কলকাতা হাইকোর্টের এই রায়ের তারিখ ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯০১। এই রায়ের দু’ সপ্তাহ আগে হাওড়া কোর্টে স্বামীজি মঠের দেবোত্তর দলিল রেজিস্ট্রি করেন (৮ ফেব্রুয়ারি ১৯০১) এবং চারদিন পরে বেলুড়ে স্বামীজির উপস্থিতিতে মঠের প্রথম সাধারণ অধিবেশন হয় ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯০১। ট্রাস্ট ডিড পড়া হয় সভায়, সভাপতি স্বামী অদ্বৈতানন্দ। ১১ জন ট্রাস্টির মধ্যে ৮ জন উপস্থিত ছিলেন, তাঁরাই ভোটে সভাপতি নির্বাচন করেন। সভাপতি পদের ভোটে স্বামী ব্রহ্মানন্দের পক্ষে ৫ ও বিপক্ষে ৩ ভোট, স্বামী সারদানন্দের পক্ষে ১ ও বিপক্ষে ৭ এবং স্বামী রামকৃষ্ণানন্দের পক্ষে ২ ও বিপক্ষে ৬ ভোট পড়ে। মনে হয়, স্বামীজি চেয়েছিলেন ভোটাভুটি হোক। কারণ প্রেসিডেন্ট পদে পরাভূত হয়েও স্বামী সারদানন্দ সর্বসম্মতিক্রমে সেক্রেটারি হন।
হিসেবের ব্যাপারে সন্ন্যাসীদের প্রথম থেকেই প্রবল সাবধানতা। শ্রীরামকৃষ্ণ জন্মোৎসব ফান্ড ও স্বামীজির জন্মোৎসব ফান্ড আলাদা। এ বিষয়ে স্বামীজির কঠোর নির্দেশ, “যদি তোমাকে অনাহারে মরতেও হয়, তবু অন্য বাবদের টাকা থেকে এক পয়সাও খরচ করবে না।”
৪ঠা জুলাই ১৯০২ স্বামীজির অকালপ্রয়াণ যেন বিনামেঘে বজ্রপাত। এই কঠিন অবস্থা থেকে সঙ্ঘকে টেনে তুলে রাখা এবং বিশ্বময় ছড়িয়ে দেবার প্রধান কৃতিত্ব স্বামী ব্রহ্মানন্দ ও স্বামী সারদানন্দের। দূরদর্শী বিবেকানন্দ তার অবর্তমানে সঙ্ঘকে প্রাণময় রাখবার জন্য যেসব নিয়ম নির্দেশ করে গিয়েছিলেন, তা অক্ষরে-অক্ষরে পালন করার দুর্লভ কৃতিত্বও তাদের।
স্বামী নিখিলানন্দ পরবর্তীকালে জানিয়েছেন, স্বামীজির দেহত্যাগের পরে বেলুড় মঠের সন্ন্যাসীরা স্বাভাবিকভাবে ভগ্নোদ্যোম হন এবং তাদের অনেকে কর্মত্যাগ করে নিভৃত জীবনযাপন করতে ইচ্ছা করেন। স্বামী সারদানন্দ তখন সন্ন্যাসীদের এক সভা আহ্বান করে শ্রীরামকৃষ্ণ-সঙ্ঘের গুরুদায়িত্বের কথা বিবৃত করেন এবং স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই বিশাল দায়িত্ব বহন করে চলতে হবে সকলকে? তিনি প্রশ্ন করেন, তিনি স্বামীজির মনোনীত সেক্রেটারি, তাকে সাহায্য করতে কে কে ইচ্ছুক আছেন? এবং কে কে তপস্যায় জীবন কাটাতে পছন্দ করেন? তিনি স্বয়ং পাঁচ বছর সঙ্ঘের কাজ করবেন বলে এগিয়ে আসেন। মাত্র একজন ব্যতীত অপর সন্ন্যসীরা সকলেই তার সঙ্গে সহযোগিতা করতে সম্মত হন।
সঙ্ঘের পরিচালকরা দানের অর্থ সম্বন্ধে কি রকম সাবধানী ছিলেন, তার একটি উদাহরণ দিয়েছেন স্বামী নিখিলানন্দ। স্বামী সারদানন্দ সিগারেট খেতেন এবং ছাই ফেলতেন একটা সিগারেট টিনের কৌটোয়। একবার এক ধনী ভক্ত সারদানন্দকে কিছু উপহার দিতে চান। নিখিলানন্দ একটা কাঁচের ছাইদানি প্রস্তাব করেন যার দাম আট আনা। ভক্তের পয়সায় নিখিলানন্দ জিনিসটি কিনে তার বিছানার পাশে রেখে দেন।
“প্রাতঃকালে ওইটি দেখে কে দাম দিয়েছে জিজ্ঞাসা করেন। আমি ভক্তটির নাম বলি। তিনি বিরক্ত হন এবং গৃহস্থদের এইভাবে টাকা খরচ না করানোর বিষয়ে সাবধান করে দেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, আমরা সন্ন্যাসী এবং আমাদের উচিত সাধারণ জিনিসেই সন্তুষ্ট থাকা। তিনি বললেন আমি যেন ছাইদানি ফিরিয়ে দিয়ে পয়সা ফেরত আনি। আর যদি তা সম্ভব না হয় তবে ওই পয়সায় কাপড় কাঁচার জন্য সাধারণ সাবান কিনে আনি।”
অর্থের ব্যাপারে পরবর্তীকালের সঙ্ঘপ্রধানরাও অনেকে একই রকম সাবধানী ছিলেন। সাম্প্রতিককালে আর এক সঙ্ঘপ্রধান স্বামী ভূতেশানন্দ ধনী বংশের ছেলে, কিন্তু তিনি একটি ব্লেড়ে একমাস দাড়ি কামাতেন। একই রকমে গল্প আছে প্রয়াত সঙ্ঘসভাপতি স্বামী গহনানন্দ সম্পর্কে।
আর্থিক ডিসিপ্লিন কতই কঠোর ছিল, তার অবিশ্বাস্য নিদর্শন মেলে বারাণসীর দুটি পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান সেবাশ্রম ও অদ্বৈতাশ্রমে। সেবাশ্রমে যাঁরা কর্মী, তারা হাসপাতাল থেকে খাবার পাবেন। কিন্তু অদ্বৈতাশ্রম সাধনার স্থান, সেখানে যাঁরা তপস্যা করতে আসবেন, তাঁরা ভিক্ষা করে খাবেন, এই নিয়ম চালু ছিল। দারুণ অর্থাভাবে স্বামী শিবানন্দ এক সময়ে কাশীর গৃহস্থদের বাড়িতে বাড়িতে ভিক্ষা করেছেন।
স্বামী ব্রহ্মানন্দ সমস্ত জীবনকাল সঙ্ঘসভাপতি ছিলেন কথাটি যে সম্পূর্ণ সত্য নয়, তা সরলাবালা সরকার এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন। “একবার কোন কারণে যথারীতি ‘প্রেসিডেন্ট নির্বাচন না হওয়াতে বয়োজ্যেষ্ঠ সাধু স্বামী অদ্বৈতানন্দ বিনাভোটেই প্রেসিডেন্ট হন ১৯০৯ সালে।” ওই বছর ২৮ নভেম্বর স্বামী অদ্বৈতানন্দ দেহত্যাগ করলে ব্রহ্মানন্দ আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তাঁর মতো নেতা না থাকলে হয়তো সেই সময় মিশনের অস্তিত্ব বিপন্ন হত।”
শ্রীমতী সরলাবালা সরকার জানিয়েছেন, একসময় মঠের লোকসংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু আহার্য কমছে। “ব্রহ্মচারী ছেলেরা সকালে মুড়ি জলখাবার পাইত, কিন্তু সেই মুড়ি এত শীঘ্র ফুরাইয়া যাইত যে, ঘণ্টার শব্দ আসিতে আসিতে অনেকের ভাগ্যে মুড়ি জুটিত না। স্বামী ব্রহ্মানন্দের আদেশ ছিল, তাঁহার ঘরে যাহা কিছু থাকিবে, যদি কেহ খাইতে না পাইয়া থাকে, সে যেন আসিয়া সেই জলখাবার লইয়া যায়।”
১৮৯৭ সালে রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠা। স্বামীজি চাইতেন প্রতি বছর মিশনের সভা হবে এবং হিসেবপত্র প্রকাশ করা হবে। কিন্তু প্রথম কয়েক বছরের ছাপানো রিপোর্ট ও অ্যাকাউন্টস আমাদের নজরে আসেনি। প্রথম বাৎসরিক জেনারেল রিপোর্টের তারিখ বেশ কয়েক বছর পরে। ১৯০৯. সালে রামকৃষ্ণ মিশন সরকারি আইন অনুযায়ী রেজিস্ট্রি করা হয়।
