কিন্তু কেবল মনের দুঃখে জাতিনিন্দা নয়, প্রয়োজনে বাঙালির প্রশংসাতেও সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ পঞ্চমুখ হয়েছেন। প্রথমবার আমেরিকা থেকে ফিরে দেশবাসীর অভিনন্দনের উত্তরে স্বামীজি বলেছিলেন, “লোকে বলিয়া থাকে, বাঙালি জাতির কল্পনাশক্তি অতি প্রখর, আমি উহা বিশ্বাস করি। আমাদিগকে লোকে কল্পনাপ্রিয় ভাবুক জাতি বলিয়া উপহাস করিয়া থাকে। কিন্তু বন্ধুগণ! আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, উহা উপহাসের বিষয় নহে। কারণ প্রবল উচ্ছাসেই হৃদয়ে তত্ত্বালোকের স্ফুরণ হয়। বুদ্ধিবৃত্তি– বিচারশক্তি খুব ভাল জিনিস, এগুলি বেশি দূর যাইতে পারে না। ভাবের মধ্য দিয়াই গভীরতম রহস্যসমূহ উঘাটিত হয়।”
রামকৃষ্ণ মঠ-মিশন স্থাপন করলেও, স্বামী বিবেকানন্দ এই সঙ্ঘের সম্পূর্ণ শৈশবও দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও সমস্ত বাধাবিপত্তি পেরিয়ে যথাসময়ে রামকৃষ্ণ সঙ্ঘ যে বিরাট মহীরুহের মতো বিস্তৃত হল, তার পিছনে রয়েছে প্রতিষ্ঠাতার অবিশ্বাস্য দূরদৃষ্টি। সব অবস্থায় সভ্যদের কেমন আচরণ হবে, তা স্বামী বিবেকানন্দ স্পষ্টভাবে লিখে গিয়েছে, সঙ্রে কী কী বিপদ আসতে পারে, তাও তিনি আন্দাজ করে গিয়েছেন। ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছেন কীভাবে তার মোকাবিলা করতে হবে।
একসময় স্বামীজি বলেছিলেন, “To organize or not to organize? If I organize, the spirit will diminish. If I do not organize, the message will not spread.”
এপ্রিল ১৮৯৭ সালে আলমবাজার মঠে স্বামী বিবেকানন্দ বললেন, “এখন অনেক নূতন নূতন ছেলে সংসার ত্যাগ করে মঠবাসী হয়েছেন, তাদের জন্য একটা নির্দিষ্ট নিয়মে শিক্ষাদান করলে বড় ভাল হয়।”
নিয়মগুলি ডিকটেশন দেওয়ার আগে দূরদর্শী স্বামীজি যে মন্তব্য করেছিলেন, ম্যানেজমেন্ট শাস্ত্রের সেইটাই বোধহয় শেষ কথা। “দেখ এই সব নিয়ম করা হচ্ছে বটে, কিন্তু প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে এগুলি করবার মূল লক্ষ্য কী? আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, সব নিয়মের বাইরে যাওয়া।”
সামাজিক ও সঙ্ঘবদ্ধ মানুষের সম্বন্ধেও এটাই বোধহয় শেষ কথা। নিয়মের মধ্যে থেকেও কীভাবে সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী সব নিয়মের বাইরে গিয়ে প্রতিষ্ঠানকে প্রাণবন্ত রাখা যায়। অর্থাৎ, অতিমাত্রায় নিয়মবন্ধন যেন স্বাধীনতাকে খর্ব না করে, আবার মাত্রাহীন স্বাধীনতা যেন শৃঙ্খলার সর্বনাশ না করে।
বিখ্যাত বই ‘স্বামি-শিষ্য-সংবাদ’-এ এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত চিন্তা আছে। অভিজ্ঞ স্বামীজি বলছেন শিষ্য শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তীকে, “কালে সম্প্রদায় হবেই। এই দেখ না, চৈতন্যদেবের এখন দুতিনশো সম্প্রদায় হয়েছে; যীশুর হাজার হাজার মত বেরিয়েছে; কিন্তু ওইসকল সম্প্রদায় চৈতন্যদেব ও যীশুকেই মানছে।”
এই দুর্ভাবনার উত্তরও দিয়েছেন স্বামীজি। “আমাদের এই যে মঠ হচ্ছে, তাতে সকল মতের, সকল ভাবের সামঞ্জস্য থাকবে।…এখান থেকে যে মহাসমন্বয়ের উদ্ভিন্ন ছ’টা বেরুবে, তাতে জগৎ প্লাবিত হয়ে যাবে।”
বেলুড়ের মঠভূমিতে হোমাগ্নি প্রজ্বলিত করে হোমের পরে স্বামীজি উপস্থিত সকলকে আহ্বান করে বলেছিলেন, “আপনারা আজ কায়মনোবাক্যে ঠাকুরের পাদপদ্মে প্রার্থনা করুন, যেন মহাযুগাবতার ঠাকুর আজ থেকে বহুকাল বহুজনহিতায় বহুজনসুখায়’ এই পুণ্যক্ষেত্রে অবস্থান করে এক সর্বধর্মের অপূর্ব সমন্বয়-কেন্দ্র করে রাখেন।”
রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের অর্থের অভাবের কথা বুঝতে গেলে আরও একটু পিছিয়ে যাওয়া মন্দ নয়। আদিপর্বে বরাহনগরে রামকৃষ্ণতনয়দের অবস্থা এতই শোচনীয় ছিল যে, খাওয়া জুটতো না। বাইরে বেরোবার কাপড় নেই, না আছে জুতো। প্রায় উলঙ্গ অবস্থায় জীবনযাপন।
এই অভাবের ছবি স্বামীজির মেজভাই মহেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিকথা থেকে বিস্তারিভাবে পাঠ করে নেওয়া মন্দ নয়। “পরবার জন্য প্রত্যেকের কৌপীন ও একখণ্ড গেরুয়া বহির্বাস ছিল। অনেকে শুধু কৌপীন পরে থাকতেন। বাইরে কোথাও কাজকার্য যাওয়ার প্রয়োজন হলে সকলের ব্যবহারযোগ্য একটি বা দুটি সাদা ধুতি ও সাদা চাদর দেওয়ালের গায়ে টাঙানো থাকত। গেরুয়া বহির্বাস পরেই তারা ভিক্ষায় বেরতেন। প্রথম দিকে কয়েক জোড়া চটিজুতা ছিল। ক্রমে সেগুলি ছিঁড়ে গেলে মঠবাসীগণ খালিপায়ে চলাফেরা করতেন। তারা মাসে একবার দাড়িগোঁফ মুণ্ডন করতেন।
“বড় ঘরটির মেঝেতে বালন্দা পটপটির দু-তিনটি মাদুর পাতা থাকত। একপাশে থাকত একটি শতরঞ্চি। মাথার বালিশ ছিল চাটাইয়ের নীচে পাতা হঁট। মশার উৎপাত খুবই ছিল। একটা খুব বড় মশারি টাঙানো হত।”
সেই সময় মঠবাসীরা প্রায়ই একবেলা খেতেন। থালার বদলে ব্যবহার হত কলাপাতা বা মানকচুর পাতা। “যাবতীয় কায়িক পরিশ্রমের কাজ করতেন তাপসেরা। মঠপ্রাঙ্গণ ও ঘরদোর, সিঁড়ি ঝট দেওয়া, পুকুর থেকে জল তুলে পায়খানা সাফ করা ও শৌচের জন্য জল তোলা, বাসনপত্র মাজা, এ সকল কাজ তাদের করতে হত।”
স্বামী অভেদানন্দ লিখেছেন, “তারকদা, আমি, লাটু, গোপালদাদা প্রভৃতি সকলে ভিক্ষায় বাহির হইয়া সামান্যভাবে যে চাউল পাইতাম তাহাই পালা করিয়া রান্না করিয়া ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারণ করিতাম। কোনও কোনওদিন শাকসবজি কোনওরূপ না পাইয়া তেলাকুচোর পাতা আনিয়া সিদ্ধ করিতাম ও তাহা দিয়া ভাত খাইতাম। অবশ্য আহার আমাদের একবেলাই জুটিত।”
