মঠের মধ্যে মঠবাসী সাধকদের কৌপীনই ভরসা। একদিন কয়েকজন মহিলাকে বরাহনগর মঠের দিকে আসতে দেখে একজন বলে উঠলেন ‘দি মাগীজ আর কামিং’। অপর একজন প্রতিবাদ করেন। মাগীজ’ সংশোধিত হয়ে প্রথমে হল ‘মগীজ’, শেষে দাঁড়াল বার্মিজ’। অতঃপর অর্ধউলঙ্গ মঠবাসীগণকে সাবধান করে দেওয়া হত ‘দি বার্মিজ আর কামিং’ বলে। স্বামীজি এই পর্ব সম্বন্ধে নিজেই বলেছেন, “খরচপত্রের অনটনের জন্য কখনও কখনও মঠ তুলে দিতে লাঠালাঠি করতাম। শশীকে কিন্তু কিছুতেই এ বিষয়ে রাজি করাতে পারতাম না।” শশী মহারাজ (স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ) অর্থাভাব মেটানোর জন্য স্থানীয় ইস্কুলে সাময়িকভাবে মাস্টারি করতেন।
মঠের দুঃখদিনের দুই সহায়ক সুরেশ মিত্র ও বলরাম বসুর মৃত্যু হয় ১৮৯০ সালে। এঁরা নিয়মিত অর্থ সাহায্য করতেন। বলরামবাবুর সাহায্য একসময় দাঁড়ায় মাসিক ৮০ টাকায়। এঁদের দেহাবসানের পর নরেন্দ্রনাথ স্বয়ং বারাণসীর প্রমদাদাস মিত্রের কাছে অর্থ সাহায্য প্রার্থনা করেন। প্রমাদাস মিত্রের পরামর্শ, এখানে-ওখানে দু-চারজন করে ছড়িয়ে পড়।
অর্থকষ্ট এড়াবার জন্য বেশ কয়েকজন গুরুভাই তীর্থ করতে অথবা তপস্যা করতে বরানগর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। আর্থিক অবস্থার সামান্য উন্নতি হয় আলমবাজার মঠে। আলমবাজার পরিস্থিতির অনেক বিবরণ বিশেষ ধৈর্য সহকারে সংগ্রহ করেছেন গবেষক স্বামী প্রভানন্দ তাঁর রামকৃষ্ণ মঠের আদিকথা’ নামক গ্রন্থে। এই লেখা থেকে কিছু উদ্ধৃতি মন্দ হবেনা। শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী লিখেছেন :”মঠে তখন কাজকর্মের লোক ছিল না। শশীমহারাজ ঠাকুরের ভোগ রান্না করতেন, কানাই মহারাজ বাসন মাজতেন, যোগীন মহারাজ, হরি মহারাজ ঘর ঝাঁট দেওয়া, কুটনা কাটা, মশলা বাটা প্রভৃতি কাজ করতেন।”
স্বামী অখণ্ডানন্দ আরও বিবরণ দিয়েছেন, স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে উদ্ধৃতি দিয়ে। “মঠে এত অভাব যে, এমন অনেকদিন গিয়েছে ঠাকুরকে একটু মিছরি শরবত ভোগ দিবার জন্য দু-চার পয়সাও থাকিত না। একটা টেবিলে দুইটি টানা (ড্রয়ার) ছিল, তাহারই মধ্যে যাহা কিছু সামান্য পয়সাকড়ি থাকিত।”
মহেন্দ্রনাথ দত্তের মতে আলমবাজারে অর্থাভাব ছিল, তবে বরাহনগরের মতো নয়। লন্ডনে একবার স্বামীজি বলেছিলেন, “রাখালকে তখন বললাম যে, খেতড়ির রাজা মঠে মাসিক ১০০ টাকা করে দিতে রাজি হয়েছে, নে না; রাখাল তখন ঘোর বৈরাগ্য দেখাতে লাগল, নিলে না, কষ্টে মরতে লাগল। তাই আমি রাখালের ওপর চটে গেলুম।”
বিদেশ থেকে ১৮৯৪ সালের গ্রীষ্মকালে স্বামীজি জানতে চান, “তোমাদের কি করে চলছে, কে চালাচ্ছে?” স্বামীজি নিজেও বিদেশ থেকে কিছু সাহায্য পাঠিয়েছেন। এই সময় আলাসিঙ্গাকে লেখা (১১ জুলাই ১৮৯৪) স্বামীজির আর্থিক খবরাখবর :
“ডেট্রয়েটের বক্তৃতায় আমি ৯০০ ডলার অর্থাৎ ২,৭০০ টাকা রোজগার করি, কিন্তু পাই মাত্র ২০০ ডলার। একটা জুয়াচোর বক্তৃতা কোম্পানি আমায় ঠকিয়েছিল। আমি তাদের সংশ্রব ছেড়ে দিয়েছি। এখানেও খরচ হয়ে গিয়েছে অনেক টাকা হাতে আছে মাত্র ৩,০০০ ডলার।”
পরের মাসে (৩১ অগস্ট ১৮৯৪) আলাসিঙ্গাকে লেখা আর-এক চিঠি থেকে টাকাকড়ি সম্বন্ধে স্বামীজির মানসিকতা আরও স্পষ্ট। “আমার হাতে এখন ৯,০০০ আছে তার কতকটা ভারতের কাজ আরম্ভ করে দেবার জন্য পাঠাব, আর এখানে অনেককে ধরে তাদের দিয়ে বাৎসরিক ও ষান্মাসিক বা মাসিক হিসাবে টাকাকড়ি পাঠাবার বন্দোবস্ত করব…”
স্বামী প্রভানন্দ জানিয়েছেন, ১৮৯৫ সালের প্রথম ভাগে স্বামী অখণ্ডানন্দ লিখেছে, “তখন মঠে আমরা ডাল-ভাত ও চচ্চড়ি খাইতাম।” অখণ্ডানন্দের পরবর্তী রিপোর্ট :”এইবার মঠের দৈনন্দিন অবস্থা পূর্বাপেক্ষা অনেক ভাল।… ভক্তগণ যাঁহার যেমন অবস্থা, তেমনি খাদ্যদ্রব্য মঠে লইয়া আসিতেন। শতচ্ছিন্ন সতরঞ্চির অবসান ঘটাইয়া ভক্তগণ দুই-একটি নূতন সতরঞ্চি আনিয়া দিয়াছেন। একখানি ছোট চৌকি ও পড়ার একটি আলোও পাওয়া গিয়াছিল, মোটামুটিভাবে সকল সন্ন্যাসীদের পরিবার এক-একখানি কাপড় ও চাঁদরের সংস্থান হয়েছিল।”
এই উন্নতির পিছনে প্রধান ভূমিকা অবশ্যই ঠাকুরর শিষ্য (পরে সঙ্ঘ সভাপতি স্বামী, বিজ্ঞানানন্দ) এটাওয়ার ডিসট্রিক্ট ইঞ্জিনিয়ার হরিপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়ের। স্বামী সুবোধানন্দের মুখে মঠের শোচনীয় অর্থাভাবের কথা শুনে হরিপ্রসন্ন নিয়মিত মাসে ৬০ টাকা পাঠাতে শুরু করেন।
নিজেদের অবস্থা যাই হোক, সন্ন্যাসীভ্রাতারা নরেন্দ্রনাথের মা-দিদিমার উপরে নজর রাখতেন সর্বদা।
স্বামীজির মেজাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত একবার রক্তপিত্তরোগে আক্রান্ত হন, তাঁকে আলমবাজারে আনিয়ে চিকিৎসা করানো হয় এবং পরে গাজীপুরে স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য পাঠানো হয়।
আলমবাজার মঠের দ্বিতীয় পর্বে (১৮৯৪-১৮৯৭) অনেকগুলি অগ্নিগর্ভ চিঠি এসেছিল স্বামীজির কাছ থেকে। একটাতে তার ওয়ার্ড প্ল্যানের উল্লেখ ছিল : “তোলপাড় কর। তোলপাড় কর। একটাকে চীন দেশে পাঠিয়ে দে, একটাকে জাপান দেশে পাঠাও।”
স্বামীজির মতে সঙ্ঘ শব্দের তাৎপর্য ‘শ্রমবিভাগ। প্রত্যেকে আপনার কাজ করবে, যাতে সকল কাজ মিলে একটা সুন্দর ভাব সৃষ্টি হয়। ২৫ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪ স্বামীজির প্রস্তাব : “কালীর (অভেদানন্দ) বিষয়বুদ্ধি পাকা। কালী হোক বিজনেস ম্যানেজার।”
