যখন তুমি বাঁধছিলে তার সে যে বিষম ব্যথা
যখন তুমি বাঁধছিলে তার সে যে বিষম ব্যথা–
বাজাও বীণা, ভুলাও ভুলাও সকল দুখের কথা ॥
এতদিন যা সঙ্গোপনে ছিল তোমার মনে মনে
আজকে আমার তারে তারে শুনাও সে বারতা ॥
আর বিলম্ব কোরো না গো, ওই-যে নেবে বাতি।
দুয়ারে মোর নিশীথিনী রয়েছে কান পাতি।
বাঁধলে যে সুর তারায় তারায় অন্তবিহীন অগ্নিধারায়,
সেই সুরে মোর বাজাও প্রাণে তোমার ব্যাকুলতা ॥
যখন তোমায় আঘাত করি তখন চিনি
যখন তোমায় আঘাত করি তখন চিনি।
শত্রু হয়ে দাঁড়াই যখন লও যে জিনি॥
এ প্রাণ যত নিজের তরে তোমারি ধন হরণ করে
ততই শুধু তোমার কাছে হয় সে ঋণী॥
উজিয়ে যেতে চাই যতবার গর্বসুখে,
তোমার স্রোতের প্রবল পরশ পাই যে বুকে।
আলো যখন আলসভরে নিবিয়ে ফেলি আপন ঘরে
লক্ষ তারা জ্বালায় তোমার নিশীথিনী॥
যতখন তুমি আমায় বসিয়ে রাখ বাহির-বাটে
যতখন তুমি আমায় বসিয়ে রাখ বাহির-বাটে
ততখন গানের পরে গান গেয়ে মোর প্রহর কাটে ॥
যবে শুভক্ষণে ডাক পড়ে সেই ভিতর-সভার মাঝে
এ গান লাগবে বুঝি কাজে
তোমার সুরের রঙের রঙিন নাটে ॥
তোমার ফাগুনদিনের বকুল চাঁপা, শ্রাবণদিনের কেয়া,
তাই দেখে তো শুনি তোমার কেমন যে তান দে’য়া।
আমি উতল প্রাণে আকাশ-পানে হৃদয়খানি তুলি
বীণায় বেঁধেছি গানগুলি
তোমার সাঁঝ-সকালের সুরের ঠাটে ॥
যতবার আলো জ্বালাতে চাই
যতবার আলো জ্বালাতে চাই
নিবে যায় বারে বারে।
আমার জীবনে তোমার আসন
গভীর অন্ধকারে।
যে লতাটি আছে শুকায়েছে মূল
কুঁড়ি ধরে শুধু, নাহি ফোটে ফুল,
আমার জীবনে তব সেবা তাই
বেদনার উপহারে।
পূজাগৌরব পুণ্যবিভব
কিছু নাহি, নাহি লেশ,
এ তব পূজারী পরিয়া এসেছে
লজ্জার দীন বেশ।
উৎসবে তার আসে নাই কেহ,
বাজে নাই বাঁশি, সাজে নাই গেহ–
কাঁদিয়া তোমায় এনেছে ডাকিয়া
ভাঙা মন্দির -দ্বারে।
যদি তোমার দেখা না পাই প্রভু
যদি তোমার দেখা না পাই প্রভু,
এবার এ জীবনে
তবে তোমায় আমি পাই নি যেন
সে কথা রয় মনে।
যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে।
এ সংসারের হাটে
আমার যতই দিবস কাটে,
আমার যতই দু হাত ভরে ওঠে ধনে,
তবু কিছুই আমি পাই নি যেন
সে কথা রয় মনে।
যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে।
যদি আলসভরে
আমি বসি পথের ‘পরে,
যদি ধুলায় শয়ন পাতি সযতনে,
যেন সকল পথই বাকি আছে
সে কথা রয় মনে।
যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে।
যতই উঠে হাসি,
ঘরে যতই বাজে বাঁশি,
ওগো যতই গৃহ সাজাই আয়োজনে,
যেন তোমায় ঘরে হয় নি আনা
সে কথা রয় মনে।
যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে॥
যদি আমায় তুমি বাঁচাও
যদি আমায় তুমি বাঁচাও, তবে
তোমার নিখিল ভুবন ধন্য হবে ॥
যদি আমার মনের মলিন কালি ঘুচাও পুণ্যসলিল ঢালি
তোমার চন্দ্র সূর্য নূতন আলোয় জাগবে জ্যোতির মহোৎসবে ॥
আজও ফোটে নি মোর শোভার কুঁড়ি,
তারি বিষাদ আছে জগৎ জুড়ি।
যদি নিশার তিমির গিয়ে টুটে আমার হৃদয় জেগে ওঠে,
তবে মুখর হবে সকল আকাশ আনন্দময় গানের রবে।
যদি ঝড়ের মেঘের মতো আমি ধাই চঞ্চল-অন্তর
যদি ঝড়ের মেঘের মতো আমি ধাই চঞ্চল-অন্তর
তবে দয়া কোরো হে, দয়া কোরো হে, দয়া কোরো হে ঈশ্বর ॥
ওহে অপাপপুরুষ, দীনহীন আমি এসেছি পাপের কূলে–
প্রভু, দয়া কোরো হে, দয়া কোরো হে, দয়া করে লও তুলে
আমি জলের মাঝারে বাস করি, তবু তৃষায় শুকায়ে মরি–
প্রভু, দয়া কোরো হে, দয়া করে দাও সুধায় হৃদয় ভরি ॥
যদি প্রেম দিলে না প্রাণে
যদি প্রেম দিলে না প্রাণে
কেন ভোরের আকাশ ভরে দিলে এমন গানে গানে ?।
কেন তারার মালা গাঁথা,
কেন ফুলের শয়ন পাতা,
কেন দখিন-হাওয়া গোপন কথা জানায় কানে কানে ?।
যদি প্রেম দিলে না প্রাণে
কেন আকাশ তবে এমন চাওয়া চায় এ মুখের পানে ?
তবে ক্ষণে ক্ষণে কেন
আমার হৃদয় পাগল-হেন
তরী সেই সাগরে ভাসায় যাহার কূল সে নাহি জানে ?।
যদি এ আমার হৃদয়দুয়ার
যদি এ আমার হৃদয়দুয়ার বন্ধ রহে গো কভু
দ্বার ভেঙে তুমি এসো মোর প্রাণে, ফিরিয়া যেয়ো না প্রভু ॥
যদি কোনো দিন এ বীণার তারে তব প্রিয়নাম নাহি ঝঙ্কারে
দয়া ক’রে তবু রহিয়ো দাঁড়ায়ে, ফিরিয়া যেয়ো না প্রভু ॥
যদি কোনো দিন তোমার আহ্বানে সুপ্তি আমার চেতনা না মানে
বজ্রবেদনে জাগায়ো আমারে, ফিরিয়া যেয়ো না প্রভু।
যদি কোনো দিন তোমার আসনে আর-কাহারেও বসাই যতনে,
চিরদিবসের হে রাজা আমার, ফিরিয়া যেয়ো না প্রভু ॥
যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে
যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে
রইব কত আর?
আর পারি নে রাত জাগতে হে নাথ,
ভাবতে অনিবার।
আছি রাত্রিদিবস ধরে
দুয়ার আমার বন্ধ করে,
আসতে যে চায় সন্দেহে তায়
তাড়াই বারে বার।
তাই তো কারো হয় না আসা
আমার একা ঘরে।
আনন্দময় ভুবন তোমার
বাইরে খেলা করে।
তুমিও বুঝি পথ নাহি পাও,
এসে এসে ফিরিয়া যাও,
রাখতে যা চাই রয় না তাও
ধুলায় একাকার।
যা পেয়েছি প্রথম দিনে সেই যেন পাই শেষে
যা পেয়েছি প্রথম দিনে সেই যেন পাই শেষে,
দু হাত দিয়ে বিশ্বেরে ছুঁই শিশুর মতো হেসে॥
যাবার বেলা সহজেরে
যাই যেন মোর প্রণাম সেরে,
সকল পন্থা যেথায় মেলে সেথা দাঁড়াই এসে॥
খুঁজতে যারে হয় না কোথাও চোখ যেন তায় দেখে,
সদাই যে রয় কাছে তারি পরশ যেন ঠেকে।
নিত্য যাহার থাকি কোলে
তারেই যেন যাই গো ব’লে–
এই জীবনে ধন্য হলেম তোমায় ভালোবেসে॥
