এবার সন্ন্যাসীর কাছ থেকে পথের নিশানা মিলল। “ব্রিজ পেরিয়ে কনখল রোড ধরে এগিয়ে যাও।” . তরুণ ছেলেটি হাঁটতে হাঁটতে নিজের ঠিকানার কাছাকাছি এসে পড়েছে। বড়রাস্তা থেকে একটা ছোটরাস্তা ডানদিকে বেঁকে গিয়েছে। সেখানেই মস্ত এক কম্পাউন্ড দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে। সম্পত্তিটার একটা নয় পাঁচটা গেট। ওইখানেই এসে থমকে দাঁড়ালেন অন্ধ্রের যুবক নারায়ণ।
ভিতরে ঢোকা বেশ শক্ত, কারণ প্রত্যেকটা গেটই বন্ধ, দেখলেই বোঝা যায় নিয়মিত খোলা হয় না। একটা ছোট্ট গেটকে চালু অবস্থায় মনে হলো, সেইটা দিয়েই আগন্তুকের অবশেষে বাঙালি হাসপাতালের প্রাঙ্গণে প্রবেশ। কেউ কোথাও নেই। আরও একটু হেঁটে, একটা বেড়া টপকাতে হলো, কারণ গেট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এবার একটা প্রাঙ্গণ এবং সুন্দর বাড়ি দেখতে পাওয়া গেল। পরবর্তী দৃশ্য: হাফ হাতা শার্ট পরে এক সন্ন্যাসী দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর সঙ্গী বিরাট সাইজের এক কুকুর। কুকুর দেখে রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছে নবাগতের, তবু সাহস ভর করে এগোতে হলো।
অবাক কাণ্ড! সন্ন্যাসী এই ছেলেটিকে বেশ ভালো করে দেখে নিয়ে বললেন, “তুমিই কি নারায়ণ?” “হ্যাঁ, মহারাজ।” সন্ন্যাসী বললেন, কিছুদিন আগে স্বামী অখণ্ডানন্দর চিঠি থেকে জানলাম, তুমি আসছ।”
ইনিই স্বামী কল্যাণানন্দ। “মহারাজ খুব খুশি হলেন, আমাদের মধ্যে কথা হচ্ছে দেখে কুকুরটা ধরে নিল, মহারাজের চেনাজানা লোক আমি, তাই সন্তুষ্ট হয়ে, সব সন্দেহ বিসর্জন দিয়ে সে খুব বন্ধুভাবে গা ঘেঁষে দাঁড়াল এবং ল্যাজ নাড়তে লাগল।”
আগন্তুক তখনও সব খবর দেয়নি। শুধু বলেছে, “আজই হরিদ্বারে পৌঁছনো গেছে।” মহারাজ এবার ব্রহ্মচারী বাসুদেবকে ডেকে বললেন যে বাড়িতে মহারাজ থাকেন সেখানেই একটা থাকার ব্যবস্থা করে দিতে। বাংলায় আরও বললেন, ওর স্নানের ব্যবস্থা, খাওয়া দাওয়া এবং সেই সঙ্গে কিছু জামাকাপড়ও দিতে হবে। তিরানব্বই বছরের সর্বগতানন্দ পরবর্তীকালে তার স্মৃতিকথায় স্মরণ করছেন, ব্রহ্মচারীটি খুবই মধুর স্বভাবের, কথাবার্তা ভারি মিষ্টি। এবার আরও একজন ব্রহ্মচারীর সঙ্গে দেখা হলো, “তাদের আচরণে এমন ভাব যেন আমার সঙ্গে কতদিনের চেনাশোনা।”
নবাগত স্নান সেরে বেরিয়ে এসে দেখলেন একপ্রস্থ পরিষ্কার জামাকাপড় অপেক্ষা করছে, জামাটা এমন ফিট করে গেল যেন ওঁর মাপ নিয়েই তৈরি! এই ব্রহ্মচারীরা বিছানাও তৈরি করে দিল। তারপর যত্ন করে খাওয়াদাওয়া।
এবার মহারাজের কাছে প্রত্যাবর্তন। “আমাকে খুঁটিয়ে দেখে তিনি বললেন, তোমাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে।” আত্মকথার এই পর্যায়ে ছোট্ট একটি ব্র্যাকেটের মধ্যে লেখক সর্বগতানন্দ লিখছেন, “আমার পায়ে খুব কষ্ট, শরীরও এমন অসুস্থ যে পরেরদিনই হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো।”
মহারাজের দয়ার শরীর, এই মন্তব্যটুকু করেছেন সন্ন্যাসী সর্বগতানন্দ, কিন্তু যা উল্লেখ করেননি তা আমাকে অন্য সূত্র থেকে সংগ্রহ করতে হলো। অন্ধ্রপ্রদেশের এই তরুণটি মানুষের সেবা করবার উদ্দেশে স্বামী অখণ্ডানন্দের সঙ্গে দেখা করলে, গঙ্গাধর মহারাজ তাকে দীক্ষা দেন। তারপর একসময় বললেন, “এখান থেকে হাজার মাইল দূরে কনখল, সেখানে মিশনের একটা সেবাশ্রম আছে। সেখানে তোমাকে যেতে হবে, কিন্তু পায়ে হেঁটে, পারবে তো?” এমন কথা তার মুখেই সাজে, খালি পায়ে যিনি এই উপমহাদেশের হাজার হাজার মাইল চষে বেড়িয়েছেন। বাইশ বছরের নারায়ণ পায়ের জুতো খুলে ফেললেন, তারপর (ডিসেম্বর ১৯৩৪) শুরু হলো সুদূর হরিদ্বারের উদ্দেশে পদযাত্রা। নানা তীর্থ অতিক্রম করে হাঁটতে-হাঁটতে কপর্দকহীন নারায়ণ ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখে হরিদ্বারে এসে পৌঁছলেন।
এবার শুনুন লেখকের নিজের মুখেই। “স্বামী কল্যাণানন্দ আমাকে আমার অতীত সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন, জানতে চাইলেন অখণ্ডানন্দজীর সঙ্গে আমার কিভাবে আলাপ হলো? তারপরে মহারাজের চিঠিটা পড়ে শোনালেন, এই ছেলেটিকে তোমার কাছে পাঠাচ্ছি, ওকে দেখাশোনা কোরো। আর কিছু বিবরণ নেই, এমন কি আমি যে সন্ন্যাস নিতে আগ্রহী তারও উল্লেখ নেই। পরে বিবেকানন্দের সাক্ষাৎ শিষ্য একসময় কল্যাণানন্দজী বলেছিলেন, সারাজীবনে কেউ আমার কাছে কাউকে পাঠায়নি যার দায়িত্ব আমাকে নিতে হবে।
“মাত্র কয়েকমাস আগে অখণ্ডানন্দজী মহারাজের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। তিনি জিজ্ঞেস করেছেন, আমি কি হতে চাই? আমি বলেছি, আমি বিবেকানন্দ বাণী ও রচনা পড়েছি, অরবিন্দ ও রমণ মহর্ষি সম্পর্কেও কিছু জেনেছি, মহাত্মা গান্ধির সঙ্গে দেখা করে তার আশ্রয়ে কিছু সমাজসেবাও করেছি। অখণ্ডানন্দজীকে বলেছি, এমন একটা জায়গার সন্ধান করছি যেখানে মানুষের সেবা এবং নিজের সাধনা একই সঙ্গে চলবে। স্বামী অখণ্ডান বললেন, তুমি যেরকমটি চাইছ ঠিক সেইরকম একটা জায়গায় তোমাকে পাঠাব। জায়গাটা তোমার ভালো লাগবে, কারণ ওখানে একজন যোগ্য লোক রয়েছেন। এইভাবেই আমার কনখলে উপস্থিত হওয়া এবং স্বামী কল্যাণানন্দকে খুঁজে পাওয়া স্বামী বিবেকানন্দের সাক্ষাৎ শিষ্যটি এইখানেই তার সেবাকর্ম ও সাধনা একসঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছেন। মানুষটিকে আমার খুব ভালো লেগে গেল, এমন একজন আদর্শ পুরুষকেই তো আমি খুঁজে মরছিলাম।”
