নারীর না আছে শিক্ষা, না আছে অর্থ, না আছে স্বাধীনতা। তার ভাব ও কথার কোনো মূল্য নাই। কন্যাকে জন্মদান করে পিতারা সব কর্তব্য শেষ করেন। কবির কাব্য পড়ে কল্পনার যুবকেরা মনের মাঝে যে নারী প্রতিমাকে গড়ে তোলেন, সংসার-ক্ষেত্রে ঢুকে তারা বিবাহিত পত্নীর মাঝে সে মানসীর সাড়া পেতে চান। কল্পনায় যা সম্ভব, কাজে তার সন্ধান। পেতে ঢের বিলম্ব হয়। পত্নীর মাঝে কল্পনা মানসীর দেখা না পেয়ে অনেক শিক্ষিত যুবকও নারীর উপর অত্যাচার করেন, এটা অন্যায়। মানসীকে জড় দেহে যদি পেতে চাও তবে এ যুগে বিয়ে না করাই মঙ্গল। কল্পনা সত্য হয়ে এ পর্যন্ত কোনো মানুষের সামনে খাড়া হয়নি।
শিক্ষাহীনতার জন্যে নারী কল্পনার নারী হতে পারেন না। স্বামীর সংসার কার্যে প্রকৃত সঙ্গিনী হবারও সুযোগ পান না। স্বামী সাখনা সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা কিছুরই খবর রাখতে জানেন না, কিন্তু এ জন্যে কি নারী দায়ী? কে তাকে পাগলিনী করেছে? নারী শত অপরাধ করুক, সংসারকার্যে শত বিশৃঙ্খলার পরিচয় দিক-বিরক্ত হয়ো না, কেবল একটু সরস সমালোচনা করতে পার। শুধু দেখবে সে তোমাকে ভালবাসে কি না।
অনেক সময় নারীরা খুব চাপা, প্রাণের ভালবাসা কেমন করে ব্যক্ত করতে হয়, তা জানেন না। এত অবোধ জীবন তাদের।
যুবক বয়সে নারীকে যে কত উপাদেয়, কত মনোহর মনে হয় তা ঠিক করে বলা কঠিন। সে যেন এক অজানা রাজ্যের রহস্যময়ী! যুগ যুগ ধরে তাকে তপস্যা করে পাওয়া কঠিন। সে মেঘের দোলায়, সাগর তরঙ্গ, বাতাসের মাঝে, দিগন্তের গায়, ঊষার শান্ত স্নিগ্ধ জ্যোতির ভিতরে ঘুরে বেড়ায়।
কেউ কেউ হঠাৎ কোনো নারীকে বিয়ে করে পরে অনুতাপ করতে থাকেন। বিবাহের এক বছর দু’বছর পরে পত্নীকে ত্যাগ করেন। ইহার মূলে কিছু সত্য থাকলেও পরীকে ত্যাগ করা লজ্জাজনক। ভুল যদি হয়েই থাকে তবে ভুলকে মেনে নিতে হবে। পরীর পিতামাতা বা আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে কোনো সম্বন্ধ না রেখে চলতে হবে। নারী যত বড় ছোটই হোক তার ভিতর যদি সতীত্ব গৌরব থাকে তাহলে আর দুঃখের কোনো কারণ নেই। পত্নী যদি নিরক্ষর এবং কিছু অভদ্র হন কিংবা কোনো অশিক্ষিত শ্রেণীর নারী হন তবে তাকে ভালো করবার জন্যে কখনও কঠিন কথা বলবে না; এতে তোমার সমূহ বিপদ হবে, পরিবারের অকল্যাণ হবে, বংশের অবনতি হওয়া সেখান হতেই শুরু হবে।
কোনো কোনো যুবক দূরদেশে কোনো নারীকে বিয়ে করে কিছুকাল পরে পালিয়ে আসে। এ যে কত বড় অপরাধ তা ভাষায় প্রকাশ করে বলা যায় না।
নারীর স্বাধীনতা সম্বন্ধে আমি অনেক স্থানে কথা বলেছি। নারী স্বাধীনতার অর্থ নারী শক্তিকে জাগিয়ে তোলা, তাকে শিক্ষিত করা, তার হাত পা ও মুখের ব্যবহার করতে দেওয়া। বাহিরে কুক্ৰিয়াসক্ত পুরুষ সমাজে বা অশ্লীল উদ্দেশ্যে ঘুরে বেড়ানোর স্বাধীনতা নয়।
নারীর স্বাধীনতা নাই বলেই মানুষ তাকে ঘৃণা করতে সাহস পায়। যার স্বাধীনতা নাই তার সম্মানও নাই। সম্মান যে নিজের হাতের মধ্যে, এ জিনিস পরের কাছ থেকে লাভ হয় না, নারীকে নিজের সম্মান নিজে রচনা করতে হবে। চোখ লাল করে তাকে নিজের আসন নিজে পেতে নিতে হবে। যে মহত্ত্ব বা যে সত্য নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে না তার এ জগতে কোনো স্বীকার হয় না–তার মূল্য বেশি নয়। সম্মানের জন্যে মহত্ত্বের এ সংগ্রাম ভদ্র, মধুর ও ধীর হওয়া চাই।
নারীর প্রতি পুরুষের যে একটা আকর্ষণ রয়েছে তাকে অস্বীকার করলে চলবে না। নারী দেখলেই চমকে উঠা, তার সঙ্গে কথা বলা পাপ-তার সঙ্গে প্রেম করা তো মহাপাপ এইরূপ ধারণা নিতান্তই অন্যায়। প্রেমের সঙ্গে পাপের কোনো সংস্রব নাই–যেখানে থাকে তা আদৌ প্রেম নয়। শুদ্ধভাবে নারীর সঙ্গে প্রেম করায় মানুষের জীবন উন্নত হয় প্রেমিক প্রেমিকাকে আমরা মোটেই ঘৃণা করতে পারি না।
যে সত্য করে প্রেম করতে জানে সে মহাপুরুষ। যে শুধু কামনা নিয়ে নারীর সঙ্গে মিলিত হয় সে দরিদ্র। মন যখন নীরস ও শক্ত হয়ে উঠবে, জীবনের অর্ধেক যখন পেরিয়ে
গেছে, তখন আর বিয়ে করে লাভ কী? –ইংরেজ কবি শেলী বিয়ে করেছেন উনিশ বছরের সময়। মহাকবি শেক্সপীয়ার বিয়ে করেছিলেন মাত্র সতের বছরে।
অল্প বয়সে বিয়ে করলে পড়া মাটি হয়–এ কথা অনেকে বলে থাকেন। বাল্য বিবাহের কথা বলছি না। যৌবনের প্রারম্ভে বিয়ে করলে চরিত্র খারাপ হওয়ার ভয় থাকে না। বিয়ের পর এক বছর কোনো কোনো যুবকের পত্নীর সঙ্গ ত্যাগ করা কষ্টকর হতে পারে; কিন্তু নিজের জীবনের উন্নতি অবনতি কীসে হবে সে কথা বুঝিয়ে দিলে যুবক যুবতীরা বুঝবে না? যুবকের চরিত্রে যদি বিবাহের পর এরূপ কোনো দুর্বলতা আসে তবে অতি সাবধানতার সঙ্গে অতি মিষ্টভাষায় দম্পতিকে জীবনের উন্নতি অবনতির কথা বুঝিয়ে দিতে হবে। এই জায়গায় আরও একটা কথা বলে রাখি, যুবক যুবতীর প্রেম-চাঞ্চল্যের প্রতি কিছুমাত্র অশ্রদ্ধা যেন না দেখান হয়। এতে সমূহ বিপদ উপস্থিত হতে পারে। এই বয়সে মানুষের মন বড় চঞ্চল, বড় পাগল থাকে–সাবধান!
বিয়ের পর কিছুদিনের জন্য কার্যে অবহেলা আসতে পারে। কিন্তু সে অবহেলা স্থায়ী হবে না। চরিত্রহীনতার মতো মহাবিপদের হাত থেকে বাচাবার জন্য কর্তব্য কাজের প্রতি অবহেলা দেখিয়ে ছেলে বা ছোট ভাই যদি বিবাহিত বালিকা পত্নীর সঙ্গে কিছু সময় নষ্ট করেই থাকে তাতে বিশেষ দুঃখের কোনো কারণ নাই।
