প্রভু, আজি তোমার দক্ষিণ হাত রেখো না ঢাকি
প্রভু, আজি তোমার দক্ষিণ হাত রেখো না ঢাকি।
এসেছি তোমারে, হে নাথ, পরাতে রাখী॥
যদি বাঁধি তোমার হাতে পড়ব বাঁধা সবার সাথে,
যেখানে যে আছে কেহই রবে না বাকি॥
আজি যেন ভেদ নাহি রয় আপনা পরে,
তোমায় যেন এক দেখি হে বাহিরে ঘরে।
তোমা-সাথে যে বিচ্ছেদে ঘুরে বেড়াই কেঁদে কেঁদে
ক্ষণেক-তরে ঘুচাতে তাই তোমারে ডাকি॥
প্রভু, তোমার বীণা যেমনি বাজে
প্রভু, তোমার বীণা যেমনি বাজে
আঁধার-মাঝে
অমনি ফোটে তারা।
যেন সেই বীণাটি গভীর তানে
আমার প্রাণে
বাজে তেমনিধারা ॥
তখন নূতন সৃষ্টি প্রকাশ হবে
কী গৌরবে
হৃদয়-অন্ধকারে।
তখন স্তরে স্তরে আলোকরাশি
উঠবে ভাসি
চিত্তগগনপারে ॥
তখন তোমারি সৌন্দর্যছবি,
ওগো কবি,
আমায় পড়বে আঁকা–
তখন বিস্ময়ের রবে না সীমা,
ওই মহিমা
আর যাবে না ঢাকা।
তখন তোমারি প্রসন্ন হাসি
পড়বে আসি
নবজীবন-‘পরে।
তখন আনন্দ-অমৃতে তব
ধন্য হব
চিরদিনের তরে ॥
প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে
প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে
মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ।
তব ভুবনে তব ভবনে
মোরে আরো আরো আরো দাও স্থান॥
আরো আলো আরো আলো
এই নয়নে, প্রভু, ঢালো।
সুরে সুরে বাঁশি পুরে
তুমি আরো আরো আরো দাও তান॥
আরো বেদনা আরো বেদনা
প্রভু, দাও মোরে আরো চেতনা।
দ্বার ছুটায়ে বাধা টুটায়ে
মোরে করো ত্রাণ মোরে করো ত্রাণ।
আরো প্রেমে আরো প্রেমে
মোর আমি ডুবে যাক নেমে।
সুধাধারে আপনারে
তুমি আরো আরো আরো করো দান॥
প্রাণে খুশির তুফান উঠেছে
প্রাণে খুশির তুফান উঠেছে।
ভয়-ভাবনার বাধা টুটেছে ॥
দুঃখকে আজ কঠিন বলে জড়িয়ে ধরতে বুকের তলে
উধাও হয়ে হৃদয় ছুটেছে ॥
হেথায় কারো ঠাঁই হবে না মনে ছিল এই ভাবনা,
দুয়ার ভেঙে সবাই জুটেছে।
যতন করে আপনাকে যে রেখেছিলেম ধুয়ে মেজে,
আনন্দে সে ধুলায় লুটেছে ॥
প্রাণে গান নাই, মিছে তাই ফিরিনু যে
প্রাণে গান নাই, মিছে তাই ফিরিনু যে
বাঁশিতে সে গান খুঁজে।
প্রেমেরে বিদায় ক’রে দেশান্তরে
বেলা যায় কারে পূজে॥
বনে তোর লাগাস আগুন, তবে ফাগুন কিসের তরে–
বৃথা তোর ভস্ম-‘পরে মরিস যুঝে ॥
ওরে, তোর নিবিয়ে দিয়ে ঘরের বাতি
কী লাগি ফিরিস পথে দিবারাতি–
যে আলো শতধারায় আঁখিতারায় পড়ে ঝ’রে
তাহারে কে পায় ওরে নয়ন বুজে?।
প্রাণের প্রাণ জাগিছে তোমারি প্রাণে
প্রাণের প্রাণ জাগিছে তোমারি প্রাণে,
অলস রে, ওরে, জাগো জাগো ॥
শোনো রে চিত্তভবনে অনাদি শঙ্খ বাজিছে–
অলস রে, ওরে, জাগো জাগো ॥
প্রেমানন্দে রাখো পূর্ণ আমারে দিবসরাত
প্রেমানন্দে রাখো পূর্ণ আমারে দিবসরাত।
বিশ্বভুবনে নিরখি সতত সুন্দর তোমারে,
চন্দ্র-সূর্য-কিরণে তোমার করুণ নয়নপাত ॥
সুখসম্পদে করি হে পান তব প্রসাদবারি,
দুখসঙ্কটে পরশ পাই তব মঙ্গলহাত ॥
জীবনে জ্বালো অমর দীপ তব অনন্ত আশা,
মরণ-অন্তে হউক তোমারি চরণে সুপ্রভাত ॥
লহো লহো মম সব আনন্দ, সকল প্রীতি-গীতি–
হৃদয়ে বাহিরে একমাত্র তুমি আমার নাথ ॥
প্রেমে প্রাণে গানে গন্ধে আলোকে পুলকে
প্রেমে প্রাণে গানে গন্ধে আলোকে পুলকে
প্লাবিত করিয়া নিখিল দ্যুলোক-ভূলোকে
তোমার অমল অমৃত পড়িছে ঝরিয়া॥
দিকে দিকে আজি টুটিয়া সকল বন্ধ
মুরতি ধরিয়া জাগিয়া ওঠে আনন্দ;
জীবন উঠিল নিবিড় সুধায় ভরিয়া॥
চেতনা আমার কল্যাণ-রস-সরসে
শতদল-সম ফুটিল পরম হরষে
সব মধু তার চরণে তোমার ধরিয়া॥
নীরব আলোকে জাগিল হৃদয়প্রান্তে
উদার উষার উদয়-অরুণ কান্তি,
অলস আঁখির আবরণ গেল সরিয়া॥
ফুল বলে, ধন্য আমি মাটির ‘পরে
ফুল বলে, ধন্য আমি মাটির ‘পরে,
দেবতা ওগো, তোমার সেবা আমার ঘরে॥
জন্ম নিয়েছি ধূলিতে, দয়া করে দাও ভুলিতে,
নাই ধূলি মোর অন্তরে।
নয়ন তোমার নত করো,
দলগুলি কাঁপে থরো থরো।
চরণপরশ দিয়ো দিয়ো, ধূলির ধনকে করো স্বর্গীয়–
ধরার প্রণাম আমি তোমার তরে॥
ফেলে রাখলেই কি পড়ে রবে ও অবোধ
ফেলে রাখলেই কি পড়ে রবে ও অবোধ।
যে তার দাম জানে সে কুড়িয়ে লবে ও অবোধ ॥
ও যে কোন্ রতন তা দেখ্-না ভাবি, ওর ‘পরে কি ধুলোর দাবি?
ও হারিয়ে গেলে তাঁরি গলার হার গাঁথা যে ব্যর্থ হবে ॥
ওর খোঁজ পড়েছে জানিস নে তা?
তাই দূত বেরোল হেথা সেথা।
যারে করলি হেলা সবাই মিলি আদর যে তার বাড়িয়ে দিলি–
যারে দরদ দিলি তার ব্যথা কি সেই দরদীর প্রাণে সবে?
বজ্রে তোমার বাজে বাঁশি
বজ্রে তোমার বাজে বাঁশি, সেকি সহজ গান!
সেই সুরেতে জাগব আমি, দাও মোরে সেই কান ॥
আমি ভুলব না আর সহজেতে, সেই প্রাণে মন উঠবে মেতে
মৃত্যু-মাঝে ঢাকা আছে যে অন্তহীন প্রাণ ॥
সে ঝড় যেন সই আনন্দে চিত্তবীণার তারে
সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত নাচাও যে ঝঙ্কারে।
আরাম হতে ছিন্ন ক’রে সেই গভীরে লও গো মোরে
অশান্তির অন্তরে যেথায় শান্তি সুমহান ॥
বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি
বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি
শুষ্ক হৃদয় লয়ে আছে দাঁড়াইয়ে
ঊর্ধ্বমুখে নরনারী ॥
না থাকে অন্ধকার, না থাকে মোহপাপ,
না থাকে শোকপরিতাপ।
হৃদয় বিমল হোক, প্রাণ সবল হোক,
বিঘ্ন দাও অপসারি ॥
কেন এ হিংসাদ্বেষ, কেন এ ছদ্মবেশ,
কেন এ মান-অভিমান।
বিতর’ বিতর’ প্রেম পাষাণহৃদয়ে,
জয় জয় হোক তোমারি ॥
