খ্রিস্টানকে যতই আমরা ঘৃণা করি, সেবা ধর্মের দিক দিয়ে এঁরা কত বড়। কিছুদিন হল সার্কুলার রোডে এঁরা একটা নতুন ফ্রি স্কুল খুলেছেন। সেখানে ছোট-বড়, মুটে মজুর শ্ৰেণীর ছেলেরা পড়ে। ছেলেদের পড়ার অনেক পুস্তকও সেখানে জমা করা হয়েছে। এরূপ একটা স্কুল নয়, শত শত ফ্রি স্কুল তারা দেশের সর্বত্র খুলেছেন। মানুষকে সভ্য পথে, জ্ঞানের পথে আনবার জন্যে ফ্রান্স, আমেরিকা ও বিলেতের বহু মানুষ জীবনের সমস্ত অর্জিত ধন দান করে যান। সেকি দু একটা টাকা? এইসব টাকা দিয়ে প্রচারকার্য দীন আর্তের সেবা, পুস্তক প্রচার প্রভৃতি বহু ভালো কাজ হয়ে থাকে।
আমার একটা পাদরী বন্ধু এক বাঁশ বাগানের ভিতর থেকে একটা ছোট মেয়ে কুড়িয়ে এনেছিলেন। সে যখন সেয়ানা হয়েছিল, তখনই তাকে দেখেছি। মানুষের প্রতি তাদের এই যে প্রেম, এ যে শ্রদ্ধার চোখে না দেখে সে মুসলমান নয়। কত নিঃসহায় বালক বালিকা, কত অনাথিনী, কত কানা খোঁড়া তাদের আশ্রমে আশ্রয় পায়। আমরা কি মানুষের জন্যে। কিছু করতে পারি নে? শুধু হৃদয়হীন ধর্মবিশ্বাস কি মানুষকে মুক্তি দেবে? আজ বেদনা নিয়ে শহরে পল্লীতে সর্বত্র বেড়াতে হবে, কথা বলতে হবে, গান গাইতে হবে।
কবি গোল্ডস্মিথের বিখ্যাত বই ‘ভিকার অব ওয়েকফিল্ড’ এ গ্রাম্য জীবনের মনোহর ছবি ফুটে উঠেছে। ফিলডিং (Fielding) স্মলেট (Smolet), জর্জ ইলিয়টের (George Eliot) বইগুলি পল্লী কাহিনীতে ভরা। ওয়াল্টার স্কটের বইগুলি পাহাড় পর্বতের বর্ণনায়, উপত্যকা ও গ্রামের সবুজ ক্ষেত্রগুলি ছবি পড়লে মনে প্রভূত আনন্দের সঞ্চার হয়। সে সব বর্ণনা কত প্রাণ, কত প্রণয়, কত আশা কত সুখ-দুঃখের পরশ জড়ানো। পল্লীর পরিত্যক্ত বনভূমি নির্জন নদীতীর, রাখাল বালকের সঙ্গীত ধারা কবির মনকে পরিপূর্ণ করে রেখেছিল।
কবি বায়রনকে প্রৌঢ় বয়সে শহরে বাস করতে হলেও বাল্যে তিনি পল্লীর সরল শোভার মধ্যে বেড়ে উঠেছিলেন। মহাকবি শেক্সপীয়ারের কবিতায় গ্রামের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দৃশ্য কেমন বিচিত্র হয়ে উঠেছে। পাখিগুলি দিন অবসানে নীড়ে ফিরে আসছে, ফলের গাছগুলি সৌন্দর্য পুলকে মানুষের চিত্তকে পুণ্য পবিত্রতায় ভরে তুলেছে। তিনি ছেলেমানুষী করে পল্লীবালকদের সঙ্গে এক হরিণ চুরি করেছিলেন। মধ্য জীবনে তিনি লণ্ডনে থিয়েটারে যোগ দিয়েছিলেন সত্য, কিন্তু জীবনের শেষের দিকে পল্লীর শান্ত শীতল কোলে ফিরে গিয়েছিলেন।
সেনস্টোন (Shenstone) কাউলে (Cowly) কাউপার (Cowper) ফিলিপ সিডনী (Philip Syddeny) সবাই গ্রাম থেকে এসেছিলেন। অধ্যাপক বসুর বাড়ি বাংলাদেশে। হেরম্ব মিত্র, পি. সি. রায়–গ্রাম বাড়ি শহরে নয়। কবি মাইকেল ছিলেন যশুরে বাঙালি মায়ের ছেলে। পল্লী প্রকৃতির শ্যাম দোললীলার মাঝে কবি-সাহিত্যিক নিজেদের ভাবের সাড়া পান। রবীন্দ্রনাথ জীবনের অনেক সময় নদী বিহারে কাটিছেন। ইট পাথরের মধ্যে মাঠের পারে, শেষ বিদায়ের অশ্রু সম্ভাষণে, স্রোতস্বিনীর কুলধ্বনিতে, ফুলের শোভানৃত্যে, মুক্তাভরা দুর্বা আস্তৃত গ্রামের পথে আর নিগৃহীত পীড়িতের মর্মবেদনায়।
ব্যস্ত অধীর, বিধাতার সিংহাসন হতে বহু দূরের শহরে লোকগুলি এসব কথার কিছুই বোঝে না। তাদের কানের গোড়া দিয়ে নিয়ত বিশ্বের আলোক বাতাস যে সঙ্গীত গেয়ে। ফিরছে, তা তাদের জানা নেই।
পল্লীর মানুষই জাতিকে বাঁচিয়ে রাখে। অর্থ দিয়ে? হৃদয়ের রক্ত দিয়ে তারা জাতির সেবা করে। শত্রু এসে দেশ আক্রমণ করলে কে তাদের বাধা দেয়? গ্রামে অজ্ঞাত অবহেলিত জনসাধারণ, পল্লীর লক্ষ মানুষই জাতির মেরুদণ্ড। এদের অস্বীকার করলে চলবে না। এদের অর্থ ও জ্ঞানে বড় করতে হবে। শহরের মানুষ দেশকে ভালবাসে কি না
জানি নে। গ্রামখানিকে পল্লীর মানুষ কত আপনার মনে করে। প্রতিবেশীর সঙ্গে তার কত আত্মীয়তা। পল্লীর মাঠ-ঘাট, পুরানো অশ্বথ গাছ, বোস বাবুদের কানা পুকুরটির ছার, প্রবাসী পল্লীবাসী কত আদরে স্মরণ করে। সেখানে তার জীবনের কত স্মৃতি, কত বেদনা, কত জয়, কত ব্যর্থতা জড়িয়ে আছে। এই অন্ধ অনুরক্তির সঙ্গে তার মনে আত্মমর্যাদা জ্ঞান জাগিয়ে তোল, দেখবে সে কি হয়–আর কি করে, শহরে মানুষগুলি তো কতগুলি অতিথি। আপনার মধ্যে সে আপনি সীমাবদ্ধ। জগতের সঙ্গে তার কোনো সম্বন্ধ নেই। সে নিষ্ঠুর, কটুভাষী ও স্বার্থপর। সে ভিখারির মুখের উপর সশব্দে দরজা আটকিয়ে দেয়। দেশ বলতে তার কিছু নেই। জগতে সে ভাড়া দিয়ে বাস করে।
যখন স্পেনের রাজা বিলেত আক্রমণের জন্যে অগ্রসর হলেন, তখন দেশ রক্ষার আহ্বান এসেছিল পল্লীর ইতর ও ভদ্র, শিক্ষিত ও অশিক্ষিতের কাছে। ওটারলুর যুদ্ধে গ্রামে চাষীরাই বিলেতের গৌরব রক্ষা করেছিল।
কিছুদিন হল, আমার বাড়ি হতে দুটি ছেলে পত্র লিখেছে–কলকাতা এসে তারা কোনো চাকরি করবে। শহরে এসে থাকতে পেলে যেন তাদের কত সম্মান হবে। বাড়িতে যে তাদের কিছু নেই তা নয়। পরের গোলামী করে এখানে থেকে নিরন্তর কষ্ট পেলেও তাতে তাদের দুঃখ হবে না। পল্লীবাসীরা মনে করে গ্রামে যারা থাকে তাদের সম্মান মোটেই নেই। যে জমি আছে তাই যদি পরিশ্রমের সংগে চাষ করা যায় তাতে কত সম্মান, কত স্বাধীনতা।
