শুভ্র আসনে বিরাজ’ অরুণছটামাঝে
শুভ্র আসনে বিরাজ’ অরুণছটামাঝে,
নীলাম্বরে ধরণী’পরে কিবা মহিমা তব বিকাশিল ॥
দীপ্ত সূর্য তব মুকুটোপরি,
চরণে কোটি তারা মিলাইল,
আলোকে প্রেমে আনন্দে
সকল জগত বিভাসিল ॥
শুভ্র নব শঙ্খ তব গগন ভরি বাজে
শুভ্র নব শঙ্খ তব গগন ভরি বাজে,
ধ্বনিল শুভজাগরণ-গীত।
অরুণরুচি আসনে চরণ তব রাজে,
মম হৃদয়কমল বিকশিত॥
গ্রহণ কর’ তারে তিমির পরপারে,
বিমলতর পুণ্যকরপরশ-হরষিত॥
শূন্য প্রাণ কাঁদে সদা– প্রাণেশ্বর
শূন্য প্রাণ কাঁদে সদা– প্রাণেশ্বর,
দীনবন্ধু, দয়াসিন্ধু,
প্রেমবিন্দু কাতরে করো দান ॥
কোরো না, সখা, কোরো না
চিরনিষ্ফল এই জীবন।
প্রভু, জনমে মরণে তুমি গতি,
চরণে দাও স্থান ॥
শূন্য হাতে ফিরি, হে নাথ, পথে পথে
শূন্য হাতে ফিরি, হে নাথ, পথে পথে– ফিরি হে দ্বারে দ্বারে–
চিরভিখারি হৃদি মম নিশিদিন চাহে কারে ॥
চিত্ত না শান্তি জানে, তৃষ্ঞা না তৃপ্তি মানে–
যাহা পাই তাই হারাই, ভাসি অশ্রুধারে ॥
সকল যাত্রী চলি গেল, বহি গেল সব বেলা,
আসে তিমিরযামিনী, ভাঙিয়া গেল মেলা–
কত পথ আছে বাকি, যাব চলি ভিক্ষা রাখি,
কোথা জ্বলে গৃহপ্রদীপ কোন্ সিন্ধুপারে ॥
শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলবে
শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলবে ?
আঘাত হয়ে দেখা দিল, আগুন হয়ে জ্বলবে॥
সাঙ্গ হলে মেঘের পালা শুরু হবে বৃষ্টি-ঢালা,
বরফ-জমা সারা হলে নদী হয়ে গলবে॥
ফুরায় যা তা ফুরায় শুধু চোখে,
অন্ধকারের পেরিয়ে দুয়ার যায় চলে আলোকে।
পুরাতনের হৃদয় টুটে আপনি নূতন উঠবে ফুটে,
জীবনে ফুল ফোটা হলে মরণে ফল ফলবে॥
শোনো তাঁর সুধাবাণী শুভমুহূর্তে শান্তপ্রাণে
শোনো তাঁর সুধাবাণী শুভমুহূর্তে শান্তপ্রাণে–
ছাড়ো ছাড়ো কোলাহল, ছাড়ো রে আপন কথা ॥
আকাশে দিবানিশি উথলে সঙ্গীতধ্বনি তাঁহার,
কে শুনে সে মধুবীণারব–
অধীর বিশ্ব শূন্যপথে হল বাহির ॥
শ্রান্ত কেন ওহে পান্থ, পথপ্রান্তে বসে একি খেলা
শ্রান্ত কেন ওহে পান্থ, পথপ্রান্তে বসে একি খেলা!
আজি বহে অমৃতসমীরণ, চলো চলো এইবেলা ॥
তাঁর দ্বারে হেরো ত্রিভুবন দাঁড়ায়ে,
সেথা অনন্ত উৎসব জাগে,
সকল শোভা গন্ধ সঙ্গীত আনন্দের মেলা ॥
শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে
শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে
তোমারি সুরটি আমার মুখের ‘পরে, বুকের ‘পরে ॥
পুরবের আলোর সাথে পড়ুক প্রাতে দুই নয়ানে–
নিশীথের অন্ধকারে গভীর ধারে পড়ুক প্রাণে।
নিশিদিন এই জীবনের সুখের ‘পরে দুখের ‘পরে
শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে।
যে শাখায় ফুল ফোটে না, ফল ধরে না একেবারে,
তোমার ওই বাদল-বায়ে দিক জাগায়ে সেই শাখারে।
যা-কিছু জীর্ণ আমার, দীর্ণ আমার, জীবনহারা,
তাহারি স্তরে স্তরে পড়ুক ঝরে সুরের ধারা।
নিশিদিন এই জীবনের তৃষার ‘পরে, ভুখের ‘পরে
শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে ॥
রাগ: বেহাগ
তাল: দাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ২৫ ফাল্গুন, ১৩২০
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): 1914
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে
তোমারি সুরটি আমার মুখের ‘পরে, বুকের ‘পরে ॥
পুরবের আলোর সাথে পড়ুক প্রাতে দুই নয়ানে–
নিশীথের অন্ধকারে গভীর ধারে পড়ুক প্রাণে।
নিশিদিন এই জীবনের সুখের ‘পরে দুখের ‘পরে
শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে।
যে শাখায় ফুল ফোটে না, ফল ধরে না একেবারে,
তোমার ওই বাদল-বায়ে দিক জাগায়ে সেই শাখারে।
যা-কিছু জীর্ণ আমার, দীর্ণ আমার, জীবনহারা,
তাহারি স্তরে স্তরে পড়ুক ঝরে সুরের ধারা।
নিশিদিন এই জীবনের তৃষার ‘পরে, ভুখের ‘পরে
শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে ॥
সংশয়তিমিরমাঝে না হেরি গতি হে
সংশয়তিমিরমাঝে না হেরি গতি হে।
প্রেম-আলোকে প্রকাশো জগপতি হে ॥
বিপদে সম্পদে থেকো দূরে, সতত বিরাজো হৃদয়পুরে–
তোমা বিনে অনাথ আমি অতি হে ॥
মিছে আশা লয়ে সতত ভ্রান্ত, তাই প্রতিদিন হতেছি শ্রান্ত,
তবু চঞ্চল বিষয়ে মতি হে–
নিবারো নিবারো প্রাণের ক্রন্দন, কাটো হে কাটো হে এ মায়াবন্ধন
রাখো রাখো চরণে এ মিনতি হে ॥
সংসার যবে মন কেড়ে লয়, জাগে না যখন প্রাণ
সংসার যবে মন কেড়ে লয়, জাগে না যখন প্রাণ,
তখনো, হে নাথ, প্রণমি তোমায় গাহি বসে তব গান ॥
অন্তরযামী, ক্ষমো সে আমার শূন্য মনের বৃথা উপহার–
পুষ্পবিহীন পূজা-আয়োজন, ভক্তিবিহীন তান ॥
ডাকি তব নাম শুষ্ক কণ্ঠে, আশা করি প্রাণপণে–
নিবিড় প্রেমের সরস বরষা যদি নেমে আসে মনে।
সহসা একদা আপনা হইতে ভরি দিবে তুমি তোমার অমৃতে,
এই ভরসায় করি পদতলে শূন্য হৃদয় দান ॥
সংসারে কোনো ভয় নাহি নাহি
সংসারে কোনো ভয় নাহি নাহি–
ওরে ভয়চঞ্চল প্রাণ, জীবনে মরণে সবে
রয়েছি তাঁহারি দ্বারে ॥
অভয়শঙ্খ বাজে নিখিল অম্বরে সুগম্ভীর,
দিশি দিশি দিবানিশি সুখে শোকে
লোক-লোকান্তরে ॥
সংসারে তুমি রাখিলে মোরে যে ঘরে
সংসারে তুমি রাখিলে মোরে যে ঘরে
সেই ঘরে রব সকল দুঃখ ভুলিয়া।
করুণা করিয়া নিশিদিন নিজ করে
রাখিয়ো তাহার একটি দুয়ার খুলিয়া ॥
মোর সব কাজে মোর সব অবসরে
সে দুয়ার রবে তোমারি প্রবেশ তরে,
সেথা হতে বায়ু বহিবে হৃদয় ‘পরে
চরণ হইতে তব পদধূলি তুলিয়া ॥
যত আশ্রয় ভেঙে ভেঙে যায়, স্বামী,
এক আশ্রয়ে রহে যেন চিত লাগিয়া।
যে অনলতাপ যখনি সহিব আমি
এক নাম বুকে বার বার দেয় দাগিয়া।
যবে দুখদিনে শোকতাপ আসে প্রাণে
তোমারি আদেশ বহিয়া যেন সে আনে,
পরুষ বচন যতই আঘাত হানে
সকল আঘাতে তব সুর উঠে জাগিয়া ॥
