্ন থাকতে থাকতে স্বামীজি স্বয়ং জ্বরবিকারে আক্রান্ত হন। চিকিৎসকের অভাব, স্বামীজি সংজ্ঞাহীন হলে সঙ্গীরা হায় হায় করতে লাগলেন, সেই সময় এক সাধু এসে মধুসহ পিপুল-চূর্ণ রোগীর জিভে দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে আনেন। এরপর তারা স্বামীজিকে নিয়ে হরিদ্বারে হাজির হন। স্বামী ব্রহ্মানন্দ তখন কনখলে তপস্যা করছিলেন, খবর পেয়ে তিনি হরিদ্বারে হাজির হলেন। স্বামীজি যখন প্রিয় শিষ্য কল্যাণানন্দকে হরিদ্বারে সেবাশ্রম খুলতে নির্দেশ দিয়েছিলেন তখন চণ্ডেশ্বরের স্মৃতি অবশ্যই তার মনে স্পষ্ট ছিল।
