প্রিয় শিষ্য কল্যাণানন্দের অবিশ্বাস্য কাজকর্মের খবর বেলুড়ে স্বামী বিবেকানন্দর কাছে পৌঁছত। গুরুদর্শনের জন্যে কল্যাণানন্দ নিজেও ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। প্রিয় শিষ্যকে সন্ন্যাসে দীক্ষিত করার পরে স্বামীজি বেলুড় থেকে বিদেশে যাবার আগে একবার সমবেত ব্রহ্মচারীদের কাছে বক্তৃতা করেছিলেন। সেই বক্তব্য আজও হৃদয় কাঁপায়। “বহু জনহিতার বহুজনসুখায় সন্ন্যাসীর জন্ম। পরের জন্য প্রাণ দিতে, জীবের গগনভেদী ক্রন্দন নিবারণ করতে, বিধবার অশ্রু মুছাতে, পুত্ৰবিয়োগ-বিধুরার প্রাণে শান্তিদান করতে, অজ্ঞ ইতরসাধারণকে জীবন-সংগ্রামের উপযোগী করতে, শাস্ত্রোপদেশ-বিস্তারের দ্বারা সকলের ঐহিক ও পরমার্থিক মঙ্গল করতে এবং জ্ঞানালোক দিয়ে সকলের মধ্যে প্রসূত ব্রহ্ম-সিংহকে জাগরিত করতে জগতে সন্ন্যাসীর জন্ম হয়েছে।”
শেষ যেবার বেলুড়ে স্বামীজির সঙ্গে কল্যাণানন্দের দেখা হলো তখন তার কয়েকটি কথা ভক্তমহলে মুখে মুখে প্রচারিত হয়েছে। স্বামী অচলানন্দ একদিন দাঁড়িয়ে আছেন তখন তার সামনেই প্রিয় শিষ্যকে স্বামীজি বললেন, “দেখ কল্যাণ, আমার কেমন ইচ্ছা হয় জান? একদিকে ঠাকুরের মন্দির থাকবে, সাধু ব্রহ্মচারীরা তাতে ধ্যান-ধারণা করবে, তারপর যা ধ্যান-ধারণা করলে তা ব্যবহারিক জগতে কাজে লাগাবে।” স্বামী অচলানন্দ পরে বলতেন, “স্বামীজির আসল ভাব ছিল প্র্যাকটিকাল বেদান্ত। শুধু থিওরি নয়, বেদান্তকে কাজে পরিণত করতে হবে। শুধু কথায় বা বিচারে চলবে না।”
স্বামীজি যে কল্যাণানন্দকে আরও কিছু পরামর্শ ও নির্দেশ দিয়েছিলেন তা শিষ্যের পরবর্তী জীবনযাত্রা এবং সর্বগতানন্দের স্মৃতি থেকে স্পষ্ট হচ্ছে। মারাত্মক নির্দেশ: “বাংলাকে ভুলে যা। আর ফিরিস না। এখান থেকে চলে যা।” এই নির্দেশের হেরফের হয়নি, স্বামীজিকে শেষ দেখে শিষ্য সেই যে কনখলের কর্ম ও সাধনাক্ষেত্রে ফিরে গেলেন তারপর পুরো পঁয়ত্রিশ বছর তিনি একবারও বাংলায় ফেরেননি। বেলুড় থেকে বহুবার আমন্ত্রণ এসেছে, কিন্তু তার অনিচ্ছা থেকে যা স্পষ্ট-গুরুর নির্দেশ তিনি মাথা পেতে নিয়ে আর কখনও পিছনে ফিরে তাকাবেন না। বাংলায় না ফেরার এই প্রতিজ্ঞা তিনি মেনে চলেছেন ২০ অক্টোবর ১৯৩৭ ডেরাডুনে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত।
কনখলে কল্যাণানন্দ কী করেছেন তার মনোগ্রাহী ছবি এঁকেছেন স্বামী সর্বগতানন্দ। হিসেবের খাতা ও রোগীর পরিসংখ্যান থেকে কোনো সেবা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা অবশ্যই বিভিন্ন বর্ণনার সুযোগ নেব, কিন্তু তার আগে দীর্ঘ সময় ধরে তার সাধনা ও কর্মের সাথী স্বামী নিশ্চয়ানন্দের কথা একটু বলে নেওয়া যেতে পারে।
.
শিষ্য সুরজ রাওয়ের (১৮৬৫-১৯৩৪) সঙ্গে স্বামীজির প্রথম সাক্ষাৎ ১৯০১ সালে বেলুড়ে। সেদিন মধ্যাহ্ন আহারের পর স্বামীজি বিশ্রাম করছেন এমন সময় খবর গেল একজন মারাঠি যুবক দেখা করতে চান। স্বামীজি বললেন, “এখন তাকে স্নানাহার সেরে নিতে বলল, আমি পরে দেখা করব।” যুবকটি বিনীতভাবে জানালেন, “আমি স্নানাহারের প্রত্যাশী নই। আমি বহুদূর থেকে স্বামীজিকে দর্শন করতে এসেছি। তাঁকে প্রণাম না করে আমি স্নানাহার করব না।” অগত্যা স্বামীজি নেমে এলেন এবং যুবকটি তাঁকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল। “তুমি কী চাও?” স্বামীজি জিজ্ঞেস করলেন। “কিছুই চাই না। শুধু আপনার দাস হতে চাই।” দূরদর্শী স্বামীজি তখনই যুবকটিকে মঠে থাকার অনুমতি দিলেন।
বিবেকানন্দপ্রাণ নিশ্চয়ানন্দ সম্পর্কে কত মজার গল্প যে ছড়িয়ে আছে! গুরুর নির্দেশ মানবার জন্যে যদি প্রাণসংশয় হয় তো হোক।
নিশ্চয়ানন্দ প্রতিদিন নদীর ওপারে বরাহনগরের একটা টিউবওয়েল থেকে স্বামীজির জন্যে বেলুড়ে জল আনতেন। একদিন জলভরা কলসি নিয়ে গঙ্গা পেরিয়ে মঠে প্রবেশ করতে দেখে এক বিদেশিনী ভক্তিমতী বলে উঠলেন, “সোয়ামী আপনি এই জল আনার দায়িত্বটা কোনো কাজের লোককে দিচ্ছেন না কেন?” ভক্ত নিশ্চয়ানন্দ চটে গিয়ে ইংরিজিতে বললেন, “ইউ আর এ ফুলিশ লেডি!” নির্বোধ মহিলা বলায় বিদেশিনী মহিলা অভিমানভরে স্বামীজির কাছে অভিযোগ জানালেন। আমি কি এমন অন্যায় করেছি যে আপনার শিষ্যটি আমাকে এইভাবে ভৎর্সনা করল? স্বামীজি তাকে বোঝালেন, “এটা ভারতবর্ষ। গুরু সেবাকে এখানে প্রধান ধর্মসাধনা মনে করা হয়।” ভুল বুঝতে পেরে বিদেশিনী স্বামীজির পরামর্শে নিশ্চয়ানন্দের কাছে অনুতাপ প্রকাশ করতে যান। নিশ্চয়ানন্দ তখন স্বামী অদ্বৈতানন্দের সঙ্গে বেলুড়ের সজীবাগানে মাটি কোপাতে ব্যস্ততার পরনে কৌপীন ছাড়া কিছু নেই। সরল সাধু পরিস্থিতি এড়ানোর জন্যে জবাব দিলেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ তোমাকে ক্ষমা করেছি। এখন দয়া করে এখান থেকে যাও।”
স্বামীজির অফুরন্ত ভালোবাসা পেয়েছিলেন এই শিষ্য। তিনি একদিন নিশ্চয়ানন্দকে ডেকে বলেছিলেন, “দেখ নিশ্চয়, সাধু হয়ে অপরের গলগ্রহ হওয়া উচিত নয়। কারুর কাছ থেকে অন্ন গ্রহণ করলেই প্রতিদান দিতে হয়। সাধুসমাজ অন্যের অন্ন খেয়ে খেয়ে জড় হয়ে গেছে। সমস্ত দেশটা অপরের উপর নির্ভর করে জড়বৎ হয়ে গিয়েছে। এতে দেশের উন্নতি না হয়ে, অবনতি হয়েছে। তুমি কখনও এমন কাজ করবে না। যদি বড় কিছু কাজ করতে নাও পার–অন্তত এক পয়সায় একটা মাটির কলসি কিনে রাস্তার ধারে বসে তৃষ্ণাতুর পথিকদের জলপান করাবে। নিষ্ক্রিয় হয়ে অপরের অন্ন ধ্বংস করা দূষণীয়।”
