পরের বছর (১৮৯৫) স্বামীজি কিন্তু মত পালটালেন : “শশী ঘরকন্না দেখুক, সান্যাল টাকাকড়ি, বাজারপত্রের ভার নিক, শরৎ সেক্রেটারি হোক।”
আর এক চিঠিতে স্বামীজির প্রস্তাব : “টাকাকড়ির ভার রাখাল (ব্রহ্মানন্দ) যেন লয়, অন্য কেহ তাহাতে যেন উচ্চবাচ্য করে।” অর্থ ও ম্যানেজমেন্টের ব্যাপারে রাখালের উপর বিবেকানন্দর ছিল পূর্ণ বিশ্বাস।
১৮৯৪ সালে আমেরিকা থেকে স্বামী ব্রহ্মানন্দকে লেখা তারিখহীন চিঠি : “মধ্যে যদি পারো অবিলম্বে হাওলাত করে কেদারবাবুর টাকা সুদসমেত দিও, আমি পত্রপাঠ পাঠাইয়া দিব। কাকে টাকা পাঠাই, কোথায় পাঠাই, তোমাদের যে হরিঘোষের গোয়াল।.কেদারবাবুর টাকা দ্বিগুণ পরিশোধ করিব, তাহাকে ক্ষুণ্ণ হইতে মানা করিবে। আমি জানিতাম, উপেন তাহা পরিশোধ করিয়াছে এতদিনে।”
“যে মহাপুরুষ–হুঁজুক সাঙ্গ করে দেশে ফিরে যেতে লিখছেন তাকে বলল কুকুরের মতো কারুর পা চাটা আমার স্বভাব নহে। যদি সে মরদ হয় তো একটা মঠ বানিয়ে আমায় ডাকতে বলল। নইলে কার ঘরে ফিরে যাব?…ঘরে ফিরে এস!!! ঘর কোথা?”
.
বিদেশ থেকে প্রথমবার কলকাতায় ফিরে স্বামীজি আলমবাজার মঠেই রাত্রিযাপন করতেন।
সেই সময় সম্বন্ধে স্বামী বিরজানন্দ পরবর্তী কালে লিখেছেন, “অন্য সকলের মতো তার বিছানা ভূমিতেই ছিল, সে সময়ে কারো তক্তপোশ ছিল না।”
আলমবাজার মঠে বসে যে নিয়মাবলী স্বামীজি মুখে-মুখে বলেছিলেন এবং স্বামী শুদ্ধানন্দ যা সাহস করে লিখে নিয়েছিলেন তার শক্তি সুদূরপ্রসারী। “নিয়ম করার মানে এই যে, আমাদের স্বভাবতই কতকগুলি কু-নিয়ম রয়েছে– সু-নিয়মের দ্বারা এই কু-নিয়মগুলি দূর করে দিয়ে শেষে সব নিয়মের বাইরে যাবার চেষ্টা করতে হবে।”
বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে স্বামী প্রভানন্দ জানিয়েছেন, স্বামীজি প্রথমে ২৩টি নিয়ম রচনা করেন। পরে আর একটি যোগ হয়ে, ২৪টি নিয়ম আজও আলমবাজার মঠের নিয়মাবলী বলে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।
সন্ন্যাসীসঙ্ঘের সম্ভাব্য বিপদ-আপদ সম্পর্কে স্বামীজি যে যথেষ্ট অবহিত ছিলেন, তা পরবর্তীকালের শ্রদ্ধেয় সন্ন্যাসীদের কথাবার্তা থেকেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দক্ষ-স্মৃতি থেকে উদ্ধৃতি দিতে দ্বিধা নেই দূরদর্শী সন্ন্যাসীদের : “হিন্দু সন্ন্যাসী হবেন ‘রিক্ত’ সাধু।..দু’জন সন্ন্যাসী একত্রে বাস করলে গড়ে ওঠে সন্ন্যাসী-মিথুন, তিনজনে হয় সন্ন্যাসীগ্রাম, চার বা ততোধিক জনে সন্ন্যাসীনগর, এসবই ত্যাজ্য। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীগণ বিহারে একই গৃহে বাস করনে, কিন্তু হিন্দু সন্ন্যাসীর আদর্শ নিঃসঙ্গ জীবন।”
রামকৃষ্ণ মঠ স্থাপনের ব্যাপারে স্বামীজির মনোভাব বিভিন্ন চিঠিতে বেশ স্পষ্ট।নভেম্বর ১৮৯৭-এ তিনি লেখেন,”কলকাতায় একটি মঠহইলে আমি নিশ্চিন্ত হই। এত যে সারাজীবন দুঃখে-কষ্টে কাজ করিলাম, সেটা আমার শরীর যাওয়ার পর নির্বাণ যে হইবে না, সে ভরসা হয়।”
প্রথম দিকে গঙ্গার পশ্চিম দিক অপেক্ষা পূর্বদিকেই স্বামীজির নজর ছিল, যদিও বেলুড়ের জমির খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল জুলাই ১৮৯৭ নাগাদ। কিন্তু বায়না করা হয় ফেব্রুয়ারি ১৮৯৮। এর আগে সেপ্টেম্বর ১৮৯৭-তে বাগবাজারের হরিবল্লভবাবুর বাটি বিশ হাজার টাকায় পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়, কিন্তু অনেক ভাঙচুর করতে হবে এই আশঙ্কায় স্বামীজি এই সম্পত্তিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। কামারহাটিতেও মঠের জন্য একটা বাগান পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু অত্যধিক দূরত্বের জন্য অনেকের অপছন্দ।
উত্তরপ্রদেশের বড় সরকারি চাকুরি ছেড়ে হরিপ্রসন্ন মহারাজ মঠে যোগদান করায় আলমবাজারের সন্ন্যাসীসঙ্ঘ যে আর্থিক বিপর্যয়ে পড়েছিল, তা এখন আর আমাদের অজানা নয়। তিনি প্রতি মাসে যে ৬০ টাকা পাঠাতেন তা এপ্রিল ১৮৯৭ থেকে বোধহয় বন্ধ হয়ে যায়।
পরের মাসের গোড়ায় স্বামীজি আলমোড়ায় চলে গেলেন। তিন দিন পরে মাদ্রাজে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে স্বামী প্রেমানন্দের চিঠি : ”এ মঠ ভিক্ষা করিয়া চালাইবার হুকুম গতকল্য আলমোড়া হইতে আসিয়াছে।” দেখা যাচ্ছে, আর্থিক স্বনির্ভরতার ব্যাপারে স্বামীজির চিন্তাধারা খুবই স্পষ্ট।
মঠমিশনের শাখা-প্রশাখা যখন বিস্তারিত হল তখনও প্রত্যেক কেন্দ্রে এই স্বনির্ভরতাই মূল মন্ত্র। কোনও কেন্দ্রীয় সংস্থা অর্থ জোগাবে না, নিতান্ত প্রয়োজনে যদি সাহায্য আসে, তা আসবে ধার হিসেবে। ধার সম্পর্কেও স্বামীজির চিন্তাধারা স্পষ্ট। নিজেও কোনও কারণে টাকা নিলে তার জন্য সঙ্ঘকে সুদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অর্থাৎ হিসেবের ব্যাপারে সামান্যতম শৈথিল্য নেই।
আলমবাজারের সম্পর্কে নির্দেশ যাই হোক, স্বামী বিবেকানন্দ উত্তরভারতে কিছু অর্থ তোলবার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। স্বামী ব্রহ্মানন্দকে লেখা তার চিঠি (১৫ নভেম্বর ১৮৯৭): “এখান হইতে মঠের খরচের জন্য বাবুনগেন্দ্রনাথ গুপ্তমহাশয় চাঁদা আদায় করিয়া পাঠাইবেন। রীতিমত receipt তাহাকে দিও। …টাকাকড়ি একটু হিসেব করে খরচ করো; তীর্থযাত্রাটা নিজের নিজের ওপর, প্রচারাদি মঠের ভার।”
খেতড়ির রাজা এই সময় স্বামীজিকে যে তিন হাজার টাকা দেন, তা-ও তিনি স্বামী সদানন্দ ও স্বামী সচ্চিদানন্দের মাধ্যমে মঠে পাঠিয়ে দেন। টাকা তোলবার চেষ্টা চালানোর সঙ্গে, প্রত্যেক প্রাপ্তির জন্যে রসিদ দেওয়ার ব্যাপারে সন্ন্যাসীরা তখন থেকেই সদা সজাগ। অর্থ সম্বন্ধে এই শৃঙ্খলা শতবর্ষ পরেও রামকৃষ্ণ মঠ-মিশনে অটুট।
