মহারাজ, একি সাজে এলে হৃদয়পুরমাঝে
মহারাজ, একি সাজে এলে হৃদয়পুরমাঝে !
চরণতলে কোটি শশী সূর্য মরে লাজে॥
গর্ব সব টুটিয়া মূর্ছি পড়ে লুটিয়া,
সকল মম দেহ মন বীণাসম বাজে॥
একি পুলকবেদনা বহিছে মধুবায়ে !
কাননে যত পুষ্প ছিল মিলিল তব পায়ে।
পলক নাহি নয়নে, হেরি না কিছু ভুবনে–
নিরখি শুধু অন্তরে সুন্দর বিরাজে॥
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না?
কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে, তোমারে দেখিতে দেয় না?।
ক্ষণিক আলোকে আঁখির পলকে তোমায় যবে পাই দেখিতে
হারাই-হারাই সদা হয় ভয়, হারাইয়া ফেলি চকিতে ॥
কী করিলে বলো পাইব তোমারে, রাখিব আঁখিতে আঁখিতে।
এত প্রেম আমি কোথা পাব নাথ, তোমারে হৃদয়ে রাখিতে?
আর কারো পানে চাহিব না আর, করিব হে আমি প্রাণপণ–
তুমি যদি বল এখনি করিব বিষয়বাসনা বিসর্জন ॥
মালা হতে খসে-পড়া ফুলের একটি দল
মালা হতে খসে-পড়া ফুলের একটি দল
মাথায় আমার ধরতে দাও গো ধরতে দাও।
ওই মাধুরী-সরোবরের নাই যে কোথাও তল–
হোথায় আমায় ডুবতে দাও গো, মরতে দাও॥
দাও গো মুছে আমার ভালে অপমানের লিখা,
নিভৃতে আজ বন্ধু, তোমার আপন হাতের টিকা
ললাটে মোর পরতে দাও গো পরতে দাও॥
বহুক তোমার ঝড়ের হাওয়া আমার ফুলবনে,
শুকনো পাতা মলিন কুসুম ঝরতে দাও।
পথ জুড়ে যা পড়ে আছে আমার এ জীবনে
দাও গো তাদের সরতে দাও গো, সরতে দাও।
তোমার মহাভান্ডারেতে আছে অনেক ধন,
কুড়িয়ে বেড়াই মুঠা ভ’রে, ভরে না তায় মন–
অন্তরেতে জীবন আমার ভরতে দাও॥
মেঘ বলেছে ‘যাব যাব’, রাত বলেছে ‘যাই
মেঘ বলেছে ‘যাব যাব’, রাত বলেছে ‘যাই’,
সাগর বলে ‘কূল মিলেছে–আমি তো আর নাই’॥
দুঃখ বলে ‘রইনু চুপে তাঁহার পায়ের চিহ্নরূপে’,
আমি বলে ‘মিলাই আমি আর কিছু না চাই’॥
ভুবন বলে ‘তোমার তরে আছে বরণমালা’,
গগন বলে ‘তোমার তরে লক্ষ প্রদীপ জ্বালা’।
প্রেম বলে যে ‘যুগে যুগে তোমার লাগি আছি জেগে’,
মরণ বলে ‘আমি তোমার জীবনতরী বাই’॥
মোর প্রভাতের এই প্রথম খনের কুসুমখানি
মোর প্রভাতের এই প্রথম খনের কুসুমখানি
তুমি জাগাও তারে ওই নয়নের আলোক হানি ॥
সে যে দিনের বেলায় করবে খেলা হাওয়ায় দুলে,
রাতের অন্ধকারে নেবে তারে বক্ষে তুলে–
ওগো তখনি তো গন্ধে তাহার ফুটবে বাণী ॥
আমার বীণাখানি পড়ছে আজি সবার চোখে,
হেরো তারগুলি তার দেখছে গুনে সকল লোকে।
ওগো কখন সে যে সভা ত্যেজে আড়াল হবে,
শুধু সুরটুকু তার উঠবে বেজে করুণ রবে–
যখন তুমি তারে বুকের ‘পরে লবে টানি ॥
মোর পথিকেরে বুঝি এনেছ এবার মোর করুণ রঙিন পথ
মোর পথিকেরে বুঝি এনেছ এবার মোর করুণ রঙিন পথ !
এসেছে এসেছে আহা অঙ্গনে এসেছে, মোর দুয়ারে লেগেছে রথ॥
সে যে সাগরপারের বাণী মোর পরানে দিয়েছে আনি, আহা
তার আঁখির তারায় যেন গান গায় অরণ্যপর্বত॥
দুঃখসুখের এ পারে, ও পারে, দোলায় আমার মন–
কেন অকারণ অশ্রুসলিলে ভরে যায় দু’নয়ন।
ওগো নিদারুণ পথ, জানি–জানি পুন নিয়ে যাবে টানি, আহা, তারে–
চিরদিন মোর যে দিল ভরিয়া যাবে সে স্বপনবৎ॥
মোর মরণে তোমার হবে জয়
মোর মরণে তোমার হবে জয়।
মোর জীবনে তোমার পরিচয় ॥
মোর দুঃখ যে রাঙা শতদল
আজ ঘিরিল তোমার পদতল,
মোর আনন্দ সে যে মণিহার মুকুটে তোমার বাঁধা রয় ॥
মোর ত্যাগে যে তোমার হবে জয়।
মোর প্রেমে যে তোমার পরিচয়।
মোর ধৈর্য তোমার রাজপথ
সে যে লঙ্ঘিবে বনপর্বত,
মোর বীর্য তোমার জয়রথ তোমারি পতাকা শিরে বয় ॥
মোর সন্ধ্যায় তুমি সুন্দরবেশে এসেছ
মোর সন্ধ্যায় তুমি সুন্দরবেশে এসেছ,
তোমায় করি গো নমস্কার।
মোর অন্ধকারের অন্তরে তুমি হেসেছ,
তোমায় করি গো নমস্কার।
এই নম্র নীরব সৌম্য গভীর আকাশে
তোমায় করি গো নমস্কার।
এই শান্ত সুধীর তন্দ্রানিবিড় বাতাসে
তোমায় করি গো নমস্কার।
এই ক্লান্ত ধরার শ্যামলাঞ্চল-আসনে
তোমায় করি গো নমস্কার।
এই স্তব্ধ তারার মৌনমন্ত্রভাষণে
তোমায় করি গো নমস্কার।
এই কর্ম-অন্তে নিভৃত পান্থশালাতে
তোমায় করি গো নমস্কার।
এই গন্ধগহন-সন্ধ্যাকুসুম-মালাতে
তোমায় করি গো নমস্কার॥
মোর হৃদয়ের গোপন বিজন ঘরে
মোর হৃদয়ের গোপন বিজন ঘরে
একেলা রয়েছ নীরব শয়ন’পরে—
প্রিয়তম হে, জাগো জাগো জাগো॥
রুদ্ধ দ্বারের বাহিরে দাঁড়ায়ে আমি
আর কতকাল এমনে কাটিবে স্বামী—
প্রিয়তম হে, জাগো জাগো জাগো॥
রজনীর তারা উঠেছে গগন ছেয়ে,
আছে সবে মোর বাতায়ন-পানে চেয়ে—
প্রিয়তম হে, জাগো জাগো জাগো।
জীবনে আমার সঙ্গীত দাও আনি,
নীরব রেখো না তোমার বীণার বাণী—
প্রিয়তম হে, জাগো জাগো জাগো॥
মিলাব নয়ন তব নয়নের সাথে
মিলাব এ হাত তব দক্ষিণহাতে—
প্রিয়তম হে, জাগো জাগো জাগো।
হৃদয়্পাত্র সুধায় পূর্ণ হবে,
তিমির কাঁপিবে গভীর আলোর রবে—
প্রিয়তম হে, জাগো জাগো জাগো॥
মোরে বারে বারে ফিরালে
মোরে বারে বারে ফিরালে।
পূজাফুল না ফুটিল দুখনিশা না ছুটিল,
না টুটিল আবরণ ॥
জীবন ভরি মাধুরী কী শুভলগনে জাগিবে?
নাথ ওহে নাথ, কবে লবে তনু মন ধন?।
মোরে ডাকি লয়ে যাও মুক্তদ্বারে তোমার বিশ্বের সভাতে
মোরে ডাকি লয়ে যাও মুক্তদ্বারে তোমার বিশ্বের সভাতে
আজি এ মঙ্গলপ্রভাতে ॥
উদয়গিরি হতে উচ্চে কহো মোরে: তিমির লয় হল দীপ্তিসাগরে–
স্বার্থ হতে জাগো, দৈন্য হতে জাগো, সব জড়তা হতে জাগো জাগো রে
সতেজ উন্নত শোভাতে ॥
বাহির করো তব পথের মাঝে, বরণ করো মোরে তোমার কাজে।
নিবিড় আবরণ করো বিমোচন, মুক্ত করো সব তুচ্ছ শোচন,
ধৌত করো মম মুগ্ধ লোচন তোমার উজ্জ্বল শুভ্ররোচন
নবীন নির্মল বিভাতে ॥
