স্বামী সারদানন্দর স্বাক্ষরধন্য মিশনের এই প্রথম রিপোর্টটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব যথেষ্ট। কী পরিবেশে এবং কী কঠিন অবস্থার মধ্যে রামকৃষ্ণ মিশনকে সেইসময় টিকে থাকতে হয়, তা মঠ-মিশনের প্রথম যুগের হিসেবপত্তরগুলি দেখলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাঠক-পাঠিকারা অধৈর্য না হলে প্রথম রিপোের্ট থেকে কিছু উদ্ধৃতি দেওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করা যায়।
গভর্নিং বডি কর্তৃক প্রস্তুত এই ফার্স্ট জেনারেল রিপোর্টে’ অডিটরের নাম শ্রী বি এন সান্যাল, সেক্রেটারি স্বামী সারদানন্দ ও ট্রেজারার স্বামী প্রেমানন্দ। একই প্রতিবেদনে ১৯১০, ১৯১১ ও ১৯১২ সালের হিসেবপত্তর রয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে তখনকার ৩৫জন সন্ন্যাসীর নাম, যাঁদের বলা হয়েছে মনাস্টিক মেমবার্স’। সেই সঙ্গে ৩৫ জন ব্রহ্মচারীর নাম। মঠের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মিশনের ট্রেজারার স্বামী প্রেমানন্দ। স্বামী শিবানন্দ মিশন ভাইস প্রেসিডেন্ট। ট্রাস্টি ১১ জন। এঁদের মধ্যে স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ ও স্বামী বোধানন্দ মার্কিন-নিবাসী। ৩৫ জন ব্রহ্মচারীদের তালিকায় প্রথম নাম ব্রহ্মচারী জ্ঞান ও শেষ নাম পঞ্চানন, যিনি তিনকড়ি নামেও পরিচিত। রিপোর্টে বলা হয়েছে, সংবিধান তৈরির কাজ ১৯০৬ থেকে ঢিমেতালে চলেছিল। ৪মে ১৯০৯ যে মিশন রেজিস্ট্রি হয় তার প্রমোটার বেলুড় মঠের আটজন ট্রাস্টি। মেমোরান্ডাম অনুযায়ী মিশনের তিনটে প্রধান কাজ :
১। মিশনারি কাজ (প্রচার ও সংগঠন)
২। সেবাকর্ম
৩। শিক্ষা
রিপোর্টের একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য, স্বদেশিযুগের অশান্ত রাজনৈতিক আবহাওয়ায় প্রকাশ্যে প্রচার বক্তৃতা ইত্যাদি গত ছ’ সাত বছর বন্ধ ছিল। স্বদেশে সাতটি শাখাপ্রশাখা। বিদেশে নিউ ইয়র্ক, পিটসবার্গ, ক্যালিফোর্নিয়া, বোস্টন, ওয়াশিংটনে ৫টি বেদান্ত সোসাইটি এবং বারাণসীর হোম অফ সার্ভিস, কনখল সেবাশ্রম ও বৃন্দাবন সেবাশ্রম ও ইলাহাবাদ সেবাশ্রমের সেবাকর্মের বিস্তারিত বিবরণও এই রিপোর্টে রয়েছে। বারাণসীতে মাসে পঞ্চাশ জন রোগীর চিকিৎসার খরচ চালানোর জন্যে ৫০০ টাকা ধরা হয়েছে। অর্থাৎ মাথাপিছু মাসিক ১০ টাকা।
কাশী সেবাশ্রমের ১৯০০-১৯১২ সালের বিস্তারিত প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে, বছরে ২৭৭ জন ইনডোর ও আউটডোর রোগী দিয়ে শুরু করে ১৯১১-১২তে ৮৩৪৪ জন রোগীর চিকিৎসা করা হয় সেখানে।
স্বদেশি আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে মিশনের প্রকাশ্য প্রচারকার্য উত্তর ভারতে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলেও দক্ষিণ ভারতে, বিশেষ করে মাদ্রাজে ও বাঙ্গালোরে কাজ অব্যাহত থকে। উত্তর ভারতে বলবার মতন কাজ কেবল কয়েকটি শহরে সদ্য নিউইয়র্ক প্রত্যাগত স্বামী অভেদানন্দের বক্তৃতামালা। রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, পাঁচটি ফান্ড ভোলা রয়েছে জনসাধারণের এককালীন দানের জন্যে। তার মধ্যে পুওর ফান্ড, এডুকেশন ফান্ড ও প্রভিডেন্ড রিলিফ ফান্ড উল্লেখযোগ্য।
১৯১০ সালেও রামকৃষ্ণ মিশনের আর্থিক অবস্থা কী শোচনীয় তার কিছু নমুনা দেওয়া যাক। প্রভিডেন্ট রিলিফ ফান্ডে বছরের বৃহত্তম দাতা (১০) কালীচরণ মিত্র, কলকাতা। চার্টার্ড ব্যাঙ্ক থেকে জুলাই-ডিসেম্বর ১৯০২ সালে প্রাপ্ত সুদ ১৩৪৫ টাকা ১১ আনা, ১৭ টাকা ১৩ আনা ৫ পাই। খরচখরচা বাদ দিয়ে বছরের শেষে ব্যালেন্স ১৩০৯ টাকা ৬ আনা। পরের বছর (১৯১১) সবচেয়ে বেশি দান করেছেন সিন্ধুপ্রদেশের (এখন পাকিস্তান) পি কে মেথুমল, পরিমাণ ৩০ টাকা। বোম্বাইয়ের পি ডি ব্রহ্ম দিয়েছেন ৫ টাকা। ত্রিলোচন ভট্টাচার্য দিয়েছেন ৫ আনা। বছরের শেষে ব্যালেন্স ১৪৯৯ টাকা ৫ আনা ১১ পাই।
পরের বছর ভাগলপুর প্লেগ রিলিফ কর্মীদের যাতায়াত বাবদ খরচ ৮ টাকা ১১ আনা ৬ পয়সা। বছরের শেষে হাতে টাকার পরিমাণ ১৫০৮ টাকা ১২ আনা ৫ পাই।
পুওর ফান্ড ১৯১০ ব্যালেন্স ৬০ টাকা ১৩ আনা ৯ পাই। বৃহত্তম দাতা টুটুচেরার ছোট্ট গোয়ালা (২১ টাকা)। জনৈক বৈকুণ্ঠনাথ দাসকে আর্থিক সাহায্য ৫ টাকা ১ আনা, একজন মহিলা সাহায্য পেয়েছেন ১ আনা। আর একজন মহিলা পেয়েছেন ৪ আনা।
রামকৃষ্ণ মিশনের মুদ্রিত জেনারেল অ্যাকাউন্টের হিসেব রয়েছে ১৯০৭ সাল থেকে। জমার পরিমাণ ৪৬৯ টাকা, খরচ ২৯৫ টাকা ১ আনা ৯ পাই। রামকৃষ্ণ মিশন নিয়মাবলী ছাপানোর কাগজ ও মুদ্রণ বাবদ ব্যয় ৬৫ টাকা ১ আনা।
প্রথম জেনারেল মিটিংয়ে জলখাবার বাবদ ব্যয় ১৪ টাকা ১ আনা ৬ পাই। রানিগঞ্জ পর্যন্ত জনৈক কুষ্ঠরোগীর ট্রেন ভাড়া বাবদ খরচ ১টাকা ৮ আনা ৩ পাই। গাড়িভাড়া বাবদ খরচা ৭ আনা। ১০০০ পোস্টকার্ড ছাপানোর জন্য খরচ ২ টাকা। রামকৃষ্ণপুরের ডাক্তার রামলাল ঘোষ দিয়েছে ১০৫ টাকা। কলকাতার কুমার কে নন্দী দিয়েছেন ১০৫ টাকা। ডায়মন্ড হারবারের শেখ মতিউদ্দীন দিয়েছেন ৫ টাকা।
১৯১০ থেকে ঝাঁপ দিয়ে এবার মার্চ ২০০৯-এ পৌঁছনো যাক। বেলুড় হেড কোয়ার্টার নিয়ে মঠ ও মিশনের তখন ১৭২টি কেন্দ্র। তারমধ্যে ভারতে ১২৯টি, বাংলাদেশে ১২টি, আমেরিকায় ১৩টি এবং অন্যান্য দেশে ১৮টি। মঠ-মিশনের অধীনে ১৫টি হাসপাতাল, শয্যাসংখ্যা ২২৪৯, ইনডোর রোগীর সংখ্যা ৯৯,৩৯২, আউটডোরে প্রায় ৩০ লক্ষ। ডিসেপেন্সারি ও চলমান মেডিক্যাল ইউনিটে রোগীর সংখ্যা প্রায় ৫০ লক্ষ। শিক্ষাকর্মে প্রায় বিপ্লব। ২৩২০টি শিক্ষাকেন্দ্রে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ৪৮৪,৬৪৬। এছাড়া ৩টি বৃদ্ধাশ্রম ও ৭টি নার্সিং শিক্ষণ কেন্দ্র, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসা গবেষণা কেন্দ্র ২টি। ত্রাণকাজের পরিমাণও বিশাল। ১৬৩৬টি গ্রামে ১০ লক্ষ দুর্গতের সেবায় ত্রাণের আর্থিক পরিমাণ ৬ কোটি টাকার ওপর।
