সকল গর্ব দূর করি দিব
সকল গর্ব দূর করি দিব,
তোমার গর্ব ছাড়িব না।
সবারে ডাকিয়া কহিব যে দিন
পাব তব পদরেণুকণা॥
তব আহ্বান আসিবে যখন
সে কথা কেমনে করিব গোপন ॥
সকল বাক্যে সকল কর্মে
প্রকাশিবে তব আরাধনা॥
যত মান আমি পেয়েছি যে কাজে
সে দিন সকলই যাবে দূরে,
শুধু তব মান দেহে মনে মোর
বাজিয়া উঠিবে এক সুরে।
পথের পথিক সেও দেখে যাবে
তোমার বারতা মোর মুখভাবে
ভবসংসারবাতায়নতলে
বসে রব যবে আনমনা॥
সকল জনম ভ’রে ও মোর দরদিয়া
সকল জনম ভ’রে ও মোর দরদিয়া,
কাঁদি কাঁদাই তোরে ও মোর দরদিয়া ॥
আছ হৃদয়-মাঝে
সেথা কতই ব্যথা বাজে,
ওগো এ কি তোমায় সাজে
ও মোর দরদিয়া?।
এই দুয়ার-দেওয়া ঘরে
কভু আঁধার নাহি সরে,
তবু আছ তারি ‘পরে
ও মোর দরদিয়া।
সেথা আসন হয় নি পাতা,
সেথা মালা হয় নি গাঁথা,
আমার লজ্জাতে হেঁট মাথা
ও মোর দরদিয়া ॥
সকল ভয়ের ভয় যে তারে কোন্ বিপদে কাড়বে
সকল ভয়ের ভয় যে তারে কোন্ বিপদে কাড়বে।
প্রাণের সঙ্গে যে প্রাণ গাঁথা কোন্ কালে সে ছাড়বে।
নাহয় গেল সবই ভেসে রইবে তো সেই সর্বনেশে,
যে লাভ সকল ক্ষতির শেষে সে লাভ কেবল বাড়বে।
সুখ নিয়ে, ভাই, ভয়ে থাকি, আছে আছে দেয় সে ফাঁকি,
দুঃখে যে সুখ থাকে বাকি কেই বা সে সুখ নাড়বে?
যে পড়েছে পড়ার শেষে ঠাঁই পেয়েছে তলায় এসে,
ভয় মিটেছে বেঁচেছে সে– তারে কে আর পাড়বে।
সকলকলুষতামসহর, জয় হোক তব জয়–
সকলকলুষতামসহর, জয় হোক তব জয়–
অমৃতবারি সিঞ্চন কর’ নিখিলভুবনময়–
মহাশান্তি, মহাক্ষেম, মহাপুণ্য, মহাপ্রেম ॥
জ্ঞানসূর্য-উদয়-ভাতি ধ্বংস করুক তিমিররাতি–
দুঃসহ দুঃস্বপ্ন ঘাতি অপগত কর’ ভয় ॥
মোহমলিন অতি-দুর্দিন-শঙ্কিত-চিত পান্থ
জটিল-গহন-পথসঙ্কট-সংশয়-উদ্ভ্রান্ত।
করুণাময়, মাগি শরণ– দুর্গতিভয় করহ হরণ,
দাও দুঃখবন্ধতরণ মুক্তির পরিচয় ॥
সকাল-সাঁজে ধায় যে ওরা নানা কাজে
সকাল-সাঁজে
ধায় যে ওরা নানা কাজে ॥
আমি কেবল বসে আছি, আপন মনে কাঁটা বাছি
পথের মাঝে সকাল-সাঁজে ॥
এ পথ বেয়ে
সে আসে, তাই আছি চেয়ে।
কতই কাঁটা বাজে পায়ে, কতই ধুলা লাগে গায়ে–
মরি লাজে সকাল-সাঁজে ॥
সত্য মঙ্গল প্রেমময় তুমি, ধ্রুবজ্যোতি তুমি অন্ধকারে
সত্য মঙ্গল প্রেমময় তুমি, ধ্রুবজ্যোতি তুমি অন্ধকারে।
তুমি সদা যার হৃদে বিরাজ দুখজ্বালা সেই পাশরে–
সব দুখজ্বালা সেই পাশরে ॥
তোমার জ্ঞানে তোমার ধ্যানে তব নামে কত মাধুরী
যেই ভকত সেই জানে,
তুমি জানাও যারে সেই জানে।
ওহে, তুমি জানাও যারে সেই জানে ॥
সদা থাকো আনন্দে, সংসারে নির্ভয়ে নির্মলপ্রাণে
সদা থাকো আনন্দে, সংসারে নির্ভয়ে নির্মলপ্রাণে ॥
জাগো প্রাতে আনন্দে, করো কর্ম আনন্দে
সন্ধ্যায় গৃহে চলো হে আনন্দগানে ॥
সঙ্কটে সম্পদে থাকো কল্যাণে,
থাকো আনন্দে নিন্দা-অপমানে।
সবারে ক্ষমা করি থাকো আনন্দে,
চির-অমৃতনির্ঝরে শান্তিরসপানে ॥
সন্ধ্যা হল গো– ও মা
সন্ধ্যা হল গো– ও মা, সন্ধ্যা হল, বুকে ধরো।
অতল কালো স্নেহের মাঝে ডুবিয়ে আমায় স্নিগ্ধ করো ॥
ফিরিয়ে নে মা, ফিরিয়ে নে গো– সব যে কোথায় হারিয়েছে গো
ছড়ানো এই জীবন, তোমার আঁধার-মাঝে হোক-না জড়ো ॥
আর আমারে বাইরে তোমার কোথাও যেন না যায় দেখা।
তোমার রাতে মিলাক আমার জীবনসাঁজের রশ্মিরেখা।
আমায় ঘিরি আমায় চুমি কেবল তুমি, কেবল তুমি–
আমার ব’লে যা আছে, মা, তোমার ক’রে সকল হরো ॥
সফল করো হে প্রভু আজি সভা
সফল করো হে প্রভু আজি সভা, এ রজনী হোক মহোৎসবা ॥
বাহির অন্তর ভুবনচরাচর মঙ্গলডোরে বাঁধি এক করো–
শুষ্ক হৃদয় করো প্রেমে সরসতর, শূন্য নয়নে আনো পুণ্যপ্রভা ॥
অভয়দ্বার তব করো হে অবারিত, অমৃত-উৎস তব করো উৎসারিত,
গগনে গগনে করো প্রসারিত অতিবিচিত্র তব নিত্যশোভা।
সব ভকতে তব আনো এ পরিষদে, বিমুখ চিত্ত যত করো নত তব পদে,
রাজ-অধীশ্বর, তব চিরসম্পদ সব সম্পদ করো হতগরবা ॥
সবাই যারে সব দিতেছে তার কাছে সব দিয়ে ফেলি
সবাই যারে সব দিতেছে তার কাছে সব দিয়ে ফেলি।
কবার আগে চাবার আগে আপনি আমায় দেব মেলি।
নেবার বেলা হলেম ঋণী, ভিড় করেছি, ভয় করি নি–
এখনো ভয় করব না রে, দেবার খেলা এবার খেলি।
প্রভাত তারি সোনা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে নেচে-কুঁদে।
সন্ধ্যা তারে প্রণাম করে সব সোনা তার দেয় রে শুধে।
ফোটা ফুলের আনন্দ রে ঝরা ফুলেই ফলে ধরে–
আপনাকে, ভাই, ফুরিয়ে-দেওয়া চুকিয়ে দে তুই বেলাবেলি॥
সবার মাঝারে তোমারে স্বীকার করিব হে
সবার মাঝারে তোমারে স্বীকার করিব হে।
সবার মাঝারে তোমারে হৃদয়ে বরিব হে ॥
শুধু আপনার মনে নয়, আপন ঘরের কোণে নয়,
শুধু আপনার রচনার মাঝে নহে– তোমার মহিমা যেথা উজ্জ্বল রহে
সেই সবা-মাঝে তোমারে স্বীকার করিব হে।
দ্যুলোকে ভূলোকে তোমারে হৃদয়ে বরিব হে ॥
সকলই তেয়াগি তোমারে স্বীকার করিব হে।
সকলই গ্রহণ করিয়া তোমারে বরিব হে।
কেবলই তোমার স্তবে নয়, শুধু সঙ্গীতরবে নয়,
শুধু নির্জনে ধ্যানের আসনে নহে– তব সংসার যেথা জাগ্রত রহে,
কর্মে সেথায় তোমারে স্বীকার করিব হে।
প্রিয়ে অপ্রিয়ে তোমারে হৃদয়ে বরিব হে ॥
জানি না বলিয়া তোমারে স্বীকার করিব হে।
জানি ব’লে, নাথ, তোমারে হৃদয়ে বরিব হে।
শুধু জীবনের সুখে নয়, শুধু প্রফুল্লমুখে নয়,
শুধু সুদিনের সহজ সুযোগে নহে– দুখশোক যেথা আঁধার করিয়া রহে
নত হয়ে সেথা তোমারে স্বীকার করিব হে।
নয়নের জলে তোমারে হৃদয়ে বরিব হে ॥
