যা হবার তা হবে
যা হবার তা হবে।
যে আমারে কাঁদায় সে কি অমনি ছেড়ে রবে?।
পথ হতে যে ভুলিয়ে আনে পথ যে কোথায় সেই তা জানে,
ঘর যে ছাড়ায় হাত সে বাড়ায়– সেই তো ঘরে লবে ॥
যাত্রাবেলায় রুদ্র রবে বন্ধনডোর ছিন্ন হবে
যাত্রাবেলায় রুদ্র রবে বন্ধনডোর ছিন্ন হবে।
ছিন্ন হবে, ছিন্ন হবে॥
মুক্ত আমি, রুদ্ধদ্বারে বন্দী করে কে আমারে !
যাই চলে যাই অন্ধকারে ঘণ্টা বাজায় সন্ধ্যা যবে॥
যাদের চাহিয়া তোমারে ভুলেছি তারা তো চাহে না আমারে
যাদের চাহিয়া তোমারে ভুলেছি তারা তো চাহে না আমারে;
তারা আসে, তারা চলে যায় দূরে, ফেলে যায় মরু-মাঝারে ॥
দু দিনের হাসি দু দিনে ফুরায়, দীপ নিভে যায় আঁধারে;
কে রহে তখন মুছাতে নয়ন, ডেকে ডেকে মরি কাহারে?।
যাহা পাই তাই ঘরে নিয়ে যাই আপনার মন ভুলাতে–
শেষে দেখি হায় ভেঙে সব যায়, ধুলা হয়ে যায় ধুলাতে।
সুখের আশায় মরি পিপাসায় ডুবে মরি দুখপাথারে–
রবি শশী তারা কোথা হয় হারা, দেখিতে না পাই তোমারে ॥
যারা কথা দিয়ে তোমার কথা বলে
যারা কথা দিয়ে তোমার কথা বলে
তারা কথার বেড়া গাঁথে কেবল দলের পরে দলে ॥
একের কথা আরে
বুঝতে নাহি পারে,
বোঝায় যত কথার বোঝা ততই বেড়ে চলে ॥
যারা কথা ছেড়ে বাজায় শুধু সুর
তাদের সবার সুরে সবাই মেলে নিকট হতে দূর।
বোঝে কি নাই বোঝে
থাকে না তার খোঁজে,
বেদন তাদের ঠেকে গিয়ে তোমার চরণতলে ॥
যারা কাছে আছে তারা কাছে থাক্
যারা কাছে আছে তারা কাছে থাক্, তারা তো পারে না জানিতে–
তাহাদের চেয়ে তুমি কাছে আছ আমার হৃদয়খানিতে ॥
যারা কথা বলে তাহারা বলুক, আমি করিব না কারেও বিমুখ–
তারা নাহি জানে ভরা আছে প্রাণ তব অকথিত বাণীতে।
নীরবে নিয়ত রয়েছে আমার নীরব হৃদয়খানিতে ॥
তোমার লাগিয়া কারেও, হে প্রভু, পথ ছেড়ে দিতে বলিব না, কভু,
যত প্রেম আছে সব প্রেম মোরে তোমা-পানে রবে টানিতে–
সকলের প্রেমে রবে তব প্রেম আমার হৃদয়খানিতে।
সবার সহিতে তোমার বাঁধন হেরি যেন সদা এ মোর সাধন–
সবার সঙ্গ পারে যেন মনে তব আরাধনা আনিতে।
সবার মিলনে তোমার মিলন
জাগিবে হৃদয়খানিতে ॥
যারে নিজে তুমি ভাসিয়েছিলে দুঃখধারার ভরা স্রোতে
যারে নিজে তুমি ভাসিয়েছিলে দুঃখধারার ভরা স্রোতে
তারে ডাক দিলে আজ কোন্ খেয়ালে
আবার তোমার ও পার হতে ॥
শ্রাবণ-রাতে বাদল-ধারে উদাস ক’রে কাঁদাও যারে
আবার তারে ফিরিয়ে আনো ফুল-ফোটানো ফাগুন-রাতে ॥
এ পার হতে ও পার ক’রে বাটে বাটে ঘোরাও মোরে।
কুড়িয়ে আনা, ছড়িয়ে ফেলা, এই কি তোমার একই খেলা–
লাগাও ধাঁধা বারে বারে এই আঁধারে এই আলোতে ॥
যিনি সকল কাজের কাজী
যিনি সকল কাজের কাজী মোরা তাঁরি কাজের সঙ্গী।
যাঁর নানা রঙের রঙ্গ মোরা তাঁরি রসের রঙ্গী ॥
তাঁর বিপুল ছন্দে ছন্দে
মোরা যাই চলে আনন্দে,
তিনি যেমনি বাজান ভেরী মোদের তেমনি নাচের ভঙ্গি ॥
এই জন্ম-মরণ-খেলায়
মোরা মিলি তাঁরি মেলায়,
এই দুঃখসুখের জীবন মোদের তাঁরি খেলার অঙ্গী।
ওরে ডাকেন তিনি যবে
তাঁর জলদ-মন্দ্র রবে
ছুটি পথের কাঁটা পায়ে দ’লে সাগর গিরি লঙ্ঘি ॥
যে থাকে থাক-না দ্বারে
যে থাকে থাক-না দ্বারে, যে-যাবি যা-না পারে ॥
যদি ওই ভোরের পাখি তোরি নাম যায় রে ডাকি
একা তুই চলে যা রে ॥
কুঁড়ি চায় আঁধার রাতে শিশিরের রসে মাতে।
ফোটা ফুল চায় না নিশা প্রাণে তার আলোর তৃষা,
কাঁদে সে অন্ধকারে ॥
যে দিন ফুটল কমল কিছুই জানি নাই
যে দিন ফুটল কমল কিছুই জানি নাই
আমি ছিলেম অন্যমনে।
আমার সাজিয়ে সাজি তারে আনি নাই
সে যে রইল সংগোপনে।
মাঝে মাঝে হিয়া আকুলপ্রায়,
স্বপন দেখে চমকে উঠে চায়,
মন্দ মধুর গন্ধ আসে হায়
কোথায় দখিন-সমীরণে।
ওগো সেই সুগন্ধে ফিরায় উদাসিয়া
আমায় দেশে দেশান্তে।
যেন সন্ধানে তার উঠে নিশ্বাসিয়া
ভুবন নবীন বসন্তে।
কে জানিত দূরে তো নেই সে,
আমারি গো আমারি সেই যে,
এ মাধুরী ফুটেছে হায় রে
আমার হৃদয়-উপবনে।
যে ধ্রুবপদ দিয়েছ বাঁধি বিশ্বতানে
যে ধ্রুবপদ দিয়েছ বাঁধি বিশ্বতানে
মিলাব তাই জীবনগানে ॥
গগনে তব বিমল নীল– হৃদয়ে লব তাহারি মিল,
শান্তিময়ী গভীর বাণী নীরব প্রাণে ॥
বাজায় উষা নিশীথকুলে যে গীতভাষা
সে ধ্বনি নিয়ে জাগিবে মোর নবীন আশা।
ফুলের মতো সহজ সুরে প্রভাতে মম উঠিবে পূরে,
সন্ধ্যা মম সে সুরে যেন মরিতে জানে ॥
যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে
যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে
জানি নাই তো তুমি এলে আমার ঘরে॥
সব যে হয়ে গেল কালো, নিবে গেল দীপের আলো,
আকাশ-পানে হাত বাড়ালেম কাহার তরে?।
অন্ধকারে রইনু পড়ে স্বপন মানি।
ঝড় যে তোমার জয়ধ্বজা তাই কি জানি!
সকালবেলা চেয়ে দেখি, দাঁড়িয়ে আছ তুমি এ কি
ঘর-ভরা মোর শূন্যতারই বুকের’পরে॥
যে-কেহ মোরে দিয়েছ সুখ দিয়েছ তাঁরি পরিচয়
যে-কেহ মোরে দিয়েছ সুখ দিয়েছ তাঁরি পরিচয়,
সবারে আমি নমি।
যে-কেহ মোরে দিয়েছ দুখ দিয়েছ তাঁরি পরিচয়,
সবারে আমি নমি ॥
যে কেহ মোরে বেসেছ ভালো জ্বেলেছ ঘরে তাঁহারি আলো,
তাঁহারি মাঝে সবারি আজি পেয়েছি আমি পরিচয়,
সবারে আমি নমি ॥
যা-কিছু দূরে গিয়েছে ছেড়ে টেনেছে তাঁরি পানে,
সবারে আমি নমি।
যা-কিছু দূরে গিয়েছে ছেড়ে টেনেছে তাঁরি পানে,
সবারে আমি নমি।
জানি বা আমি নাহি বা জানি, মানি বা আমি নাহি বা মানি,
নয়ন মেলি নিখিলে আমি পেয়েছি তাঁরি পরিচয়,
সবারে আমি নমি ॥
