বর্ষ গেল, বৃথা গেল, কিছুই করি নি হায়
বর্ষ গেল, বৃথা গেল, কিছুই করি নি হায়–
আপন শূন্যতা লয়ে জীবন বহিয়া যায় ॥
তবু তো আমার কাছে নব রবি উদিয়াছে,
তবু তো জীবন ঢালি বহিছে নবীন বায় ॥
বহিছে বিমল উষা তোমার আশিসবাণী,
তোমার করুণাসুধা হৃদয়ে দিতেছে আনি।
রেখেছ জগতপুরে, মোরে তো ফেল নি দূরে,
অসীম আশ্বাসে তাই পুলকে শিহরে কায় ॥
বল তো এইবারের মতো
বল তো এইবারের মতো
প্রভু, তোমার আঙিনাতে তুলি আমার ফসল যত ॥
কিছু-বা ফল গেছে ঝরে, কিছু-বা ফল আছে ধরে,
বছর হয়ে এল গত–
রোদের দিনে ছায়ায় বসে বাজায় বাঁশি রাখাল যত ॥
হুকুম তুমি কর যদি
চৈত্র-হাওয়ায় পাল তুলে দিই– ওই-যে মেতে ওঠে নদী।
পার ক’রে নিই ভরা তরী, মাঠের যা কাজ সারা করি,
ঘরের কাজে হই গো রত–
এবার আমার মাথার বোঝা পায়ে তোমার করি নত ॥
বল দাও মোরে বল দাও
বল দাও মোরে বল দাও, প্রাণে দাও মোর শকতি
সকল হৃদয় লুটায়ে তোমারে করিতে প্রণতি ॥
সরল সুপথে ভ্রমিতে, সব অপকার ক্ষমিতে,
সকল গর্ব দমিতে খর্ব করিতে কুমতি ॥
হৃদয়ে তোমারে বুঝিতে, জীবনে তোমারে পূজিতে,
তোমার মাঝারে খুঁজিতে চিত্তের চিরবসতি।
তব কাজ শিরে বহিতে, সংসারতাপ সহিতে,
ভবকোলাহলে রহিতে, নীরবে করিতে ভকতি ॥
তোমার বিশ্বছবিতে তব প্রেমরূপ লভিতে,
গ্রহ-তারা-শশী-রবিতে হেরিতে তোমার আরতি।
বচনমনের অতীতে ডুবিতে তোমার জ্যোতিতে,
সুখে দুখে লাভে ক্ষতিতে শুনিতে তোমার ভারতী ॥
বসে আছি হে কবে শুনিব তোমার বাণী
বসে আছি হে কবে শুনিব তোমার বাণী।
কবে বাহির হইব জগতে মম জীবন ধন্য মানি ॥
কবে প্রাণ জাগিবে, তব প্রেম গাহিবে,
দ্বারে দ্বারে ফিরি সবার হৃদয় চাহিবে,
নরনারীমন করিয়া হরণ চরণে দিবে আনি ॥
কেহ শুনে না গান, জাগে না প্রাণ,
বিফলে গীত-অবসান–
তোমার বচন করিব রচন সাধ্য নাহি নাহি।
তুমি না কহিলে কেমনে কব প্রবল অজেয় বাণী তব,
তুমি যা বলিবে তাই বলিব– আমি কিছুই না জানি।
তব নামে আমি সবারে ডাকিব, হৃদয়ে লইব টানি ॥
বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা
বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা ॥
বাজে অসীম নভোমাঝে অনাদি রব,
জাগে অগণ্য রবিচন্দ্রতারা ॥
একক অখণ্ড ব্রহ্মাণ্ডরাজ্যে
পরম-এক সেই রাজরাজেন্দ্র রাজে।
বিস্মিত নিমেষহত বিশ্ব চরণে বিনত,
লক্ষশত ভক্তচিত বাক্যহারা ॥
বাঁচান বাঁচি, মারেন মরি
বাঁচান বাঁচি, মারেন মরি।
বলো ভাই, ধন্য হরি॥
ধন্য হরি ভবের নাটে, ধন্য হরি রাজ্যপাটে।
ধন্য হরি শ্মশান-ঘাটে, ধন্য হরি, ধন্য হরি।
সুধা দিয়ে মাতান যখন ধন্য হরি, ধন্য হরি।
ব্যথা দিয়ে কাঁদান যখন ধন্য হরি, ধন্য হরি।
আত্মজনের কোলে বুকে ধন্য হরি হাসিমুখে,
ছাই দিয়ে সব ঘরের সুখে ধন্য হরি, ধন্য হরি॥
আপনি কাছে আসেন হেসে ধন্য হরি, ধন্য হরি।
খুঁজিয়ে বেড়ান দেশে দেশে ধন্য হরি, ধন্য হরি।
ধন্য হরি স্থলে জলে, ধন্য হরি ফুলে ফলে,
ধন্য হৃদয়পদ্মদলে চরণ-আলোয় ধন্য করি॥
বাঁধন ছেঁড়ার সাধন হবে
বাঁধন ছেঁড়ার সাধন হবে,
ছেড়ে যাব তীর মাভৈ-রবে ॥
যাঁহার হাতের বিজয়মালা
রুদ্রদাহের বহ্নিজ্বালা
নমি নমি নমি সে ভৈরবে ॥
কালসমুদ্রে আলোর যাত্রী
শূন্যে যে ধায় দিবস-রাত্রি
ডাক এল তার তরঙ্গেরই,
বাজুক বক্ষে বজ্রভেরী
অকূল প্রাণের সে উৎসবে ॥
বাজাও আমারে বাজাও
বাজাও আমারে বাজাও
বাজালে যে সুরে প্রভাত-আলোরে সেই সুরে মোরে বাজাও ॥
যে সুর ভরিলে ভাষাভোলা গীতে শিশুর নবীন জীবনবাঁশিতে
জননীর-মুখ-তাকানো হাসিতে– সেই সুরে মোরে বাজাও ॥
সাজাও আমারে সাজাও।
যে সাজে সাজালে ধরার ধূলিরে সেই সাজে মোরে সাজাও।
সন্ধ্যামালতী সাজে যে ছন্দে শুধু আপনারই গোপন গন্ধে,
যে সাজ নিজেরে ভোলে আনন্দে– সেই সাজে মোরে সাজাও ॥
বাজাও তুমি কবি, তোমার সঙ্গীত সুমধুর
বাজাও তুমি কবি, তোমার সঙ্গীত সুমধুর
গম্ভীরতর তানে প্রাণে মম–
দ্রব জীবন ঝরিবে ঝর ঝর নির্ঝর তব পায়ে ॥
বিসরিব সব সুখ-দুখ, চিন্তা, অতৃপ্ত বাসনা–
বিচরিবে বিমুক্ত হৃদয় বিপুল বিশ্ব-মাঝে
অনুখন আনন্দবায়ে ॥
বাজে বাজে রম্যবীণা বাজে
বাজে বাজে রম্যবীণা বাজে–
অমলকমল-মাঝে, জ্যোৎস্নারজনী মাঝে,
কাজলঘন-মাঝে, নিশি আঁধার-মাঝে,
কুসুমসুরভি-মাঝে বীনরণন শুনি যে–
প্রেমে প্রেমে বাজে ॥
নাচে নাচে রম্যতালে নাচে–
তপন তারা নাচে, নদী সমুদ্র নাচে,
জন্মমরণ নাচে, যুগযুগান্ত নাচে,
ভকতহৃদয় নাচে বিশ্বছন্দে মাতিয়ে–
প্রেমে প্রেমে নাচে ॥
সাজে সাজে রম্যবেশে সাজে–
নীল অম্বর সাজে, উষাসন্ধ্যা সাজে,
ধরণীধূলি সাজে, দীনদুঃখী সাজে,
প্রণত চিত্ত সাজে বিশ্বশোভায় লুটায়ে–
প্রেমে প্রেমে সাজে ॥
বাণী তব ধায় অনন্ত গগনে লোকে লোকে
বাণী তব ধায় অনন্ত গগনে লোকে লোকে,
তব বাণী গ্রহ চন্দ্র দীপ্ত তপন তারা ॥
সুখ দুখ তব বাণী, জনম মরণ বাণী তোমার,
নিভৃত গভীর তব বাণী ভক্তহৃদয়ে শান্তিধারা ॥
বাধা দিলে বাধবে লড়াই, মরতে হবে
বাধা দিলে বাধবে লড়াই, মরতে হবে।
পথ জুড়ে কী করবি বড়াই, সরতে হবে॥
লুঠ-করা ধন ক’রে জড়ো কে হতে চাস সবার বড়ো–
এক নিমেষে পথের ধুলায় পড়তে হবে।
নাড়া দিতে গিয়ে তোমায় নড়তে হবে॥
নীচে বসে আছিস কে রে, কাঁদিস কেন?
লজ্জা-ডোরে আপনাকে রে বাঁধিস কেন।
ধনী যে তুই দুঃখধনে সেই কথাটি রাখিস মনে–
ধুলার ‘পরে স্বর্গ তোমায় গড়তে হবে–
বিনা অস্ত্র, বিনা সহায়, লড়তে হবে॥
