“চারুচন্দ্র ও তাঁহার বন্ধুমণ্ডলী পরম উৎসাহের সহিত বারাণসীর গলিতে গলিতে ঘুরিয়া আর্ত, পীড়িত, অসহায়, কাহাকেও দেখিলে, প্রাণপণ করিয়া নারায়ণজ্ঞানে তাঁহার সেবাদি করিতে আরম্ভ করিলেন।– “অনাথাশ্রম বা Poor Men’s Relief Associationনামে একটি সমিতি এইভাবে ধীরে ধীরে চারুচন্দ্রের নেতৃত্বে গঠিত হইয়া উঠিল। নিজেরা চাঁদা দিয়া এবং ভিক্ষা করিয়া রোগী-নারায়ণদের জন্য ঔষধ-পথ্য ও বিছানা কম্বল এবং হাসপাতালের খরচ ইত্যাদি নির্বাহ করিতেন। কেদারনাথের বাড়ীতেই এই সমিতির কার্যালয় ছিল। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে মাসিক পাঁচ টাকা ভাড়ায় রামপুরায় ডি ৩২৮২ জঙ্গমবাড়িতে একটি ঘরে এবং পরে ক্রমান্বয়ে কার্যের পরিবিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে, ২২৭ দশাশ্বমেধ ঘাটে (১৯০১-এর ১৯শে ফেব্রুয়ারি), ও ডি ৩৮১৫৩ রামপুরায় (১৯০১-এর ২রা জুন) উহা স্থানান্তরিত হয়। অনাথাশ্রম সমিতির কার্যক্রমশঃ শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে সক্ষম হয়। চারুচন্দ্রও সংসারের সংস্রব ধীরে ধীরে ত্যাগ করিয়া অনাথাশ্রমের সেবাকার্যেই সম্পূর্ণ আত্মনিয়োগ করিলেন।…”।
সকলের বিস্ময় স্বামীজির একটি কবিতা থেকে কি করে বিশাল এক সেবাযজ্ঞের সূচনা হতে পারে। নৃত্যকালী দাসী সম্পর্কে আরও কিছু জানা যায় স্বামী অচলানন্দ (পূর্বশ্রমে কেদারনাথ মৌলিক) ও যামিনী মজুদারের জীবনকথা থেকে। “পথের ধারে একটি অনাথা বৃদ্ধাকে মরোণন্মুখ দেখিয়া তাঁহারা নিজেরাই ডুলি করিয়া বহন করিয়া ভেলপুরার হাসপাতালে লইয়া যান। বৃদ্ধার অবস্থা এতই শোচনীয় যে হাসপাতাল তাহাকে ভর্তি করিতে রাজি হইল না, নিরুপায় যুবকগণ পুনরায় ডুলি করিয়া বৃদ্ধাকে চৌকাঘাট হাসপাতালে ভর্তি করিয়া, সেবা-শুশ্রূষার সকল বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন।”
১৯০২ সালে স্বামী বিবেকানন্দ যখন বারাণসীতে এসেছিলেন তখন এই সেবাকর্মের কথা তিনি ভালভাবে জানতেন। একদিন স্বামীজি বললেন, তোমরা কিন্তু তোমাদের কর্মজীবনে দয়াকে উচ্চস্থান নির্দেশ করেছ। মনে রেখো, দয়া প্রদর্শনের অধিকার তোমাদের নেই। যিনি সর্বভূতের ঈশ্বর তিনিই দয়া প্রদর্শনের অধিকারী। যে দয়া করতে চায়, সে নিশ্চই গর্বিত ও অহঙ্কৃত। কারণ সে অপরকে নিজের চেয়ে নীচ ও হীন মনে করে। দয়া নয়–সেবাই তোমাদের জীবনের নীতি হোক।” শেষ পর্যন্ত নাম রাখা হলো রামকৃষ্ণ হোম অফ সার্ভিস। স্বামীজির দেহাবসানের চারমাস পরে (নভেম্বর ১৯০২) সেবাশ্রমের সেবকগণ এই প্রতিষ্ঠানকে রামকৃষ্ণ মিশনের হাতে তুলে দেবার সিদ্ধান্ত নেন।
জীবনের শেষপর্বে অসুস্থ অবস্থায় স্বামীজি তার ভক্তদের বলেছিলেন, “কাশীর কাজই আমার শেষ কাজ।” আরও একটা আশ্চর্য ঘটনা, কাশীতে শ্রীরামকৃষ্ণ অদ্বৈত আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয় স্বামীজির দেহাবসানের দিনেই–৪ঠা জুলাই ১৯০২।
সম্প্রতি ছোট্ট একটি ইংরিজি বই হাতে এসে গেল। বইয়ের নামটা–তুমি একদিন পরমহংস হবে’। লেখক আমার পরিচিত নন। কিন্তু খবর পেলাম, স্বামী সর্বগতানন্দর বয়স ৯৩ (জন্ম ১৯১২), বহুদিন বিদেশে আছেন, আগস্ট ২০০৫-এ বোস্টন, ইউ এস এ নিবাসী। পূর্বাশ্রমে মুসিভিভারমে (অন্ধ্রপ্রদেশে) থাকতেন, ডাকনাম নারায়ণ।
নারায়ণ মহারাজেরও জীবন নাটকীয়, শ্রীরামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের জীবনে বিশেষ আগ্রহী হয়ে তিনি সারগাছিয়া আশ্রমে ঠাকুরের সাক্ষাৎশিষ্য, বিবেকানন্দর গুরুভাই এবং পরবর্তীকালে মঠমিশনের সভাপতি স্বামী অখণ্ডানন্দর সান্নিধ্যে আসেন। এই প্রেমিক পুরুষই প্রথম শিবজ্ঞানে জীবসেবার বাস্তব রূপায়ণের পথিকৃৎ হিসেবে অমর হয়ে আছে। পরিব্রাজক জীবন থেকেই অখণ্ডানন্দ শুরু করেন তার সেবাব্রত। রামকৃষ্ণ মিশনের সূচনা ১ মে ১৮৯৭। ঠিক ১৫ দিন পরে মুর্শিদাবাদের কেদারমাটি– মহুলায় মৃত্যুঞ্জয় ভট্টাচার্যের চণ্ডীমণ্ডপে অনাহারী মানুষকে বাঁচাবার জন্যে স্বামী অখণ্ডান শুরু করেন দুর্ভিক্ষত্রাণ।
সারগাছিতে বসে অখণ্ডানন্দ বলতেন, স্বামী বিবেকানন্দই প্রথম সেবার মাধ্যমে নিজের মুক্তিসাধনা করবার পরামর্শ সন্ন্যাসীদের দিলেন। আগে ধারণা ছিল কাজকর্মের মাধ্যমে ভগবান লাভ করা সম্ভব নয়। ভগবান লাভের জন্য নিবাত-নিষ্কম্প দীপশিখার মত মনকে একাগ্র করে রাখতে হয়। কাজকর্ম করতে গেলে মনের বিক্ষেপ হওয়াই স্বাভাবিক। সেই জন্য সন্ন্যাসীরা আগে কর্মত্যাগ করতেন।
সন্ন্যাসী জীবনের পূর্বাহ্নে স্বামীজি তার গুরুভাই গ্যাঞ্জেসকে লিখেছিলেন, “যে আপনি নরক পর্যন্ত গিয়েও জীবের জন্য কাতর হয়, চেষ্টা করে, সেই রামকৃষ্ণর পুত্র। যে এই মহাসন্ধিক্ষণের সময় কোমর বেঁধে খাড়া হয়ে গ্রামে গ্রামে ঘরে ঘরে তার সন্দেশ বহন করবে সেই আমার ভাই–সেই তাঁর ছেলে। এই পরীক্ষা–যে রামকৃষ্ণের ছেলে সে আপনার ভাল চায় না। প্রাণত্যাগ হলেও পরের কল্যাণাকাঙ্ক্ষী তারা।”
.
বিবেকানন্দের দেহাবসানের অনেক পরে তিরিশের দশকে সারগাছি আশ্রম থেকে সুদূর কনখলে লেখা স্বামী অখণ্ডানন্দের একটা চিঠি থেকেই নারায়ণ মহারাজ ওরফে স্বামী সর্বগতানন্দর স্মৃতিচারণার শুরু।
তারিখটা ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৫, স্থান হরিদ্বার। “বাজারের কাছে এসে যখন আমি জিজ্ঞেস করতে লাগলাম, রামকৃষ্ণ মিশনের স্থানীয় কেন্দ্রটা কোথায় তখন কেউই আমার কথাটা বুঝতে পারছে না। খুঁজতে খুঁজতে শেষ পর্যন্ত গঙ্গা খালের ধারে একটা সুন্দর বাড়ি নজরে এলো, সেখানে সাইনবোর্ড আঁটা ‘ম্যাড্রাসি ধর্মশালা। ভিতরে ঢুকে গিয়ে এক স্বামীকে জিজ্ঞেস করলাম; রামকৃষ্ণ মিশন সেন্টারটা কোথায়? সন্ন্যাসী বলল, ও! তুমি বাঙালি হাসপাতালের কথা জিজ্ঞেস করছ! তাই হবে নিশ্চয়। সন্ন্যাসী জানতে চাইল, কেন আমি ওখানে যেতে চাইছি? আমি বললাম, আমি মিশনে যোগ দিতে এসেছি। আমি কোথা থেকে এসেছি জানতে চাইলেন সন্ন্যাসী, আমি বললাম। সন্ন্যাসী আমাকে নিরুৎসাহ করে বললেন, আমাদের এখানে যোগ দাও। না, আমি রামকৃষ্ণ মিশনে যোগ দেব সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।
