যে কাজের জন্যে যে-টাকা, তা অন্য খাতে খরচ করা রামকৃষ্ণ মিশনে নিষিদ্ধ সেই শুরু থেকেই। ত্রাণ কার্যের জন্য ভোলা টাকা সম্বন্ধে স্বামীজির স্পষ্ট নির্দেশ, “Famine ফান্ডে যে টাকা বাঁচিয়াছে, তাহা একটি পার্মানেন্ট ওয়ার্ক ফান্ড করিয়া রাখিয়া দিবে, অন্য কোন বিষয়ে তাহা খরচ করিবে এবং সমস্ত ফেমিন ওয়ার্কের হিসাব দেখাইয়া লিখিবে যে, বাকি এত আছে অন্য good work-এর জন্য।”
মঠের জন্য জমি সংগ্রহ করলেই শুধু চলবে না, মঠ পরিচালনার জন্যও যে অর্থের প্রয়োজন, তা স্বামীজি কখনও ভোলেননি। এ বিষয়ে তার প্রধান ভরসাস্থল বিদেশিনীরা। স্বামীজির একান্ত অনুগত গুডউইনের একটি চিঠি থেকে (২০ নভেম্বর ১৮৯৬) ব্যাপারটা স্পষ্ট হচ্ছে। মিসেস বুলকে লেখা চিঠির বক্তব্য : ”মঠের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মিস মুলার বছরে ২০০ পাউন্ড দেবেন, মিস সাউটার ১০০০ পাউন্ড দিচ্ছেন, মিস্টার স্টার্ডি ৫০০ পাউন্ড এবং স্বামীজি নিজে ২০০ পাউন্ড।” আরও কিছু অর্থের জন্য অনুগত গুডউইন লিখছেন স্বামীজির বান্ধবী মিস জোসেফিন ম্যাকলাউডের কাছে।
নীলাম্বরবাবুর বাগানে সংসারত্যাগীরা বোধহয় ছিলেন দু’ভাগে বিভক্ত। স্বামীজির নাকি ইচ্ছা ছিল, মঠে দু’রকমের সাধু থাকবে–নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী ও সন্ন্যাসী। প্রথম দলের নৈষ্টিক ব্রহ্মচারীরা আজীবন নিষ্ঠাবান ব্রহ্মচারী থাকবে। তারা দাড়ি গোঁফ রাখবে ও আত্মপাকী হবে। নতুন ব্রহ্মচারী এলে স্বামীজি বেলুড়ের কাছাকাছি জায়গায় তাদের ভিক্ষে করতে পাঠাতেন। যা পাওয়া যেত তাই নিজে রান্না করে ঠাকুরকে ভোগ দিতে হত। অর্থাৎ কঠোর কঠিন জীবন থেকে পালিয়ে আসবার পথ নেই নবীন সন্ন্যাসীর।
আলমবাজারের নিয়মাবলীর সঙ্গে নীলাম্বরবাবুর বাগানে বসে স্বামীজি যে নিয়মাবলী রচনা করেন, তা একত্র করে গড়ে ওঠে ‘বেলুড়মঠের নিয়মাবলী। এখানেই স্পষ্ট যে জ্ঞান, ভক্তি, যোগ ও কর্মের সমন্বয়ে গড়ে উঠবে মঠবাসীদের চরিত্র। কিন্তু সব ভাল কাজের জন্যই যে প্রয়োজন অর্থের।
এক সময় নিয়মিত অর্থ বলতে খেতড়িরাজার মাসিক একশো টাকা। দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন ফান্ড থেকে টাকা ধার করে স্বামী ব্রহ্মানন্দ কোনওরকমে খরচ চালাচ্ছেন।
“অর্থাভাবই হচ্ছে প্রধান অসুবিধা, স্বামীজি নিজেই লিখেছিলেন মিস ম্যাকলাউডকে এক চিঠিতে। কিন্তু একই সঙ্গে স্বামীজির প্রধান চিন্তা ‘হিসে”। স্বামী ব্রহ্মানন্দকে লন্ডন থেকে তিনি লিখছেন (১০ আগস্ট ১৮৯৯), “লোকে টাকা দিলেই একদিন না একদিন হিসেব চায়, এই দস্তুর। প্রতিপদে সেটি তৈয়ার না থাকা বড়ই অন্যায়।”
স্বামীজির ম্যানেজমেন্ট চিন্তার মূল কথা দুটি : “যতদূর সম্ভব অল্পখরচে যত বেশি সম্ভব স্থায়ী সৎকার্যের প্রতিষ্ঠা” এবং ত্রাণকার্যের আর্থিক হিসেব শুধু দিলেই চলবে না, তা পাবলিশ করতে হবে। প্রকাশ করবার এই নীতি নৈষ্ঠিকভাবে এখনও রামকৃষ্ণ মঠ-মিশনে মেনে চলা হচ্ছে। সেই সঙ্গে হিসাব বহির্ভূত টাকা সম্বন্ধে স্থির নীতি। যিনি টাকা দিচ্ছেন তার নাম-ঠিকানা চাই। রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠান প্ল্যাটিনাম জুবিলির শেষ সভায় (২৭ জুলাই ২০০৮) মঠের জেনারেল সেক্রেটারি স্বামী প্রভানন্দ প্রকাশ্যে বললেন, এক সময় যখন প্রচণ্ড অর্থাভাব, যখন সেবাপ্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মাইনে দেবার অবস্থা নেই, তখন এক ভদ্রলোক ব্যাগে করে প্রচুর নগদ টাকা নিয়ে এলেন, কিন্তু বললেন তার নাম-ঠিকানা দেওয়া যাবে না। তরুণ সন্ন্যাসী প্রভানন্দ সেই দান নিলেন না, পরে সেক্রেটারি (স্বামী গহনানন্দ) ফিরে এলে সভয়ে তাকে ব্যাপারটা বললেন। স্বামী গহনানন্দ পরবর্তীকালে মঠের প্রেসিডেন্ট। তরুণ সন্ন্যাসীকে তিনি বললেন, “ঠিক কাজই করেছ। নীতিভ্রষ্ট হয়ে বড় কাজ করা যায় না। তাতে আমাদের অভাব না ঘুচলে কী করা যাবে?”
স্বামীজির জীবনকালে নিয়মকানুন ও হিসেবপত্তরের বন্ধন যথাসম্ভব কঠোর হওয়া সত্ত্বেও সব সমস্যার সমাধান হয়নি। মঠের জমি যাঁর টাকায় কেনা হয়েছিল, সেই মিস মুলারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়াটা এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। এ বিষয়ে কিছু আগাম ইঙ্গিত অবশ্য স্বামীজির চিঠিতেই রয়েছে। “মিস মুলার বিষম ক্ষেপিয়া উঠিয়াছে… সকলের উপর মহারাগ, গালিম!… মধ্যে চাকরটা সকল চুরি করায় বিষম হাঙ্গামা হইয়াছিল।”
এরপরেই বিস্ফোরণ। ডিসেম্বর ১৮৯৮ মিস হেনরিয়েটা মুলারের ঘোষণা, তিনি স্বামী বিবেকানন্দের হিন্দুধর্ম প্রচারের আন্দোলনের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করেছেন। কলকাতার বড় বড় সংবাদপত্রগুলি এই খবর রসিয়ে প্রচার করতে দ্বিধা করেনি।
.
স্বামীজির জীবনকালে মঠের উত্থানপতন নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। অনাগত সময়ের দিকে তাকিয়ে তিনি সঙ্ঘের আইনকানুনগুলিও বিশেষজ্ঞদের আইনি পরামর্শে বেশ কয়েকবার পরিবর্তন করেছেন। লক্ষ্য এই যে, সময়ের খেয়ালি স্রোতে রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের প্রগতি যেন ভিন্নমুখী না হয়। জীবিতকালে বিশ্বজনের বিস্ময় সৃষ্টি করলেও, বাংলার স্থানীয় কিছু প্রতিষ্ঠান মিশনকে সব রকম বাধা দিতে লজ্জাবোধ করেনি। যেমন স্থানীয় মিউনিসিপ্যালিটি বেলুড় মঠকে নরেন দত্তর বাগানবাড়ি’মার্কা করে মোটা টাকার ট্যাক্স ধার্য করে। ফলে প্রপার্টি ট্যাক্স নিয়ে লম্বা মামলা শুরু হয়, যার রায় শেষ পর্যন্ত মঠের পক্ষে যায়। স্বামীজির দেহাবসানের আগেই বেলুড় মঠের জমি নিষ্কর ঘোষিত হয়।
