২০০৯ সালের হিসেব অডিট করেছেন প্রখ্যাত রে অ্যান্ড রে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। বিশাল এই প্রতিষ্ঠান, যার অধীনে শত শত শিক্ষা ও সেবাকেন্দ্র, কিন্তু সবরকম দানের পরিমাণ মাত্র ৩৩ কোটি টাকা। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে শিক্ষা, সেবা ও ব্ৰাণে সরকারি অনুদান–৯২ কোটি টাকা। যাঁদের ধারণা কোটি-কোটি ভক্তের উদার দানে রামকৃষ্ণ মিশন আর্থিক সমৃদ্ধির জোয়ারে ভাসছে, তারা জানলে কষ্ট পাবেন কয়েক বছর আগেও (১৯৯৫) দানের পরিমাণ ছিল মাত্র ৮ কোটি টাকা। ওই বছরেশত শত মিশন প্রোজেক্টে সরকারি সাহায্যর পরিমাণ ছিল ২৩ কোটি টাকা।
কোটি টাকার হিসেব দেখেও যাঁরা হতাশ হচ্ছেন, তাঁরা জানুন, ১৯৪০ সালেও মিশনে আসমুদ্র হিমাচলের জনসাধারণের ডোনশনের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৩ লাখ টাকা। সে বছরে সরকারি অনুদানের পরিমাণ ছিল মাত্র ১০ লাখ টাকা। ১৯৫৮ সালেও জনসাধারণের ডোনেশনের পরিমাণ ৩৫ লক্ষ টাকা স্পর্শ করেনি, অথচ তখনই ভারতের কোথায় না মঠমিশনের কাজ চলেছে? ১৯৮০ সালেও জেনারেল ডোনেশনের পরিমাণ মাত্র ২৯ লক্ষ টাকা। এত অল্প অর্থে কী করে সন্ন্যাসীরা এত বৃহৎ সব কাজ করেছিলেন তা ভাবলে অবাক লাগে।
১৯২৬ সালে বেলুড় মঠে মঠ ও মিশনের যে ঐতিহাসিক কনভেনশন হয়েছিল, তা এক স্মরণীয় ব্যাপার। এই বিরাট কর্মযজ্ঞের হিসেবটাও দেখা যেতে পারে। মোট ডোনেশন প্রাপ্তি ৬০৮৭ টাকা ৬ আনা ৬ পাই খরচ : খাওয়াদাওয়া ২৬৪১ টাকা ১৪ আনা ৩ পাই, প্যান্ডাল ১১৫ টাকা ১২ আনা ৯ পাই, কনভেনশন রিপোর্ট মুদ্রণ ১৮৬৩ টাকা ২ আনা। এই রিপোর্ট সই করেছেন তৎকালীন সেক্রেটারি স্বামী শুদ্ধানন্দ।
নিজের মুক্তির কথা না ভেবে রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠাতা বহুজনের হিত ও মঙ্গলের কথা ভেবেছিলেন কপর্দকহীন অবস্থায়। সামান্য যা কিছু সম্বল ছিল, তাও দুঃস্থ মানুষের সেবায় ও পূজায় বিক্রি করে দিতে কোনও দ্বিধা ছিল না তার মধ্যে। তার অকাল তিরোভাবের পরেও কিন্তু কাজের গতি স্তব্ধ হয়নি। ১৯১০ সালে ৩৫ জন সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী যার কেন্দ্রবিন্দুতে, তা ঈশ্বরের আশীর্বাদে বাড়তে বাড়তে ২০০৮ সালে ১৫০০ সন্ন্যাসীতে পরিণত হয়েছে। নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারীদের সংখ্যা আরও ৫০০ জন। এত কম অর্থে এত বড় বড় কাজ কী করে তারা করে চলেছেন, তা ভাবতে বিস্ময় লাগে।
অন্যান্য আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় রামকৃষ্ণ মিশন কত ক্ষুদ্র ও দরিদ্র তার একটা তুলনামূলক আলোচনা সম্ভব হলে মন্দ হত না। হাতের গোড়ায় ছোট্ট মার্কিন প্রতিষ্ঠান বিলি গ্রাহাম ইভানজেলিস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের কিছু হিসেবপত্তর পাওয়া গেল। এই প্রতিষ্ঠান নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁদের হিসেবপত্র প্রকাশ করে থাকেন। বলাবাহুল্য এঁদের ব্যাপ্তি ও কর্মপরিধি মঠ-মিশনের এক শতাংশও নয়। সময় ২০০৬ সাল। ওই বছরে ওঁদের মোট উপার্জন সাড়ে বার কোটি মার্কিন ডলার, অর্থাৎ টাকার হিসেবে অন্তত ৬০০ কোটি। এঁদের সম্পদের পরিমাণ ওই বছরে ২০ কোটি ডলার, অর্থাৎ ৯০০ কোটি টাকা। বিলি গ্রাহামের এই তরুণ প্রচার সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠা ১৯৫০ সালে, এঁরা ছোট্ট পরিধিতে নিজেদের আধ্যাত্মিক প্রচার চালান। এঁদের হিসেবের স্বচ্ছতা আছে, তাই জানা যায় এঁদের প্রধান উইলিয়াম ফ্রাংকলিন গ্রাহাম (তৃতীয়) বছরে পারিশ্রমিক নেন ৫ লাখ ডলার অর্থাৎ প্রায় আড়াই কোটি টাকা। চেয়ারম্যান বিলি গ্রাহাম নেন ৪ লাখ ডলার অর্থাৎ পৌনে দুকোটি টাকা।
পোপের ভ্যাটিকান শহরের খরচাপাতি অনেকদিন প্রকাশিত হত না। পোপ জন পল দ্বিতীয় হিসাবপত্রে স্বচ্ছতা আনার প্রতিশ্রুতি দেন। সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভ্যাটিকানের বাড়ি-ঘরদোর সম্পত্তির পরিমাণ নাকি ৭০ কোটি ইউরো, অর্থাৎ সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। ২০০৩ সালে আয়ের পরিমাণ ২৫ কোটি ডলার, ব্যয় ২৬ কোটি ডলার। এর মধ্যে অবশ্য সুবিশাল মিউজিয়াম, ডাকটিকিট ইত্যাদির রোজগার ধরা হয়নি। ভ্যাটিকানের সম্পত্তির মূল্যায়ন প্রায় অসম্ভব। হিসেবে ওঁদের বিশাল বিশাল ভজনালয়গুলির মোট দাম ধরা হয়েছে মাত্র এক ইউরো।
এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর এক প্রতিষ্ঠানের এই ধরনের তুলনার মানে হয় না। যা বলার চেষ্টা করছি, লক্ষ-লক্ষ মানুষের ভক্তিশ্রদ্ধা পেয়েও, লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী ও রোগীর সেবাকর্মের দায়িত্ব নিয়েও এবং ত্রাণকার্যের জন্য সদা ব্যগ্র থেকেও রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন প্রকৃত অর্থে দরিদ্র থেকে গিয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা স্বামী বিবেকানন্দ বোধহয় এরকমই চেয়েছিলেন। আজীবন তাঁর অবিচলিত আস্থা ছিল, কোনও ভাল কাজই টাকার জন্যে আটকে থাকবে না। সেইসঙ্গে পরবর্তী সঙ্ঘপরিচালকদেরও অবিচলিত প্রত্যাশা, দরিদ্র দেশের দরিদ্র মানুষরা সঙ্ঘের কাজ ঠিক চালিয়ে দেবেন। স্বামী বিবেকানন্দের বিশ্বাস ছিল যে, ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের আশীর্বাদধন্য এই প্রতিষ্ঠানে অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটবে এবং বারবার অসম্ভব সম্ভব হবে!
০৮. গুরুর রামকৃষ্ণনমিক্স এবং শিষ্যের বিবেকানন্দনমি্ক্স
“হিসেবের অভাবে আমি যেন জোচ্চর না বনি”–উদ্বিগ্ন স্বামী বিবেকানন্দ একবার প্রিয়জনদের বলেছিলেন।
তার গুরু শ্রীরামকৃষ্ণেরও অর্থ নিয়ে কোনও ঢাকঢাক গুড়গুড় নেই, যখন মুখে যা এসেছে তা কারও তোয়াক্কা না করে বলেছেন। খোদ কথামৃতেই তিনি অর্থ-বিষয়ে সাঁইত্রিশবার মুখ খুলেছেন। ঠাকুর যখন বলছেন টাকা মাটি মাটি টাকা তাও সত্যি, আবার যখন বলছেন টাকা হচ্ছে গৃহস্থের রক্ত, টাকার সম্মান না থাকলে গৃহস্থ বিপন্ন, তাও সত্য। প্রেমের এই দেবতাকে আরও কঠিন কথা নিষ্ঠুরভাবে মুখে আনতে হয়েছে। তিনি বলেছেন, “অর্থ যার দাস, সেই মানুষ। যারা অর্থের ব্যবহার জানে না, তারা মানুষ হয়ে মানুষ নয়।” এরপর আরও কঠিন কথা : “আকৃতি মানুষের কিন্তু পশুর ব্যবহার।”
