যেতে যদি হয় হবে
যেতে যদি হয় হবে–
যাব, যাব, যাব তবে॥
লেগেছিল কত ভালো এই-যে আঁধার আলো–
খেলা করে সাদা কালো উদার নভে।
গেল দিন ধরা-মাঝে কত ভাবে, কত কাজে,
সুখে দুখে কভু লাজে, কভু গরবে॥
প্রাণপণে কত দিন শুধেছি কঠিন ঋণ,
কখনো বা উদাসীন ভুলেছি সবে।
কভু ক’রে গেনু খেলা, স্রোতে ভাসাইনু ভেলা,
আনমনে কত বেলা কাটানু ভবে॥
জীবন হয় নি ফাঁকি, ফলে ফুলে ছিল ঢাকি,
যদি কিছু রহে বাকি কে তাহা লবে !
দেওয়া-নেওয়া যাবে চুকে, বোঝা-খসে-যাওয়া বুকে
যাব চলে হাসিমুখে–যাব নীরবে॥
যেতে যেতে একলা পথে
যেতে যেতে একলা পথে
নিবেছে মোর বাতি।
ঝড় এসেছে, ওরে, এবার
ঝড়কে পেলেম সাথি।
আকাশ-কোণে সর্বনেশে
ক্ষণে ক্ষণে উঠছে হেসে,
প্রলয় আমার কেশে বেশে
করছে মাতামাতি।
যে পথ দিয়ে যেতেছিলেম
ভুলিয়ে দিল তারে,
আবার কোথা চলতে হবে
গভীর অন্ধকারে।
বুঝি বা এই বজ্ররবে
নূতন পথের বার্তা কবে,
কোন্ পুরীতে গিয়ে তবে
প্রভাত হবে রাতি।
যেতে যেতে একলা পথে নিবেছে মোর বাতি
যেতে যেতে একলা পথে নিবেছে মোর বাতি।
ঝড় এসেছে, ওরে, এবার ঝড়কে পেলেম সাথি॥
আকাশকোণে সর্বনেশে ক্ষণে ক্ষণে উঠছে হেসে,
প্রলয় আমার কেশে বেশে করছে মাতামাতি॥
যে পথ দিয়ে যেতেছিলেম ভুলিয়ে দিল তারে,
আবার কোথা চলতে হবে গভীর অন্ধকারে।
বুঝি বা এই বজ্ররবে নূতন পথের বার্তা কবে—
কোন্ পুরীতে গিয়ে তবে প্রভাত হবে রাতি॥
যেতে যেতে চায় না যেতে
যেতে যেতে চায় না যেতে, ফিরে ফিরে চায়–
সবাই মিলে পথে চলা হল আমার দায় ॥
দুয়ার ধরে দাঁড়িয়ে থাকে– দেয় না সাড়া হাজার ডাকে–
বাঁধন এদের সাধনধন, ছিঁড়তে যে ভয় পায় ॥
আবেশভরে ধুলায় প’ড়ে কতই করে ছল,
যখন বেলা যাবে চলে ফেলবে আঁখিজল।
নাই ভরসা, নাই যে সাহস, চিত্ত অবশ, চরণ অলস–
লতার মতো জড়িয়ে ধরে আপন বেদনায় ॥
যেথায় তোমার লুট হতেছে ভুবনে
যেথায় তোমার লুট হতেছে ভুবনে
সেইখানে মোর চিত্ত যাবে কেমনে?।
সোনার ঘটে সূর্য তারা নিচ্ছে তুলে আলোর ধারা,
অনন্ত প্রাণ ছড়িয়ে পড়ে গগনে॥
যেথায় তুমি বস দানের আসনে,
চিত্ত আমার সেথায় যাবে কেমনে।
নিত্য নূতন রসে ঢেলে আপনাকে যে দিচ্ছ মেলে,
সেথা কি ডাক পড়বে না গো জীবনে?।
যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন
যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন
সেইখানে যে চরণ তোমার রাজে
সবার পিছে, সবার নীচে, সব-হারাদের মাঝে॥
যখন তোমায় প্রণাম করি আমি, প্রণাম আমার কোন্খানে যায় থামি,
তোমার চরণ যেথায় নামে অপমানের তলে
সেথায় আমার প্রণাম নামে না যে
সবার পিছে, সবার নীচে, সব-হারাদের মাঝে॥
অহংকার তো পায় না নাগাল যেথায় তুমি ফের
রিক্তভূষণ দীনদরিদ্র সাজে
সবার পিছে, সবার নীচে, সব-হারাদের মাঝে॥
ধনে মানে যেথায় আছে ভরি সেথায় তোমার সঙ্গ আশা করি,
সঙ্গী হয়ে আছ যেথায় সঙ্গিহীনের ঘরে
সেথায় আমার হৃদয় নামে না যে
সবার পিছে, সবার নীচে, সব-হারাদের মাঝে॥
রজনীর শেষ তারা, গোপনে আঁধারে আধো-ঘুমে
রজনীর শেষ তারা, গোপনে আঁধারে আধো-ঘুমে
বাণী তব রেখে যাও প্রভাতের প্রথম কুসুমে॥
সেইমত যিনি এই জীবনের আনন্দরূপিণী
শেষক্ষণে দেন যেন তিনি নবজীবনের মুখ চুমে॥
এই নিশীথের স্বপ্নরাজি
নবজাগরণক্ষণে নব গানে উঠে যেন বাজি।
বিরহিণী যে ছিল রে মোর হৃদয়ের মর্ম-মাঝে
বধূবেশে সেই যেন সাজে নবদিনে চন্দনে কুঙ্কুমে॥
রহি রহি আনন্দতরঙ্গ জাগে
রহি রহি আনন্দতরঙ্গ জাগে–
রহি রহি, প্রভু, তব পরশমাধুরী
হৃদয়মাঝে আসি লাগে।
রহি রহি শুনি তব চরণপাত হে
মম পথের আগে আগে।
রহি রহি মম মনোগগন ভাতিল
তব প্রসাদরবিরাগে॥
রাখো রাখো রে জীবনে জীবনবল্লভে
রাখো রাখো রে জীবনে জীবনবল্লভে,
প্রাণমনে ধরি রাখো নিবিড় আনন্দবন্ধনে ॥
আলো জ্বালো হৃদয়দীপে অতিনিভৃত অন্তরমাঝে,
আকুলিয়া দাও প্রাণ গন্ধচন্দনে ॥
রাজপুরীতে বাজায় বাঁশি বেলাশেষের তান
রাজপুরীতে বাজায় বাঁশি বেলাশেষের তান।
পথে চলি, শুধায় পথিক ‘কী নিলি তোর দান’ ॥
দেখাব যে সবার কাছে এমন আমার কী-বা আছে,
সঙ্গে আমার আছে শুধু এই কখানি গান ॥
ঘরে আমার রাখতে যে হয় বহু লোকের মন–
অনেক বাঁশি, অনেক কাঁসি, অনেক আয়োজন।
বঁধুর কাছে আসার বেলায় গানটি শুধু নিলেম গলায়,
তারি গলার মাল্য ক’রে করব মূল্যবান ॥
রাত্রি এসে যেথায় মেশে দিনের পারাবারে
রাত্রি এসে যেথায় মেশে দিনের পারাবারে
তোমায় আমায় দেখা হল সেই মোহানার ধারে ॥
সেইখানেতে সাদায় কালোয় মিলে গেছে আঁধার আলোয়–
সেইখানেতে ঢেউ ছুটেছে এ পারে ওই পারে ॥
নিতলনীল নীরব-মাঝে বাজল গভীর বাণী,
নিকষেতে উঠল ফুটে সোনার রেখাখানি।
মুখের পানে তাকাতে যাই, দেখি-দেখি দেখতে না পাই–
স্বপন-সাথে জড়িয়ে জাগা, কাঁদি আকুল ধারে ॥
রুদ্রবেশে কেমন খেলা, কালো মেঘের ভ্রূকুটি
রুদ্রবেশে কেমন খেলা, কালো মেঘের ভ্রূকুটি !
সন্ধ্যাকাশের বক্ষ যে ওই বজ্রবাণে যায় টুটি॥
সুন্দর হে, তোমায় চেয়ে ফুল ছিল সব শাখা ছেয়ে,
ঝড়ের বেগে আঘাত লেগে ধুলায় তারা যায় লুটি॥
মিলনদিনে হঠাৎ কেন লুকাও তোমার মাধুরী !
ভীরুকে ভয় দেখাতে চাও, একি দারুণ চাতুরী !
যদি তোমার কঠিন ঘায়ে বাঁধন দিতে চাও ঘুচায়ে
কঠোর বলে টেনে নিয়ে বক্ষে তোমার দাও ছুটি॥
