যেদিকে তাকান বনানী আর গাঢ় সবুজের সমাহার। এসেছিও অবশ্য যাকে বলে বর্ষার মাঝামাঝি। সুন্দর ফসল খেলানো ক্ষেত, সদ্য গর্ভবতী শস্যচারারা একে অন্যের গায়ে হেসে লুটিয়ে পড়ছে প্রগলভ গ্রাম্য যুবতীদের মতো, গোদাবরী আর কৃষ্ণা থেকে কেটে আনা ক্যানালের টইটম্বুর জলে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে গ্রামের প্রান্তে প্রতিষ্ঠিত ছোট্ট গ্রামদেবতার মন্দিরের ছায়াটি,সব মিলিয়ে ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় টাইপ কেস। তার ওপরে অন্ধ্রপ্রদেশে ব্লেণ্ডার্স প্রাইডের রেট মুম্বাইয়ের থেকে বেশ খানিকটা সস্তা। ফলে দিব্য আনন্দে আছি…
অ্যাঁ? এখনও বুঝলেন নি? ওহো, দুঃখিত, আমারই যাকে বলে গলতি সে মিসটেক হো গ্যায়া।
দিব্যি মুম্বাইতে বসে খাচ্ছিলাম আর বগল বাজাচ্ছিলাম। টাটা কম্পানি ভারি ভালো কম্পানি, সেই টেনিদার সিটি কলেজের মতই, হেব্বি ছুটি দেয়। সেবারও পার্সি ইতুপুজো না ইরানী পুণ্যিপুকুর এই উপলক্ষ্যে পরপর একগাদা ছুটি ছিল। আম্মো ভালোমানুষের মতন বন্ধুবান্ধবী,তদভাবে বন্ধুদের বান্ধবীদের নিয়ে লোনাভালা ঘুরে আসাটা চিত্ত ও চরিত্রের পক্ষে সুসভ্য হবে কি না এমন গভীর ভাবনায়, অফিসে বসেই চোখটোখ বুঝে যাকে বলে নিমজ্জমান, এমন সময়ে কাঁধে একটা টোকা পেয়েই ‘তিন কত্তি তিন’ আউড়ে ঘাড় ঘুরিয়েই দেখি, বস!!!
তিনি ভারি গম্ভীর মুখে সমাজ ও জাতির অবনতি, অর্থনীতির দুরবস্থা ও সর্বব্যাপী রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা, তদুপরি যুবসমাজের সার্বিক অবক্ষয় নিয়ে একটা নাতিদীর্ঘ ভাষণ সমাপান্তে বললেন যে নেক্সট দুই সপ্তাহ কোস্টাল অন্ধ্র, অর্থাৎ অধুনা অন্ধ্রপ্রদেশের প্রধান শহরগুলি ঘুরে আসাটা জাতির পক্ষে মঙ্গলজনক বলে হায়ার ম্যানেজমেন্টের দৃঢ়বিশ্বাস। দায়িত্বটা ওনাকেই দেয়া হয়েছিল, তবে কিনা উনিও চান সে সৌভাগ্যসিন্নির ছিটেফেঁটা আমাদের কপালেও জুটুক, ওনার মনটা যে সদা সর্বদাই আমাদের কল্যাণের জন্যে হুহু করতে থাকে সে কি আমরা ফিল করি না? ইত্যাদি প্রভৃতি…
ফলে আর কি,চোদ্দ দিনের লম্বা ট্যুরে বডি ফেলেছি এই এলাকায়। বিজয়ওয়াড়া, গুন্টুর, তেনালি হয়ে সেই বিশাখাপত্তনম আর বিজয়নগর, ফের ফিরতি পথে বিশাখাপত্তনম থেকে বিজয়ওয়াড়া হয়ে হায়দ্রাবাদ, সেখান থেকে দুগগা দুগগা করে ঘরের ছেলে ঘরে, মুম্বাইতে।
তা সেই লম্বা ট্যুরসংগ্রামে আপাতত ডেরাডাণ্ডা রাজামুন্দ্রিতে। গোদাবরীর অববাহিকাতে শুয়ে থাকা নিশ্চিন্ত জনপদ, স্থানীয় শস্যের বড় আড়তও বটে। জীবন এখানে হায়দ্রাবাদ বা অন্য মেট্রোর তুলনায় অতি ধীর ও শান্ত। অত্যন্ত সম্পন্ন মফস্বল শহর, অধিবাসীদের চেহারায় একটা সুখসমৃদ্ধির তৃপ্ত ছাপ। রাস্তার কুকুর আর ছাগলগুলো অবধি দেখলুম বেশ মোটাসোটা নধর চেহারা।
তা সেখানে দিনভর চললো উস্তমকুস্তম ধরণের মার্কেট ভিজিট। স্থানীয় সেলস অফিসারটিকে বোকাসোকা দেখে সুযোগ বুঝে একটু এক্সট্রা টার্গেট কমিট করিয়ে নিয়ে বেশ তুরীয়ানন্দ লাভ করেছি, এমন সময় দুপুর দুটো নাগাদ সে ছোকরা রীতিমতো বেজার মুখেই, (এক্সট্রা টার্গেটের দুঃখে কি না খোদায় মালুম) আমাকে বললে ‘স্যার, হোয়ের ডিনার ইউ হ্যাভ টু ওয়ান্ট?’.
খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসার কিছু হয়নি, এর থেকেও বাজে ইংরাজি আমরা বাঙালিরাই বলি, এর থেকেও জঘন্যতর উচ্চারণে। আর আমি সারা দেশের বিভিন্ন প্রদেশে মার্কেট ভিজিট করতে করতে বিভিন্নস্থানে ইংরেজি ভাষার যা শিহরণ জাগানো বিবিধরূপ বস্ত্রহরণ হতে দেখেছি, তাতে আমি অলরেডি একজন ভাষানীলকণ্ঠ হয়ে উঠেছি। ফলে এসব বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে একদম দেরি হয় না। আমি গম্ভীর হয়ে বল্লুম ‘আই ওয়ান্ট টু হ্যাভ অথেনটিক তেলুগু লাঞ্চ’।
খেয়াল করে দেখবেন, এক্ষেত্রে অবধারিত ভাবে উদ্দিষ্ট স্থানীয় লোকটির মুখে একটা আত্মপ্রসাদের হাসি খেলে যায়, এখানেও তার ব্যতিক্রম হলো না। সম্মুগম নামের সেই সেলস অফিসারটি বেশ প্রসন্ন স্বরে জিজ্ঞেস করলেন ‘ইউ গুড ফ্যামিলি ফুড ওয়ান্ট স্যার? আই টেক ওয়ান ভ্যারিইই নাইস প্লেস ইউ। লেস স্পাইস,লেস অয়েল। বাট নো এসি, ওক্কে না? চ্যালেগা?’
চ্যালেগা কি রে ব্যাটা? দৌড়েগা। গুন্টুর হলো গিয়ে ভারতের শুকনো লঙ্কার রাজধানী। তা সেই গৌরব এতদঞ্চলের লোকজন মোটামুটি হৃদমাঝারেই রাখে, তাতে যে গত সাত আট দিনে পৌষ্টিকতন্ত্রের যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে সে আর কহতব্য না। লেস স্পাইসি খাবারই তো খুঁজছি কবে থেকে ভাইটু!
তা বাবু যেখানে এনে আমাকে হাজির করলেন, সেটাকে দেখেই আমার ছোটবেলায় দেখা হাওড়ার শিবপুরের কথা মনে পড়ে গেলো। তেমনই ছায়াঘেরা স্নিগ্ধ নির্জন ঠাণ্ডা একটা পাড়া, সবই একতলা দোতলা বাড়ি, প্রত্যেক বাড়ির সঙ্গে একটা করে ছোট্ট বাগান, পাঁচিলের ওপর দিয়ে উঁকি মারে কচি কচি গাছেদের মাথা। এমনই একটা একতলা বাড়ির সামনে এসে হাজির করে ছোকরা আত্মপ্রসাদের হাসি হেসে বললে, ‘দিস ইজ প্লেস স্যার’।
একনজরে করে দেখলে বাড়িটাকে মন্দির টাইপ লাগে। সামনের বাগানে ছোট্ট ফুলের বাগান। বাইরে জুতো খোলবার জায়গা।তার পাশে আবার বড় ব্ল্যাকবোর্ড টাঙানো, তাতে চক নিয়ে জীবনের উদ্দেশ্য ও কর্তব্য সম্পর্কে চোস্ত ইংরেজিতে বিভিন্ন মহাপুরুষদের বাণী লিখিত। জুতো খোলার সময় একবার চট করে চোখ বুলিয়ে নিলাম, বেশিরভাগই শ্রীঅরবিন্দ, বিবেকানন্দ আর কালাম সাহেবের বিভিন্ন উক্তি।
