বেলা গেল তোমার পথ চেয়ে
বেলা গেল তোমার পথ চেয়ে।
শূন্য ঘাটে একা আমি, পার ক’রে লও খেয়ার নেয়ে ॥
ভেঙে এলেম খেলার বাঁশি, চুকিয়ে এলেম কান্না হাসি,
সন্ধ্যাবায়ে শ্রান্তকায়ে ঘুমে নয়ন আসে ছেয়ে ॥
ও পারেতে ঘরে ঘরে সন্ধ্যাদীপ জ্বলিল রে,
আরতির শঙ্খ বাজে সুদূর মন্দির-‘পরে।
এসো এসো শ্রান্তিহরা, এসো শান্তি-সুপ্তি-ভরা,
এসো এসো তুমি এসো, এসো তোমার তরী বেয়ে ॥
বেসুর বাজে রে
বেসুর বাজে রে,
আর কোথা নয়, কেবল তোরই আপন-মাঝে রে ॥
মেলে না সুর এই প্রভাতে আনন্দিত আলোর সাথে,
সবারে সে আড়াল করে, মরি লাজে রে ॥
ওরে থামা রে ঝঙ্কার।
নীরব হয়ে দেখ্ রে চেয়ে, দেখ্ রে চারি ধার।
তোরই হৃদয় ফুটে আছে মধুর হয়ে ফুলের গাছে,
নদীর ধারা ছুটেছে ওই তোরই কাজে রে ॥
ব্যাকুল প্রাণ কোথা সুদূরে ফিরে
ব্যাকুল প্রাণ কোথা সুদূরে ফিরে–
ডাকি লহো, প্রভু, তব ভবনমাঝে
ভবপারে সুধাসিন্ধুতীরে ॥
ভক্ত করিছে প্রভুর চরণে জীবনসমর্পণ
ভক্ত করিছে প্রভুর চরণে জীবনসমর্পণ–
ওরে দীন, তুই জোড়কর করি কর্ তাহা দরশন ॥
মিলনের ধারা পড়িতেছে ঝরি, বহিয়া যেতেছে অমৃতলহরী,
ভূতলে মাথাটি রাখিয়া লহো রে শুভাশিস্-বরিষন ॥
ওই-যে আলোক পড়েছে তাঁহার উদার ললাটদেশে,
সেথা হতে তারি একটি রশ্মি পড়ুক মাথায় এসে।
চারি দিকে তাঁর শান্তিসাগর স্থির হয়ে আছে ভরি চরাচর–
ক্ষণকাল-তরে দাঁড়াও রে তীরে, শান্ত করো রে মন ॥
ভক্তহৃদিবিকাশ প্রাণবিমোহন
ভক্তহৃদিবিকাশ প্রাণবিমোহন
নব নব তব প্রকাশ নিত্য নিত্য চিত্তগগনে হৃদীশ্বর ॥
কভু মোহবিনাশ মহারুদ্রজ্বালা,
কভু বিরাজ ভয়হর শান্তিসুধাকর ॥
চঞ্চল হর্ষশোকসঙ্কুল কল্লোল ‘পরে
স্থির বিরাজে চিরদিন মঙ্গল তব রূপ।
প্রেমমূর্তি নিরুপম প্রকাশ করো নাথ হে,
ধ্যাননয়নে পরিপূর্ণ রূপ তব সুন্দর ॥
ভুবন হইতে ভুবনবাসী এসো আপন হৃদয়ে
ভুবন হইতে ভুবনবাসী এসো আপন হৃদয়ে।
হৃদয়মাঝে হৃদয়নাথ আছে নিত্য সাথ সাথ–
কোথা ফিরিছ দিবারাত, হেরো তাঁহারে অভয়ে ॥
হেথা চির-আনন্দধাম, হেথা বাজিছে অভয় নাম,
হেথা পুরিবে সকল কাম নিভৃত অমৃত-আলয়ে ॥
ভুবনজোড়া আসনখানি
ভুবনজোড়া আসনখানি
আমার হৃদয়-মাঝে বিছাও আনি ॥
রাতের তারা, দিনের রবি, আঁধার-আলোর সকল ছবি,
তোমার আকাশ-ভরা সকল বাণী–
আমার হৃদয়-মাঝে বিছাও আনি ॥
ভুবনবীণার সকল সুরে
আমার হৃদয় পরান দাও-না পূরে।
দুঃখসুখের সকল হরষ, ফুলের পরশ, ঝড়ের পরশ–
তোমার করুণ শুভ উদার পাণি
আমার হৃদয়-মাঝে দিক্-না আনি ॥
ভুবনেশ্বর হে মোচন কর বন্ধন সব মোচন কর
ভুবনেশ্বর হে,
মোচন কর’ বন্ধন সব মোচন কর’ হে ॥
প্রভু, মোচন কর’ ভয়,
সব দৈন্য করহ লয়,
নিত্য চকিত চঞ্চল চিত কর’ নিঃসংশয়।
তিমিররাত্রি, অন্ধ যাত্রী,
সম্মুখে তব দীপ্ত দীপ তুলিয়া ধর’ হে ॥
ভুবনেশ্বর হে,
মোচন কর’ জড়বিষাদ মোচন কর’ হে।
প্রভু, তব প্রসন্ন মুখ
সব দুঃখ করুক সুখ,
ধূলিপতিত দুর্বল চিত করহ জাগরূক।
তিমিররাত্রি, অন্ধ যাত্রী,
সম্মুখে তব দীপ্ত দীপ তুলিয়া ধর’ হে ॥
ভুবনেশ্বর হে,
মোচন কর’ স্বার্থপাশ মোচন কর’ হে।
প্রভু, বিরস বিকল প্রাণ,
কর’ প্রেমসলিল দান,
ক্ষতিপীড়িত শঙ্কিত চিত কর’ সম্পদবান।
তিমিররাত্রি, অন্ধ যাত্রী,
সম্মুখে তব দীপ্ত দীপ তুলিয়া ধর’ হে ॥
ভুলে যাই থেকে থেকে
ভুলে যাই থেকে থেকে
তোমার আসন-‘পরে বসাতে চাও নাম আমাদের হেঁকে হেঁকে ॥
দ্বারী মোদের চেনে না যে, বাধা দেয় পথের মাঝে ॥
বাহিরে দাঁড়িয়ে আছি, লও ভিতরে ডেকে ডেকে ॥
মোদের প্রাণ দিয়েছ আপন হাতে, মান দিয়েছ তারি সাথে।
থেকেও সে মান থাকে না যে লোভে আর ভয়ে লাজে–
ম্লান হয় দিনে দিনে যায় ধুলাতে ঢেকে ঢেকে ॥
ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে
ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে
ও বন্ধু আমার!
না পেয়ে তোমার দেখা, একা একা দিন যে আমার কাটে না রে ॥
বুঝি গো রাত পোহালো,
বুঝি ওই রবির আলো
আভাসে দেখা দিল গগন-পারে–
সমুখে ওই হেরি পথ, তোমার কি রথ পৌঁছবে না মোর-দুয়ারে ॥
আকাশের যত তারা
চেয়ে রয় নিমেষহারা,
বসে রয় রাত-প্রভাতের পথের ধারে।
তোমারি দেখা পেলে সকল ফেলে ডুববে আলোক-পারাবারে।
প্রভাতের পথিক সবে
এল কি কলরবে–
গেল কি গান গেয়ে ওই সারে সারে!
বুঝি-বা ফুল ফুটেছে, সুর উঠেছে অরুণবীণার তারে তারে ॥
ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়, তোমারি হউক জয়
ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়, তোমারি হউক জয়।
তিমিরবিদার উদার অভ্যুদয়, তোমারি হউক জয় ॥
হে বিজয়ী বীর, নব জীবনের প্রাতে
নবীন আশার খড়্গ তোমার হাতে–
জীর্ণ আবেশ কাটো সুকঠোর ঘাতে, বন্ধন হোক ক্ষয় ॥
এসো দুঃসহ, এসো এসো নির্দয়, তোমারি হউক জয়।
এসো নির্মল, এসো এসো নির্ভয়, তোমারি হউক জয়।
প্রভাতসূর্য, এসেছ রুদ্রসাজে,
দুঃখের পথে তোমারি তূর্য বাজে–
অরুণবহ্নি জ্বালাও চিত্তমাঝে, মৃত্যুর হোক লয় ॥
ভোর হল বিভাবরী, পথ হল অবসান
ভোর হল বিভাবরী, পথ হল অবসান।
শুন ওই লোকে লোকে উঠে আলোকেরি গান॥
ধন্য হলি ওরে পান্থ রজনী-জাগর-ক্লান্ত,
ধন্য হল মরি মরি ধুলায় ধূসর প্রাণ॥
বনের কোলের কাছে সমীরণ জাগিয়াছে;
মধুভিক্ষু সারে সারে আগত কুঞ্জের দ্বারে।
হল তব যাত্রা সারা, মোছো মোছো অশ্রুধারা,
লজ্জা ভয় গেল ঝরি, ঘুচিল রে অভিমান॥
