রূপসাগরে ডুব দিয়েছি অরূপরতন আশা করি
রূপসাগরে ডুব দিয়েছি অরূপরতন আশা করি,
ঘাটে ঘাটে ঘুরব না আর ভাসিয়ে আমার জীর্ণ তরী॥
সময় যেন হয় রে এবার ঢেউ-খাওয়া সব চুকিয়ে দেবার,
সুধায় এবার তলিয়ে গিয়ে অমর হয়ে রব মরি॥
যে গান কানে যায় না শোনা সে গান যথায় নিত্য বাজে
প্রাণের বীণা নিয়ে যাব সেই অতলের সভা-মাঝে॥
চিরদিনের সুরটি বেঁধে শেষ গানে তার কান্না কেঁদে
নীরব যিনি তাঁহার পায়ে নীরব বীণা দিব ধরি॥
লক্ষ্মী যখন আসবে তখন কোথায় তারে দিবি রে ঠাঁই
লক্ষ্মী যখন আসবে তখন কোথায় তারে দিবি রে ঠাঁই?
দেখ্ রে চেয়ে আপন-পানে, পদ্মটি নাই, পদ্মটি নাই ॥
ফিরছে কেঁদে প্রভাতবাতাস, আলোক যে তার ম্লান হতাশ,
মুখে চেয়ে আকাশ তোরে শুধায় আজি নীরবে তাই ॥
কত গোপন আশা নিয়ে কোন্ সে গহন রাত্রিশেষে
অগাধ জলের তলা হতে অমল কুঁড়ি উঠল ভেসে।
হল না তার ফুটে ওঠা, কখন ভেঙে পড়ল বোঁটা–
মর্ত্য-কাছে স্বর্গ যা চায় সেই মাধুরী কোথা রে পাই ॥
লহো লহো তুলি লও হে ভূমিতল হতে ধূলিম্লান এ পরান
লহো লহো তুলি লও হে ভূমিতল হতে ধূলিম্লান এ পরান–
রাখো তব কৃপাচোখে, রাখো তব স্নেহকরতলে।
রাখো তারে আলোকে, রাখো তারে অমৃতে,
রাখো তারে নিয়ত কল্যাণে, রাখো তারে কৃপাচোখে,
রাখো তারে স্নেহকরতলে ॥
লহো লহো, তুলে লহো নীরব বীণাখানি
লহো লহো, তুলে লহো নীরব বীণাখানি।
তোমার নন্দননিকুঞ্জ হতে সুর দেহো তায় আনি
ওহে সুন্দর হে সুন্দর॥
আমি আঁধার বিছায়ে আছি রাতের আকাশে
তোমারি আশ্বাসে।
তারায় তারায় জাগাও তোমার আলোক-ভরা বাণী
ওহে সুন্দর হে সুন্দর॥
পাষাণ আমার কঠিন দুখে তোমায় কেঁদে বলে,
‘পরশ দিয়ে সরস করো, ভাসাও অশ্রুজলে,
ওহে সুন্দর হে সুন্দর।’
শুষ্ক যে এই নগ্ন মরু নিত্য মরে লাজে
আমার চিত্তমাঝে,
শ্যামল রসের আঁচল তাহার বক্ষে দেহো টানি
ওহে সুন্দর হে সুন্দর॥
লুকিয়ে আস আঁধার রাতে
লুকিয়ে আস আঁধার রাতে
তুমিই আমার বন্ধু,
লও যে টেনে কঠিন হাতে
তুমি আমার আনন্দ।
দুঃখরথের তুমিই রথী
তুমিই আমার বন্ধু,
তুমি সংকট তুমিই ক্ষতি
তুমি আমার আনন্দ।
শত্রু আমারে কর গো জয়
তুমিই আমার বন্ধু,
রুদ্র তুমি হে ভয়ের ভয়
তুমি আমার আনন্দ।
বজ্র এসো হে বক্ষ চিরে
তুমিই আমার বন্ধু,
মৃত্যু লও হে বাঁধন ছিঁড়ে
তুমি আমার আনন্দ।
শক্তিরূপে হেরো, তাঁর
শক্তিরূপে হেরো, তাঁর,
আনন্দিত, অতন্দ্রিত,
ভূর্লোকে ভূবর্লোকে–
বিশ্বকাজে, চিত্তমাঝে
দিনে রাতে।
জাগো রে জাগো জাগো
উৎসাহে উল্লাসে–
পরান বাঁধো রে মরণহরণ
পরমশক্তি-সাথে ॥
শ্রান্তি আলস বিষাদ
বিলাস দ্বিধা বিবাদ
দূর করো রে।
চলো রে– চলো রে কল্যাণে,
চলো রে অভয়ে, চলো রে আলোকে,
চলো বলে।
দুখ শোক পরিহরি মিলো রে নিখিলে
নিখিলনাথে ॥
শান্ত হ রে মম চিত্ত নিরাকুল
শান্ত হ রে মম চিত্ত নিরাকুল, শান্ত হ রে ওরে দীন!
হেরো চিদম্বরে মঙ্গলে সুন্দরে সর্বচরাচর লীন ॥
শুন রে নিখিলহৃদয়নিস্যন্দিত শূন্যতলে উথলে জয়সঙ্গীত,
হেরো বিশ্ব চিরপ্রাণতরঙ্গিত নন্দিত নিত্যনবীন ॥
নাহি বিনাশ বিকার বিশোচন, নাহি দুঃখ সুখ তাপ–
নির্মল নিষ্কল নির্ভয় অক্ষয়, নাহি জরা জ্বর পাপ।
চির আনন্দ, বিরাম চিরন্তন, প্রেম নিরন্তর, জ্যোতি নিরঞ্জন–
শান্তি নিরাময়, কান্তি সুনন্দন,
সান্ত্বন অন্তবিহীন ॥
শান্তি করো বরিষন নীরব ধারে, নাথ, চিত্তমাঝে
শান্তি করো বরিষন নীরব ধারে, নাথ, চিত্তমাঝে
সুখে দুখে সব কাজে, নির্জনে জনসমাজে ॥
উদিত রাখো, নাথ, তোমার প্রেমচন্দ্র
অনিমেষ মম লোচনে গভীরতিমিরমাঝে ॥
শান্তিসমুদ্র তুমি গভীর
শান্তিসমুদ্র তুমি গভীর,
অতি অগাধ আনন্দরাশি।
তোমাতে সব দুঃখ জ্বালা
করি নির্বাণ ভুলিব সংসার,
অসীম সুখসাগরে ডুবে যাব ॥
শীতল তব পদছায়া, তাপহরণ তব সুধা
শীতল তব পদছায়া, তাপহরণ তব সুধা,
অগাধ গভীর তোমার শান্তি,
অভয় অশোক তব প্রেমমুখ ॥
অসীম করুণা তব, নব নব তব মাধুরী,
অমৃত তোমার বাণী ॥
শুধু কি তার বেঁধেই তোর কাজ ফুরাবে
শুধু কি তার বেঁধেই তোর কাজ ফুরাবে
গুণী মোর, ও গুণী!
বাঁধা বীণা রইবে পড়ে এমনি ভাবে
গুণী মোর, ও গুণী!
তা হলে হার হল যে হার হল,
শুধু বাঁধাবাঁধিই সার হল গুণী মোর, ও গুণী!
বাঁধনে যদি তোমার হাত লাগে
তা হলেই সুর জাগে, গুণী মোর, ও গুণী!
না হলে ধুলায় প’ড়ে লাজ কুড়াবে ॥
শুধু তোমার বাণী নয় গো
শুধু তোমার বাণী নয় গো, হে বন্ধু, হে প্রিয়,
মাঝে মাঝে প্রাণে তোমার পরশখানি দিয়ো॥
সারা পথের ক্লান্তি আমার সারা দিনের তৃষা
কেমন করে মেটাব যে খুঁজে না পাই দিশা—
এ আঁধার যে পূর্ণ তোমায় সেই কথা বলিয়ো॥
হৃদয় আমার চায় যে দিতে, কেবল নিতে নয়,
বয়ে বয়ে বেড়ায় সে তার যা-কিছু সঞ্চয়।
হাতখানি ওই বাড়িয়ে আনো, দাও গো আমার হাতে—
ধরব তারে, ভরব তারে, রাখব তারে সাথে,
একলা পথের চলা আমার করব রমণীয়॥
শুনেছে তোমার নাম অনাথ আতুর জন
শুনেছে তোমার নাম অনাথ আতুর জন–
এসেছে তোমার দ্বারে, শূন্য ফেরে না যেন ॥
কাঁদে যারা নিরাশায় আঁখি যেন মুছে যায়,
যেন গো অভয় পায় ত্রাসে কম্পিত মন ॥
কত শত আছে দীন অভাগা আলয়হীন,
শোকে জীর্ণ প্রাণ কত কাঁদিতেছে নিশিদিন।
পাপে যারা ডুবিয়াছে যাবে তারা কার কাছে–
কোথা হায় পথ আছে, দাও তারে দরশন ॥
