স্বামীজি ঠিক কবে দক্ষিণারঞ্জনকে সন্ন্যাস দিয়ে কল্যাণানন্দ নাম দেন তা স্পষ্ট নয়। দ্বিতীয়বার পশ্চিমে যাবার আগে ১৮৯৯ সালে কোনোসময় ব্যাপারটা ঘটেছিল। স্বামী সর্বগতানন্দ ভ্রমক্রমে সন্ন্যাসের বছরটি ১৯০০ বলে চিহ্নিত করেছেন। বেলুড়ে সন্ন্যাস দিয়ে স্বামীজি বললেন, “কল্যাণ, আমাকে কি গুরুদক্ষিণা দেবে?” কল্যাণের কাছে কিছুই ছিল না, তিনি বললেন, “আমি নিজেকেই আপনার দাসরূপে আপনাকে নিবেদন করছি। আপনি যা আদেশ করবেন আমি তাই করব।”
স্বামীজির দ্বিতীয়বার বিদেশযাত্রার পরে কল্যাণানন্দ তীর্থভ্রমণে বেরিয়ে পড়লেন। সঙ্গে ছিল স্বামী শুদ্ধানন্দের (পরবর্তীকালে মঠের অধ্যক্ষ) একটি পরিচয়পত্র। কাশীতে কল্যাণানন্দের দেখা হলো স্বামীজির আর এক ভক্ত (পরে স্বামী অচলানন্দ) কেদারনাথ মৌলিকের সঙ্গে। এঁর জন্ম শিক্ষা-দীক্ষা সব বারাণসীতে। স্বামী শুদ্ধানন্দের পরিচয়পত্র দেখে কেদারনাথ তাঁকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। নিজের মোক্ষের জন্য জগতের উদ্ধার মন্ত্রটি কল্যাণের কাছে অহর্নিশ শুনে সংসার ত্যাগের জন্য কেদারনাথও অস্থির হয়ে উঠলেন। যামিনী মজুমদারের সঙ্গে মিলে আর্তের সেবায় এঁরা সবাই মেতে উঠলেন।
কাশী থেকে এলাহাবাদ। সেখানেও কল্যাণানন্দের সেবাকার্য। তারপর জয়পুর। রেল স্টেশনে স্বামীজির অপর এক প্রিয় শিষ্য স্বরূপানন্দের সঙ্গে দেখা হলো।
পূর্বাশ্রমে অজয়হরি বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন বহুশাস্ত্রবিদ, স্বামীজির নির্দেশে কিছুদিন সিস্টার নিবেদিতাকে বাংলা শেখান এবং পরবর্তীকালে স্বামীজির রচনাবলী প্রকাশের প্রধান উদ্যোক্তা। স্বরূপানন্দও তীর্থযাত্রায় বেরিয়েছিলেন, কিন্তু খবর এল রাজপুতানার কিষেণগড়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে। সেখানেই ছুটলেন দু’জনে, সেবাকার্যের নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হলো কিষেণগড়ে।
ভিক্ষে করে এঁরা দু’জন প্রতিদিন তিনশ ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন জোগাতেন। যেসব শিশুর বাবা মা দুর্ভিক্ষে দেহরক্ষা করেছেন তাদের জন্যে একটা সাময়িক অনাথ আশ্রমও তাদের ঘাড়ে চাপলো। এই কাজে পরে তাদের সঙ্গী হলেন স্বয়ং কেদারনাথ মৌলিক। পরবর্তী সময়ে স্বরূপানন্দ চলে গেলেন মায়াবতীতে, আরও প্রায় একবছর কল্যাণানন্দ থেকে গেলেন কিষেণগড়ে। অনাথ শিশুদের নিয়ে কল্যাণানন্দ ঘটস্থাপন করে যখন দুর্গাপূজা করেন তখন ৫০টি বালক ও ২০টি বালিকা সেখানে প্রতিপালিত হচ্ছে।
ডিসেম্বর মাসে বেলুড় থেকে চিঠি এল, স্বামী বিবেকানন্দ বিদেশ থেকে ফিরেছেন, “ইচ্ছে করলে স্বামীজিকে তোমরা এখন দর্শন করতে পার।”
বেলুড়মঠে একবার পাঁচ টাকা দিয়ে বরফ আনতে বললেন স্বামীজি। কল্যাণানন্দ হাওড়া স্টেশন থেকে আধমণ বরফ মাথায় করে পায়ে হেঁটে বেলুড়ে ফিরে এলেন। দেখে তো স্বামীজির বিস্ময় কাটে না। এত বরফ তুই মাথায় করে এনেছিস! ভক্তের ভক্তি ও সহ্যশক্তি দেখে স্বামীজি আশীর্বাদ করলেন, “কল্যাণ একদিন তুই পরমহংস হবি।” স্বামীজি জানতেন কীভাবে ভক্তের মনে অনুপ্রেরণার প্রদীপশিখাঁটি জ্বেলে দিতে হয়।
একদিন বেলুড় মঠে কল্যাণকে ডেকে স্বামীজি তাঁর বিশেষ ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। “দেখ কল্যাণ, হৃষীকেশ-হরিদ্বার অঞ্চলের অসুস্থ রুগ্ন সাধুদের জন্যে কিছু করতে পারিস? ওদের দেখবার কেউ নেই। তুই গিয়ে ওদের সেবায় লেগে যা।”
গুরুনিদের্শ শিরোধার্য করে নিলেন কল্যাণানন্দ। স্বামী সর্বগতানন্দের ভাষায়, স্বামীজি নির্দেশ দিলেন, “কিছু পয়সা জোগাড় করে হরিদ্বারে যাও। কিছু জমি কিনে জঙ্গল পরিষ্কার করে নাও। হরিদ্বারে তীর্থযাত্রীরাও বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। আমি যখন ওখানে ছিলাম তখন চিকিৎসার জন্য একশ মাইল দূরে মীরাটে গিয়ে ডাক্তারের সন্ধান পেয়েছিলাম। ওখানে একটা হাসপাতাল আছে, কিন্তু ক’জন আর সেখানে যেতে পারছে? হরিদ্বারেই কিছু একটা খাড়া করো। যদি দেখো কোনো রোগী পথের ধারে পড়ে আছে তাহলে তাকে নিজের কুঠিতে তুলে নিয়ে এস চিকিৎসা করো।”
সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় গুরুনিদের্শ কিভাবে পালন করা যায় তা স্থির করবার জন্যে বন্ধু স্বামী স্বরূপানন্দের সন্ধানে মায়াবতীতে হাজির হলেন কল্যাণানন্দ। স্বামীজির ইচ্ছা শুনে তা বাস্তবায়িত করার জন্যে তিনি তো এক পা বাড়িয়ে আছেন। প্রথম পদক্ষেপ অনতিদূরে নৈনিতালে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা। প্রায় দেড়মাস এইভাবে ভিক্ষা করে সামান্য কিছু অর্থ সংগ্রহ করে কল্যাণের হাতে তুলে দিলেন স্বরূপানন্দ।
১৯০১ সালে জুন মাসে হরিদ্বারের কাছে কনখলে স্বামীজির ইচ্ছাপূরণের জন্য প্রতিষ্ঠিত হলো সেবাশ্রম। এর পরে স্বামী স্বরূপানন্দ মাত্র পাঁচবছর বেঁচেছিলেন। ১৯০৬ সালের ২৭ জুন নৈনিতালে ভক্ত অমরশাহের বাড়িতে স্বরূপানন্দ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। এক শোকলিপিতে সিস্টার নিবেদিতা লেখেন, “পরমাত্মার মিলন-আকাঙ্ক্ষী বরেণ্য সেই আত্মা, আজ তাহার চিরঈপ্সিত ধামে উপনীত। চরম আত্মত্যাগে অর্জিত সেই মৃত্যুর সহসন্ন্যাস নিশ্চয়ই আবার নবজন্মে অভ্যুদয় লাভ করবে–পরিপূর্ণ তেজে, নবীন প্রাণে ও দানে, প্রেমে ও জ্ঞানে–যখনই মর্তের মানুষের জন্য তার আবির্ভাবের প্রয়োজন দেখা দেবে।”
