স্বামী কল্যাণানন্দের অবিশ্বাস্য জীবনকথার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়ার সময় এবার উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু তার আগে কনখলে স্বামী সর্বগতানন্দের প্রথম কয়েকদিনের অভিজ্ঞতার কথা বলে নেওয়া যেতে পারে, এইসব কথা তিরানব্বই বছরের সন্ন্যাসী সুদূর আমেরিকার প্রবাসে বসেও ভুলতে সমর্থ হননি।
“কনখলে পৌঁছবার কদিনের মধ্যেই কল্যাণানন্দজীকে বললাম, হাসপাতালের কাজে আমি সাহায্য করতে চাই। তিনি বললেন, করা তো সহজ, কিন্তু জানাটা সহজ নয়। কি জানতে হবে রে বাবা? আমি ভেবে পাচ্ছি না। ওদের বেশ লোকাভাব, অথচ হাসপাতালে এত কিছু করার রয়েছে। আমি ওদের সাহায্য করতে চাই। হাতগুটিয়ে বসে থাকবার জন্যে আমি তো এখানে আসিনি।”
“এখানে আসবার আগে তুমি কি করতে?” কল্যাণানন্দজী একদিন জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম ব্যাংকিং এবং অ্যাকাউন্টিং-এ যৎকিঞ্চিৎ অভিজ্ঞতা আছে।
“এইটাই তো আমি চাইছিলাম!” ওঁর সহযোগী স্বামী নিশ্চয়ানন্দ কিছুদিন আগে শরীর রেখেছেন। তারপর কয়েকমাস অ্যাকাউন্টিং-এর কিছুই করা হয়নি। এবার এসবের দিকে নজর দাও।” তারপরেই মহারাজের রসিকতা : জীবনকালে চুন-সুরকির ব্যবসা করত এমন একজন লোক স্বর্গে গেলেন। স্বর্গে মানুষটা কি করবে? ওখানে অবশ্যিই চুন-সুরকি বেচবে। তুমিও সাক্ষাৎ স্বর্গে এসেছ, কিন্তু তোমার ভাগ্যেও একই অবস্থা হতে চলেছে।”
মহারাজ কাজের ব্যাপারটা নবাগতকে বোঝাতে বসলেন খুবই গম্ভীরভাবে। তার নির্দেশ, সহযোগী স্বামী নিশ্চয়ানন্দ যেভাবে হিসেব রাখতেন ঠিক সেইভাবে হিসেব রাখতে হবে, একচুল হেরফের চলবে না। মহারাষ্ট্রীয় সন্ন্যাসী সুরজ রাওয়ের (১৮৬৫) সামান্য পরিচয় প্রয়োজন। আপাতত জেনে রাখা ভালো, গুরু স্বামী বিবেকানন্দের দেহাবসানের পরে বেলুড়মঠ ছেড়ে পরিব্রাজকরূপে নানা তীর্থ ঘুরতে ঘুরতে সেনাবিভাগের প্রাক্তন কর্মী স্বামী নিশ্চয়ানন্দ এই কনখলে হাজির হন, তারপর একত্রিশ বছর ধরে গুরুভাই স্বামী কল্যাণানন্দের সঙ্গে এই হাসপাতালে সাক্ষাৎ নারায়ণের বিরামহীন সেবা করেছেন। পদ্মাসনে ধ্যানযোগে তার দেহাবসান ২২ অক্টোবর ১৯৩৪।
“অ্যাকাউন্টসের ব্যাপারে কল্যাণানন্দজী যা বলেছেন তা সত্য, ছ’মাস কিছু হয়নি, কিন্তু হিসেব নিকেশ হাল আমল পর্যন্ত করে ফেলতে সময় লাগল না আমার। মহারাজকে জানালাম, আমি বকেয়া কাজ সেরে ফেলেছি। এবার মহারাজ নির্দেশ দিলেন, বেলুড়মঠে পাঠানোর জন্যে পাকা অ্যাকাউন্ট তৈরি করো। বেলুড়ে পাঠানোর অ্যাকাউন্ট খুবই মজার। মহারাজের অফিস দেওয়ালে একটা ক্যালেন্ডার ঝোলানো থাকত, যে মাসটা শেষ হয়ে গিয়েছে সেই পাতাটা ছিঁড়ে নিয়ে তার পিছনে হিসেবপত্তর লেখা হতো। তারপর ফাঁইনাল ফিগারগুলো বেলুড় মঠের অ্যাকাউন্টিং নিয়মকানুন অনুযায়ী লিখে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। ক্যালেন্ডারের ছেঁড়া পাতাটাই আমাদের অফিস কপি! মহারাজের নীতি, যথাসাধ্য কম দিয়ে যতসম্ভব বেশি কাজ করতে হবে।
“আমি একসময় সুযোগ বুঝে বললাম, ঠিক মতন অ্যাকাউন্টসের জন্যে একটা জার্নাল, লেজার বই এবং কিছু কাগজপত্তর লাগবে। মহারাজ ব্যাপারটা মেনে নিতে পারলেন না, জিজ্ঞেস করলেন, এসব আমাদের দরকার হবে কেন? আমি পঁয়ত্রিশ বছর হাসপাতাল চালিয়েছি এইসব ছাড়াই, এখন তুমি এসে বলছ, এসব ছাড়া কাজ চলবে না।
“মহারাজ এসব থাকলে আমাদের হিসেব-নিকেশের খুঁটিনাটি স্বচ্ছ থাকবে!”কল্যাণানন্দজী এই সময় আমার নজরদারিতে স্থানীয় পোস্টাপিস থেকে কিছু বাড়তি টাকা ফেরত পান, তাতে খুব খুশি হয়ে নতুন হিসাববিশারদের উপযোগিতা তিনি বুঝতে পারলেন এবং খুশি হয়ে অনুমতি দিলেন, যা যা তোমার দরকার তা কিনে নাও।
তরুণ সর্বগতানন্দের চোখ দিয়ে আমরা বিবেকানন্দের সৃষ্টি কল্যাণানন্দজীর অবিশ্বাস্য কাহিনি অনুসরণ করব। এদেশের ইতিহাস কত বিচিত্র মানবপ্রেমী-সাধকের নিঃশব্দ দানে পরিপূর্ণ হয়ে আছে তার কিছুটা আমরা জানতে পারব। বেলুড়মঠে স্বামী বিবেকানন্দর অন্ত্যলীলার শেষ দু’বছরে স্বামীজির দুই সন্ন্যাসী শিষ্যের আদিকথার সামান্য কিছু জেনে রাখলে মন্দ হয় না। আরও কয়েকজন বিবেকানন্দশিষ্যকে বিস্মৃতির অতল গর্ভ থেকে তুলে আনতে হবে। এই পাঁচজন হলেন: কল্যাণানন্দ (পূর্বাশ্রমে দক্ষিণারঞ্জন গুহ), নিশ্চয়ানন্দ (পূর্বাশ্রমে সুরজ রাও), স্বরূপানন্দ (পূর্বাশ্রমে অজয়হরি বন্দ্যোপাধ্যায়), অচলানন্দ (পূর্বাশ্রমে কেদারনাথ মৌলিক) এবং অবশ্যই শুভানন্দ (চারুচন্দ্র দাস)। এঁরা কি পেয়েছিলেন স্বামীজির কাছ থেকে, কোন মন্ত্রে তিনি এমনভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন এঁদের তা শুনলেও বিশ্বাস হয় না।
বরিশাল উজিরপুরের হানুয়াগ্রামের আদর্শপরায়ণ সংসারবিরাগী দক্ষিণারঞ্জন গুহ মহাশয় ২৪ বছর বয়সে (১৮৯৮) বেলুড়ে নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে উপস্থিত হয়েছিলেন। ইতিমধ্যে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল স্কুলে দু’বছর ডাক্তারি পড়েছেন, স্বামীজি স্বয়ং তখন বেলুড়মঠে উপস্থিত।
গ্রাম থেকে আসা সরল যুবকটিকে রসিকতাচ্ছলে স্বামীজি জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, ধর আমার কিছু টাকা দরকার, তার জন্যে যদি তোকে চা-বাগানের কুলী বলে বিক্রি করি–তুই রাজী আছিস তো?” বরিশালের বানারিপাড়া স্কুল থেকে পাশ করা দক্ষিণারঞ্জন এক কথায় রাজী!
