সেবাধর্মের জন্য হরিদ্বারের কাছে কনখলকেই নির্বাচন করেছিলেন স্বামী কল্যাণানন্দ। হিমালয় প্রবেশের প্রথম ধাপ এই হরিদ্বার। মাত্র ১৫ মাইল দূরে পুণ্যতীর্থ হৃষীকেশ। তিন মাইল উত্তরে লছমনঝোলা–অসংখ্য তীর্থযাত্রী ও সাধু এইখানে সারাবছর সমবেত হন।
রামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রমগুলির একের পর এক প্রতিষ্ঠিত হবার সময়সরণী এইরকম : বারাণসী রামকৃষ্ণমিশন সেবাশ্রম ১৯০০। কনখল ১৯০১। বৃন্দাবন ১৯০৭। এলাহাবাদ ১৯১০। সুজাগঞ্জ, মেদিনীপুর ও নারায়ণগঞ্জ ১৯১৫।
১৯০১ সালে জুন মাসে হরিদ্বারে নির্বাণী আখড়ার বারকুঠারি নামক বাড়ির দোতলায় মাসিক তিনটাকা ভাড়ায় দু’খানা ঘর জোগাড় করলেন কল্যাণানন্দ। এই দুইটি ঘরের মধ্যেই অসুস্থ সাধুদের জন্য শয্যা, চিকিৎসালয়, তার নিজের বাসস্থান ইত্যাদি সবকিছুর ব্যবস্থা ছিল। হোমিওপ্যাথি ঔষধের একটি ছোট বাক্স, চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু যন্ত্রপাতিও ইতিমধ্যে সংগ্রহ হয়েছিল। প্রত্যহ সাধুদের কুঠিয়াতে কুঠিয়াতে ঘুরে তিনি পীড়িত বা বৃদ্ধসাধুদের খোঁজ নিতেন এবং ঔষধ পথ্যাদির ব্যবস্থা করে আসতেন। আবার আবশ্যক হলে রুগ্ন সাধুদের নিজের আস্তানায় নিয়ে এসে স্বয়ং সেবা-শুশ্রূষা করতেন, অথচ নিজে সম্পূর্ণ মাধুকরীর ওপর নির্ভর করে শরীরযাত্রা নির্ভর করতেন।
আদিপর্বে কনখলের কাজকর্মের একটি চমৎকার ছবি পাওয়া যাচ্ছে সেবাশ্রমের প্রথম প্রতিবেদন থেকে। সেপ্টেম্বরে অন্তর্বিভাগের ছ’জন রুগীই সাধু, একজনের চিকিৎসা তখনও চলেছে, অন্যেরা বিপদ কাটিয়ে ক্রমশ সুস্থ হচ্ছেন। বহির্বিভাগে রোগীর সংখ্যা ৪৮, এর মধ্যে ৩৬ জন রোগমুক্ত, দশ জনের চিকিৎসা চলেছে আর দু’জন রোগনিরাময়ের আগেই বহির্বিভাগে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। মোট মাসিক খরচা ২৭ টাকা ১৩ আনা ১১২ পাই। অর্থাৎ পাই পয়সার হিসাবও সযত্নে রক্ষিত হচ্ছে। টাকা পয়সা ছাড়াও ভিক্ষা করে দান পাওয়া গিয়েছে আড়াই মণ গম, আধমণ ডাল এবং তিন সের লবণ। খরচটাও জেনে রাখা ভাল :
পথ্য ১২ টাকা ১৫ আনা ১.৫ পাই
ওষুধ ৮ টাকা ১৪ আনা ৪.৫ পাই
ঘরভাড়া ৩ টাকা ০ আনা ৪ পাই
আশ্রম-ব্যয় ১ টাকা ১ আনা ০ পাই
আলো ৩ টাকা ৬ আনা ৬ পাই
বেতন মজুরী ১ টাকা ০ আনা ৬ পাই
ডাকখরচ ০ টাকা ৬ আনা ০ পাই
বিবিধ ১ টাকা ১ আনা ৭.৫ পাই
বলা বাহুল্য এর মধ্যে কল্যাণানন্দের এক আধলা ব্যক্তিগত খরচ নেই, কারণ তিনি মাধুকরী অথবা কোনো ছত্রে গিয়ে খেয়ে আসতেন। ছত্রে গিয়ে ক্ষুধানিবৃত্তি সে যুগেও যে খুব সুখের ছিল না তা আমরা স্বামীজির শেষ সন্ন্যাসী শিষ্য কেদারনাথের (পরে স্বামী অচলানন্দের) অভিজ্ঞতা থেকে জানতে পারি। কনখলে মহানন্দ মিশনের সামনে একসময় কেদারনাথ থাকতেন, তারও ভিক্ষান্নে ক্ষুধানিবৃত্তি। একদিন তিনি দুপুরে ছত্রে ভিক্ষা করতে গিয়েছেন। ছত্রের কুঠারী বললেন, বসে থাকো এখন। সাধুদের ভিক্ষা দিয়ে যদি কিছু বাঁচে তো, কাঙালিদের দেবার সময় পাবে। “অভিমানে চোখ ফাটিয়া জল আসিয়াছিল,…সেদিন ছত্র হইতে ভিক্ষা না লইয়াই তিনি ফিরিয়া আসিয়াছিলেন–প্রায় পাঁচ ছয়দিন আর ছত্রে যান নাই।”
বিবেকানন্দশিষ্য কল্যাণানন্দ কিন্তু কিছুতেই হাসপাতালের খরচে খাবেন না, বহুদিন তিনি এই ভিক্ষাবৃত্তি চালিয়ে গিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তার দুই সহকারী স্বামী জপানন্দ ও ব্রহ্মচারী সুরেনকেও এইভাবে জীবন চালাতে হতো। হাসপাতালের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর ভিক্ষায় বেরুতে বেশ অসুবিধা হয় এই রিপোর্ট বহুবছর পরে স্বামী জপানন্দ বেলুড়ের হেড অফিসে পাঠিয়েছিলেন। স্বামী সারদানন্দ তখন জেনারেল সেক্রেটারি, তিনি একই সঙ্গে সেবা ও মাধুকরীর প্রয়োজন নেই এই নির্দেশ পাঠালেন কনখলে–এতে কল্যাণানন্দ এবং তাঁর সহযোগী স্বামী নিশ্চয়ানন্দ কিন্তু মোটেই খুশি হলেন না। তারা মনে করলেন, ভিক্ষে করার চমৎকার সুযোগ থেকে সাধুরা কেন অকারণে বঞ্চিত হবেন। প্রসঙ্গত বলা যায়, জীবনের শেষপ্রান্তে স্বামীজি সন্ন্যাসীর প্রব্রজ্যা ও ভিক্ষাচর্যা সম্পর্কে মতের সামান্য পরিবর্তন করেছিলেন। একজন সাধুর পক্ষে এদুটি খুবই হিতকর, কিন্তু মাধুকরী বৃত্তি ইত্যাদি তখনই সহজবোধ্য ছিল যখন গৃহস্থগণ… ধর্মশাস্ত্রগণের নির্দেশ সুচারুরূপে অনুশীলন করে প্রতিদিন নিজ নিজ অন্নের একাংশ সাধু-অতিথিদের জন্য ভিন্ন করে রাখত। এখন সমাজে বিপুল পরিবর্তন উপস্থিত হয়েছে। বিশেষ করে বঙ্গদেশে মাধুকরী প্রায় অপ্রচলিত।…অরূপ পরিস্থিতিতে ভিক্ষাবৃত্তি ও মুদ্রাস্পৰ্শত্যাগের ব্রত অবলম্বন করে তোমরা কোন সুফল পাবে না।
এদিকে হৃষীকেশের সাধুদের জন্যেও একটা শাখা সেবাশ্রম খুলে ফেলা হলো। ১৯০২ সালের মার্চ মাসের কিছু খবরাখবর পুরনো রেকর্ডে পাওয়া যাচ্ছে। ওই মাসে বহির্বিভাগে ৭০ জন সাধু এবং অন্তর্বিভাগে ৭ জনের চিকিৎসা হয়। একমাসে ৫ টাকা ১ আনা ৯ পাই খরচ হয় তার মধ্যে পথ্যের খরচ ২ টাকা ১৫ আনা। ভিক্ষা করে দান পাওয়া গিয়েছিল ৫ সের ২ ছটাক চাল, ৯ সের ২ ছটাক ডাল, ১৮ সের ১২ ছটাক গম, ১ সের ৮ ছটাক লবণ। ২ টাকা ৯ আনার দুধও পাওয়া গিয়েছিল। দুটি সেবাশ্রমের মধ্যে দূরত্ব বেশ কমাইল, কিন্তু গাড়ি ভাড়া করে সেবাশ্রমের অর্থব্যয় স্বপ্নেরও অতীত, তাই নিবেদিত প্রাণ সন্ন্যাসীরা সূর্য ওঠার আগেই পায়ে হেঁটে বেরিয়ে পড়তেন। ফিরতেনও পায়ে হেঁটে, তারপর বেরুতে হতো মাধুকরীতে।
