ভোরের বেলা কখন এসে পরশ করে গেছে হেসে
ভোরের বেলা কখন এসে পরশ করে গেছে হেসে ॥
আমার ঘুমের দুয়ার ঠেলে কে সেই খবর দিল মেলে–
জেগে দেখি আমার আঁখি আঁখির জলে গেছে ভেসে ॥
মনে হল আকাশ যেন কইল কথা কানে কানে।
মনে হল সকল দেহ পূর্ণ হল গানে গানে।
হৃদয় যেন শিশিরনত ফুটল পূজার ফুলের মতো–
জীবননদী কূল ছাপিয়ে ছড়িয়ে গেল অসীমদেশে ॥
ভয় হতে তব অভয়মাঝে
ভয় হতে তব অভয়মাঝে নূতন জনম দাও হে ॥
দীনতা হতে অক্ষয় ধনে, সংশয় হতে সত্যসদনে,
জড়তা হতে নবীন জীবনে নূতন জনম দাও হে ॥
আমার ইচ্ছা হইতে, প্রভু, তোমার ইচ্ছামাঝে–
আমার স্বার্থ হইতে, প্রভু, তব মঙ্গলকাজে–
অনেক হইতে একের ডোরে, সুখদুখ হতে শান্তিক্রোড়ে–
আমা হতে, নাথ, তোমাতে মোরে নূতন জনম দাও হে ॥
ভয় হয় পাছে তব নামে আমি আমারে করি প্রচার হে
ভয় হয় পাছে তব নামে আমি আমারে করি প্রচার হে।
মোহবশে পাছে ঘিরে আমায় তব নামগান-অহঙ্কার হে ॥
তোমার কাছে কিছু নাহি তো লুকানো, অন্তরের কথা তুমি সব জানো–
আমি কত দীন, আমি কত হীন, কেহ নাহি জানে আর হে ॥
ক্ষুদ্র কণ্ঠে যবে উঠে তব নাম বিশ্ব শুনে তোমায় করে গো প্রণাম–
তাই আমার পাছে জাগে অভিমান, গ্রাসে আমায় আঁধার হে,
পাছে প্রতারণা করি আপনারে তোমারে আসনে বসাই আমারে–
রাখো মোহ হতে, রাখো তম হতে, রাখো রাখো বারবার হে ॥
ভয়েরে মোর আঘাত করো ভীষণ
ভয়েরে মোর আঘাত করো ভীষণ, হে ভীষণ!
কঠিন করে চরণ-‘পরে প্রণত করো মন ॥
বেঁধেছে মোরে নিত্য কাজে প্রাচীরে-ঘেরা ঘরের মাঝে,
নিত্য মোরে বেঁধেছে সাজে সাজের আভরণ ॥
এসো হে, ওহে আকস্মিক, ঘিরিয়া ফেলো সকল দিক,
মুক্ত পথে উড়ায়ে নিক নিমেষে এ জীবন।
তাহার ‘পরে প্রকাশ হোক উদার তব সহাস চোখ–
তব অভয় শান্তিময় স্বরূপ পুরাতন ॥
মধুর রূপে বিরাজ হে বিশ্বরাজ
মধুর রূপে বিরাজ হে বিশ্বরাজ,
শোভন সভা নিরখি মন প্রাণ ভুলে॥
নীরব নিশি সুন্দর, বিমল নীলাম্বর,
শুচিরুচির চন্দ্রকলা চরণমূলে॥
মধুর, তোমার শেষ যে না পাই প্রহর হল শেষ
মধুর, তোমার শেষ যে না পাই প্রহর হল শেষ–
ভুবন জুড়ে রইল জেগে আনন্দ-আবেশ॥
দিনান্তের এই এক কোণাতে সন্ধ্যামেঘের শেষ সোনাতে
মন যে আমার গুঞ্জরিছে কোথায় নিরুদ্দেশ॥
সায়ন্তনের ক্লান্ত ফুলের গন্ধ হাওয়ার ’পরে
অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনে সকল অঙ্গ ভরে।
এই গোধূলির ধূসরিমায় শ্যামল ধরার সীমায় সীমায়
শুনি বনে বনান্তরে অসীম গানের রেশ॥
মন রে ওরে মন, তুমি কোন্ সাধনার ধন
মন রে ওরে মন, তুমি কোন্ সাধনার ধন !
পাই নে তোমায় পাই নে, শুধু খুঁজি সারাক্ষণ॥
রাতের তারা চোখ না বোজে– অন্ধকারে তোমায় খোঁজে,
দিকে দিকে বেড়ায় ডেকে দখিন-সমীরণ॥
সাগর যেমন জাগায় ধ্বনি, খোঁজে নিজের রতনমণি,
তেমনি করে আকাশ ছেয়ে অরুণ আলো যায় যে চেয়ে–
নাম ধরে তোর বাজায় বাঁশি কোন্ অজানা জন॥
মন, জাগ’ মঙ্গললোকে অমল অমৃতময় নব আলোকে
মন, জাগ’ মঙ্গললোকে অমল অমৃতময় নব আলোকে
জ্যোতিবিভাসিত চোখে ॥
হের’ গগন ভরি জাগে সুন্দর, জাগে তরঙ্গে জীবনসাগর–
নির্মল প্রাতে বিশ্বের সাথে জাগ’ অভয় অশোকে ॥
মনোমোহন, গহন যামিনীশেষে
মনোমোহন, গহন যামিনীশেষে
দিলে আমারে জাগায়ে ॥
মেলি দিলে শুভপ্রাতে সুপ্ত এ আঁখি
শুভ্র আলোক লাগায়ে ॥
মিথ্যা স্বপনরাজি কোথা মিলাইল,
আঁধার গেল মিলায়ে।
শান্তিসরসী-মাঝে চিত্তকমল
ফুটিল আনন্দবায়ে ॥
মন্দিরে মম কে আসিলে হে
মন্দিরে মম কে আসিলে হে!
সকল গগন অমৃতগমন,
দিশি দিশি গেল মিশি অমানিশি দূরে দূরে ॥
সকল দুয়ার আপনি খুলিল,
সকল প্রদীপ আপনি জ্বলিল,
সব বীণা বাজিল নব নব সুরে সুরে ॥
মম অঙ্গনে স্বামী আনন্দে হাসে
মম অঙ্গনে স্বামী আনন্দে হাসে,
সুগন্ধ ভাসে আনন্দ-রাতে॥
খুলে দাও দুয়ার সব,
সবারে ডাকো ডাকো,
নাহি রেখো কোথাও কোনো বাধা–
অহো, আজি সঙ্গীতে মন প্রাণ মাতে॥
মরণসাগরপারে তোমরা অমর
মরণসাগরপারে তোমরা অমর,
তোমাদের স্মরি।
নিখিলে রচিয়া গেলে আপনারই ঘর,
তোমাদের স্মরি॥
সংসারে জ্বেলে গেলে যে নব আলোক
জয় হোক, জয় হোক, তারি জয় হোক–
তোমাদের স্মরি॥
বন্দীরে দিয়ে গেছ মুক্তির সুধা,
তোমাদের স্মরি।
সত্যের বরমালে সাজালে বসুধা,
তোমাদের স্মরি।
রেখে গেলে বাণী সে যে অভয় অশোক,
জয় হোক, জয় হোক, তারি জয় হোক–
তোমাদের স্মরি॥
মরণের মুখে রেখে দূরে যাও দূরে যাও চলে
মরণের মুখে রেখে দূরে যাও দূরে যাও চলে
আবার ব্যথার টানে নিকটে ফিরাবে ব’লে॥
আঁধার-আলোর পারে খেয়া দিই বারে বারে,
নিজেরে হারায়ে খুঁজি– দুলি সেই দোলে দোলে॥
সকল রাগিণী বুঝি বাজাবে আমার প্রাণে–
কভু ভয়ে কভু জয়ে, কভু অপমানে মানে।
বিরহে ভরিবে সুরে তাই রেখে দাও দূরে,
মিলনে বাজিবে বাঁশি তাই টেনে আন কোলে॥
মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝে
মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝে
আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে, ভ্রমি বিস্ময়ে ॥
তুমি আছ, বিশ্বনাথ, অসীম রহস্যমাঝে
নীরবে একাকী আপন মহিমানিলয়ে ॥
অনন্ত এ দেশকালে, অগণ্য এ দীপ্ত লোকে,
তুমি আছ মোরে চাহি– আমি চাহি তোমা-পানে।
স্তব্ধ সর্ব কোলাহল, শান্তিমগ্ন চরাচর–
এক তুমি, তোমা-মাঝে আমি একা নির্ভয়ে ॥
